খেলার কথা তো দেখি মনেই পড়ছে না!

উৎপল শুভ্র

৪ নভেম্বর ২০২১

খেলার কথা তো দেখি মনেই পড়ছে না!

মাহমুদউল্লাহ: আশাভঙ্গের বিশ্বকাপ

শুরু দুঃস্বপ্ন দিয়ে, শেষ আরও বড় দুঃস্বপ্নে। এক কথায় এই তো বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। যেটির রিভিউ লিখতে গিয়ে মাঠের পারফরম্যান্স তেমন মনেই পড়ছে না, মনে পড়ছে ব্যর্থতার কোলাজ আর একের পর এক বিতর্ক।

শেষটায় অদ্ভুত মিল! সাড়ে পাঁচ বছর আগে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটা নিয়ে লেখার হেডিংটা অনায়াসে ব্যবহার করা যাচ্ছে এবারও। তা কী ছিল সেই হেডিং? দুঃস্বপ্ন থেকে আরও বড় দুঃস্বপ্নে। 

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচটা হয়েছিল কলকাতার ইডেন গার্ডেনে। বাংলাদেশ যাতে অলআউট হয়ে গিয়েছিল ৭০ রানে। এবার দুবাইয়ে শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ তাসমান সাগরের ওপারের দেশ। মাস তিনেক আগে যাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৪-১ ম্যাচে সিরিজ জিতেছে। উইকেট কেমন ছিল, দলটা ‘বি’ টিম ছিল কি না...এসব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন আর নতুন করে আর সেটি না-ই বলি। মূল দলের কে কে ছিল, কে কে ছিল না, রেকর্ড বইয়ে এসব লেখা থাকে না। সেখানে লেখা আছে, ৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের বিপক্ষে ৬২ রানে অলআউট হয়েছিল।

আবার বাংলাদেশকে সামনে পেয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের মনে সেই দুঃস্মৃতি জেগে না উঠে পারেই না। প্রতিশোধটা হয়তো এ কারণেই এত নির্মম হলো। বাংলাদেশকে ৭৩ রানে শেষ করে দেওয়াতে ৬২-এর শোধ ঠিকমতো নেওয়া হলো না বলে যদি আফসোস থাকে, তা মিটিয়ে নেওয়ার কাজটা হলো বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে। মাত্র ৬.২ ওভারেই ৭৮ রান...এই বিশ্বকাপে এমন ঝড় আর ওঠেনি আগে। যে ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়ার মাধ্যমে শেষ হলো বাংলাদেশের দুঃস্বপ্নের এক বিশ্বকাপ। 

মাস তিনেক আগে বাংলাদেশ সফরের স্মৃতি অ্যাডাম জাম্পার ভোলার কথা নয়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সেরা বোলিংয়ে সেই জ্বালা হয়তো একটু মিটল

যেটির শুরু দুঃস্বপ্ন দিয়ে, শেষ আরও বড় দুঃস্বপ্নে। গত বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচের হেডিংটা মনে ফিরে ফিরে আসছে তো এই কারণেই। সমস্যা একটা আছে বটে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়কে আপনি দুঃস্বপ্নের স্কেলে এগিয়ে রাখবেন, নাকি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এভাবে উড়ে যাওয়াটাকে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব সহজ নয়।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশকে নিয়ে কথা বলতে গেলে ওই ‘দুঃস্বপ্ন’ কথাটা অবশ্য চাইলে অনেকবারই ব্যবহার করতে পারবেন। ২০০৭ সালে একেবারে প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওই একটা জয় ছাড়া মূল পর্বে একটা ম্যাচও জিততে পারেনি বাংলাদেশ...এতদিনে আপনার মুখস্থ হয়ে যাওয়া এই তথ্যটাই তো বাংলাদেশের দৈন্য বোঝাতে যথেষ্ট। প্রাথমিক পর্ব চালু হয়েছিল বলে আরও কয়েকটা জয়ের মুখ দেখা গেছে, তবে হংকং আর স্কটল্যান্ডের সঙ্গে পরাজয়ও তো আছে সেই জয়গুলোর পাশে। মূল পর্বও ধরলে ২০০৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়টাও সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ কখনোই বলার মতো কোনো দল নয়। তবে এবার অদ্ভুত একটা বছরই কাটছে টি-টোয়েন্টির বাংলাদেশের। এই বছরেই অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে প্রথম জয়। শুধুই একটা বা দুটি ম্যাচ জয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে যা রূপ পেয়েছে সিরিজ জয়েও। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড না হয় মিরপুরের অবদান, এর আগে তো দেশের বাইরেও সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। হোক না তা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এতগুলো জয়ের স্মৃতি আর কিছু না হলেও মানসিকভাবে একটু হলেও তো বিশ্বকাপে চাঙা রাখার কথা ছিল। তাহলে এমন করুণ অবস্থা কেন?

