আজ ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড ফাইনাল

নতুন কোনো উদ্‌যাপন ভেবে রেখেছেন গেইল?

উৎপল শুভ্র

১৩ অক্টোবর ২০২১

নতুন কোনো উদ্‌যাপন ভেবে রেখেছেন গেইল?

২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের সেই গ্যাংনাম নাচ। ছবি :এএফপি

২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামকে শ্মশান বানিয়ে সতীর্থদের নিয়ে গ্যাংনাম নেচেছিলেন ক্রিস গেইল। উসাইন বোল্টকে অনুকরণ করে বার কয়েক বুক ডনও বাদ যায়নি। চার বছর পর, ২০১৬ ফাইনালের আগে তাই মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এবার কি নতুন কোনো উদযাপন ভেবে রেখেছেন গেইল?

প্রথম প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০১৬। প্রথম আলো।

ক্রিস গেইল কি নতুন কোনো উদ্‌যাপন ভেবে রেখেছেন!

সেবার ছিল গ্যাংনাম নাচ। এবার কি অন্য কিছু?

২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামকে শ্মশান বানিয়ে সতীর্থদের নিয়ে গ্যাংনাম নেচেছিলেন গেইল। উসাইন বোল্টকে অনুকরণ করে বার কয়েক বুক ডনও বাদ যায়নি।

 এই ছবি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর। ছবি: এএফপি
আজ ইডেন গার্ডেনকে শ্মশান বানিয়ে ফেলার কোনো ব্যাপার নেই। ওটা ওয়াংখেড়েতেই সেরে এসেছেন গেইলরা। সেমিফাইনালে গেইলের ব্যর্থতার পরও অমন দাপুটে জয় আজকের ফাইনালে অবধারিত ফেবারিট বানিয়ে দিচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে।
ড্যারেন স্যামি অবশ্য এখানেও ‘ডেভিড’ হয়ে থাকতেই পছন্দ করছেন। ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালকে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভুলে যাবেন না, জিতেছিল কিন্তু ডেভিডই!’ কাল দুপুরে ফাইনাল-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও বললেন, ‘আমরা সব সময়ই ডেভিড। ডেভিড ইজ আ উইনার। গোলিয়াথ ছিল অনেক বিশাল, অনেক শক্তিশালী। কিন্তু ডেভিডের জিততে গুলতির একটা মারই যথেষ্ট ছিল।’

ভারতের বিপক্ষে না হয় নিজেদের ‘ডেভিড’ ভাবার যথেষ্ট কারণ ছিল। প্রতিপক্ষ স্বাগতিক, তার ওপর টি-টোয়েন্টি র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর। কিন্তু এখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘ডেভিড’ হতে যাবে কেন? এই বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডকে না একাই উড়িয়ে দিয়েছেন গেইল! টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যে চারবার দেখা হয়েছে দুদলের, প্রতিবারই শেষ হাসি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখে। এই ফাইনালে কোনো দলকে ‘ডেভিড’ বলতে হলে সেটি তো ইংল্যান্ড। স্যামি তা বলছেন না লড়াইয়ের ফলটা মনে রেখে। ওই যে ‘ডেভিড মানেই বিজয়ী!’

এটা ঠিক, ওয়াংখেড়েতে ১৭ দিন আগের ওই ইংল্যান্ড আর এই ইংল্যান্ড এক দল নয়। ওই ম্যাচের পর থেকেই আশ্চর্য বদল। যেটির শুরু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওই ওয়াংখেড়েতেই ২২৯ রান তাড়া করে জয়ে। এক বছর আগে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে শোচনীয় ব্যর্থ ইংল্যান্ডের এই রূপান্তরে অধিনায়ক এউইন মরগান নিজেই অবাক হয়ে যান। অকপটে স্বীকার করেন, এতটা তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। কারোরই না! ভালো বল-খারাপ বল বুঝে খেলা আর ইনিংস গড়ার সেই আদ্যিকালের ধ্যানধারণা নিয়ে পড়ে থাকা ইংল্যান্ড এখন শুরুতেই ঝড় তোলে। ঝড় তোলে শেষেও। ৬ ওভারের পাওয়ার প্লেতে রানরেট ৯.৫০। যা এই বিশ্বকাপের সেরা। সেরা শেষ ৫ ওভারে ১২.২৭ রানরেটও। জেসন রয়, অ্যালেক্স হেলস, জো রুট, জস বাটলার ইংলিশ ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটসম্যানরা ছক্কা মেরেছেন ৩৬টি। ইংল্যান্ড মাত্র দুটিই কম। চার মারায় আবার ৭৮-৬১ তে বিজয়ী। 