এই ছবিটাই বিশ্বকাপের বাংলাদেশ

হ্যাঁ, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি মনে আছে। একটু এদিক-ওদিক হলে দুটিতেই জিতেও যেতে পারত বাংলাদেশ। তবে প্রাথমিক পর্ব নামে আদতে বাছাই পর্ব পেরোতেই যেমন ঘাম ছুটে গেছে, তাতে ওই দুটি ম্যাচকেও মনে হচ্ছে ‘দুর্ঘটনা’!  

অদ্ভুত একটা বছরের কথা বলছিলাম। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ এত ম্যাচ এর আগে জিতেছে বলে মনে হয় না। আবার চারবার এক শর নিচে অলআউটও হয়েছে এই বছরই। টেস্ট খেলুড়ে আর কোনো দেশের এমন অপদস্থ হওয়ার ঘটনা নেই। এই বিশ্বকাপের দিকে ফিরে তাকালে তাই শ্রীলঙ্কা-ওয়েস্ট ইন্ডিজ মনে পড়ে না, মনে পড়ে পরপর দুই ম্যাচে ৮৪ ও ৭৩। মনে পড়ে একটার পর একটা বিতর্ক। যার শুরু আসলে বিশ্বকাপের দল ঘোষণারও আগে থেকে। নিজের ফেসবুক পেজে এসে ভিডিও বার্তায় তামিম ইকবালের নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ওই ঘটনাটাকে এখন কেন যেন মনে হচ্ছে ক-ত-দি-ন আগের ঘটনা! তামিমকে কোচ চাননি, অধিনায়কেরও তিনি প্রথম পছন্দ ছিলেন না...এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল বটে। তবে সেটি তো চাপাই পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ দল ওমান রওনা হওয়ার আগে।

ওপেনারদের ব্যর্থতায় তামিম থাকলেই ভালো হতো কি না, এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে এটা খুব জরুরি প্রশ্ন নয়। সবচেয়ে জরুরি হয়ে যে প্রশ্নটা এখনো ফণা তুলছে, তা হলো, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়ের পরদিন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের প্রকাশ্যে অমন সিনিয়র খেলোয়াড়দের নাম ধরে ধরে সমালোচনা করাটাই এই বিশ্বকাপ-ভরাডুবির সুর বেঁধে দিয়েছিল কি না! নাজমুল হাসান যে আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন,পরপর তিনটা প্রেস কনফারেন্সে সাকিব, মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকের পাল্টা জবাব সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার কাজটা করেছে। বোর্ড, সংবাদ মাধ্যম, সমর্থক সবাই যেন প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে বাংলাদেশ দলের। সেই চাপেই এমন ভরাডুবি কি না, সুনির্দিষ্টভাবে কারোরই তা বলতে পারার কথা নয়। তবে চাইলে তো মেলানোই যায়। তবে এমন ঘটনা এর আগেও বাংলাদেশের ক্রিকেটে হয়নি, তা নয়। এবার যাতে নতুন সংযোজন, ক্রিকেটারদের পরিবারেরও এতে জড়িয়ে পড়া। মাশরাফি ও তামিমের দিকে ইঙ্গিত করে সাকিবের স্ত্রীর স্ট্যাটাস, মাশরাফির ভাইয়ের ঝাঁজালো জবাব...সবকিছু মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই মনে হয়েছিল, রীতিমতো এক সার্কাস চলছে।  

এসব পুরোনো কথা নতুন করে টেনে আনছি কেন? প্রতীকী বলেও ধরতে পারেন এটাকে। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাংলাদেশকে মনে রাখার মতো আর কিছু দিয়েছে নাকি!

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×