তারপরও চার-ছয় মারার কথা মনে হলেই যে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের মুখগুলোই চোখের সামনে ভাসে, সেটির কারণ কি ব্যাটিং করার ধরন! নাকি সেমিফাইনালের টাটকা স্মৃতি? দুদিন আগে ওয়াংখেড়েতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১৯৬ রানের ১৪৬-ই চার-ছয় থেকে। সিঙ্গেলস নেওয়ায় দুর্বলতার কথা বলায় স্যামি তাই হাসেন, ‘ওটা নিয়ে আমরা ভাবব। তবে টি-টোয়েন্টির সেই শুরুর দিনটি থেকেই আমরা বাউন্ডারি-হিটার। পারলে কেউ ওটা ঠেকাক না!’

তা ঠেকানোর মতো অন্তত দুজন তো আছেই ইংল্যান্ড দলে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডেথ ওভারে ক্রিস জর্ডান ও বেন স্টোকসের বোলিং টি-টোয়েন্টি ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা। শেষ ৪ ওভারে মাত্র ২০ রান, ভাবা যায়! জর্ডানের শরীরে বইছে ক্যারিবীয় রক্তই। ১৪ বছর বয়সে বারবাডোজ থেকে ইংল্যান্ডে চলে এসেছিলেন। ইয়র্কারের পর ইয়র্কার মেরে মনে করিয়ে দিচ্ছেন বারবাডোজেরই আরেক বোলারকে। ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার কারণে জোয়েল গার্নারের ইয়র্কারগুলোকে আরও বেশি মৃত্যুশেল বলে মনে হতো। কিন্তু কার্যকারিতার দিক থেকে ৫ ফুট ১০ ইঞ্চির জর্ডানও তো কম যাচ্ছেন না।

ফাইনালের আগে হার্ড হিটিং ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ইংল্যান্ড বড় অস্ত্র হিসেবে ভেবে রেখেছিল ক্রিস জর্ডানের ইয়র্কারকে: গেটি ইমেজেস
জর্ডান প্রসঙ্গে চলে এসেছেন, তবে জোয়েল গার্নার এমনিতেই আসতেন। এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ফাইনাল একটিই। ১৯৭৯ বিশ্বকাপের সেই ফাইনালে ইংল্যান্ডের শেষ ৮ উইকেট পড়েছিল মাত্র ১১ রানে। এর ৫টিই ‘বিগ বার্ড’-এর ইয়র্কারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৮৬ রান তাড়া করতে নেমে বয়কট-ব্রিয়ারলির উদ্বোধনী জুটিই ১২৯ রান তুলে ফেলেছিল। সমস্যা ছিল একটাই, এটা যে নির্দিষ্ট ওভারের খেলা, সেটাই ভুলে যাওয়া। ৬০ ওভারের প্রায় ৩৯টিই খেয়ে ফেলেছিলেন দুই ওপেনার। ১৭তম ওভারে দুই অঙ্কে পৌঁছানো বয়কটের সহজ ক্যাচটি লয়েড ইচ্ছা করেই ফেলে দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে এখনো আলোচনা হয়। লয়েড স্বীকার করেন না। কিন্তু তাঁর সতীর্থরা প্রসঙ্গটা উঠলেই শুধু হাসেন।

২০১০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ইংল্যান্ডের বৈশ্বিক কোনো শিরোপা না জেতার দুঃখ ঘুচেছে। যে দুঃখের অধ্যায়ে এই ইডেন গার্ডেনও ছিল। ১৯৮৭ বিশ্বকাপ ফাইনাল বললেই সবার মনে পড়ে কুখ্যাত সেই রিভার্স সুইপ! প্রতিপক্ষ অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডারের প্রথম বলেই যা করতে গিয়ে আউট হয়ে যান ইংলিশ অধিনায়ক মাইক গ্যাটিং। যেটি নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায় ৭ রানে জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের।

সময় বদলেছে। আজ রিভার্স সুইপ মারতে গিয়ে মরগান আউট হয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ড হারলে কেউ এটিকে দায়ী করবে না। গ্যাটিংয়ের সময়ে রিভার্স সুইপ ছিল অকারণ ঝুঁকি। অনেক দিনই যা ব্যাটসম্যানদের তূণে অপরিহার্য তির। সময় আসলেই বদলেছে। নইলে কি আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতেও ইংল্যান্ডের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না!

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন