মুমিনুল কি আরেকটু আক্রমণাত্মক হতে পারতেন?

শুভ্র.আলাপ

২৭ নভেম্বর ২০২১

মুমিনুল কি আরেকটু আক্রমণাত্মক হতে পারতেন?

মুমিনুলের মাথায় অনেক বোঝা

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক সমস্যার মধ্যে এটাও একটা যে, এখানে ক্যাপ্টেন তৈরি করার কাজটা একেবারেই অবহেলিত। উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব শো শুভ্র.আলাপে চট্টগ্রাম টেস্টে মুমিনুল হকের ক্যাপ্টেনসি নিয়ে কথা উঠেছিল। যে প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ক্রিকেট কোচ ও বিশ্লেষক নাজমূল আবেদীন ফাহিম এই উপেক্ষিত দিকটিতে আলো ফেললেন।

ক্রিকেটের মতো আর কোনো খেলায় অধিনায়ক এমন স্পটলাইটের নিচে থাকেন না। প্রশংসা হয়, সমালোচনা হয়। সেই সমালোচনাও হরেক রকম। একজন অধিনায়কের কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে যেমন সমালোচনা হতে পারে, তেমনি কোনো একটা সিদ্ধান্ত না নেওয়া নিয়েও। বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহর ডানহাতি-বাঁহাতি তত্ত্বে অতিরিক্ত বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে তুমুল। গত বছর চট্টগ্রামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চতুর্থ ইনিংসে ৩৯৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জিতে যাওয়ার পরও টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুলের অধিনায়কত্ব নিয়ে হয়েছিল সমালোচনা আর সমালোচনা। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনেও মুমিনুলের ক্যাপ্টেনসি নিয়ে সমালোচনা করছেন কেউ কেউ। অবশ্য অধিনায়কত্বটা করে করে শেখারও বিষয় বটে। এবং সেই শেখার প্রধান মঞ্চই তো হচ্ছে ঘরোয়া ক্রিকেট। কিন্ত আমাদের দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কি আসলেই একজন ক্যাপ্টেন গড়ে উঠার উপযুক্ত মঞ্চ? 

ক্রিকেট বিশ্লেষক ও কোচ নাজমূল আবেদীন ফাহিম বলছেন, ‘আমরা আমাদের ক্যাপ্টেনদের অকারণেই অনেক কিছু বলি। আমরা কিন্ত ক্যাপ্টেন তৈরি করি না। আমাদের দেশে ক্যাপ্টেন তৈরি করার কোনও সিস্টেমই নাই। আমাদের ছেলেরা ক্লাবে যখন খেলে, ক্লাবে অনেক লোকজন থাকে যারা সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নেয়। টসে জিতলে কী করতে হবে, ব্যাটিং অর্ডারটা কী হবে, কাকে কখন বোলিং দেওয়া হবে, কখন চার মারবে কখন ছয় মারবে সবকিছু বাইরে থেকেই সিদ্ধান্ত হয়। ক্রিয়েটিভিটি যে ব্যাপারটা, যার মধ্যে সে ক্ষমতা আছে, সে-ও সেটা কিন্তু এর চর্চা করতে পারে না। চর্চা না করলে আসলে এগুলো হয় না। কাউকে না কাউকে ক্যাপ্টেনসি দিতে হবে বলেই আমরা দিয়ে দিই। কিন্ত ক্যাপ্টেন তৈরি করি না।’

শুধু টেস্ট ক্যাপ্টেন বলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুমিনুলের ক্যাপ্টেনসি করার সুযোগ অনেক দিন পরপর আসে। পাকিস্তানের সাথে চলতি টেস্টে দ্বিতীয় দিনে ৫৭ ওভার বোলিং করেও কোনো উইকেট তুলে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফিল্ডিংয়ে একটা সময় মুমিনুল তিন-চারজন ফিল্ডার বাইরে রাখছিলেন। পাকিস্তানের দুই ওপেনার আবিদ আলী ও আবদুল্লাহ শফিক পাঁচ উইকেট নেওয়া হাসান আলীর মতে ‘ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো, বোলিংয়ের জন্য কঠিন’ পিচে বেশ স্বচ্ছন্দেই ছিলেন। কোনো ঝুঁকি না নিয়েই সহজেই স্ট্রাইক অদল-বদল করতে পারছিলেন। ফিল্ড প্লেসিং দেখেও মনে হতে পারত, রান বাঁচাতে পেরেই বাংলাদেশ খুশি। 

উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব শো শুভ্র.আলাপে অতিথি হয়ে এসে নাজমূল আবেদীন ফাহিম অবশ্য বলেছেন এর বাইরে কিছু করারও ছিল না, ‘একজন ক্যাপ্টেন কত কী করতে পারবে? হ্যাঁ, চাইলে ও হয়তো সিলি মিড অন বা সিলি মিড অফ নিয়ে আসতে পারে, দেখাতে পারে যে খুব ইনিসিয়েটিভ নিচ্ছে, কিন্ত বোলারদের সেই প্রভাবটা তো থাকতে হবে ব্যাটসম্যানদের ওপরে যে, হ্যাঁ ব্যাটসম্যান একটু হলেও বিভ্রান্ত হচ্ছে। একটু হলেও বিপদে পড়ছে কোনো একটা বলে। একটা বল হঠাৎ করে ভেতরে ঢুকে গেল, একটা বল হঠাৎ করে ইয়র্কার হয়ে বিপদে ফেলে দিল ব্যাটসম্যানকে। এমন কিছু তো খুব একটা হচ্ছে না। ক্যাপ্টেন বোধ হয় এখন ভাবছে কিভাবে রান কম দিয়ে সময় বাঁচানো যায়। নেগেটিভ থিংকিংটাই বোধ হয় অনেক বেশি এই মুহূর্তে আছে।’

কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছে না, সহজে রানের সুযোগ না দিয়ে ব্যাটসম্যানদের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে, কিংবা অন্য কোনোভাবে ক্যাপ্টেন মুমিনুল ভিন্ন কিছু করতে পারতেন না? নাজমূল আবেদীন ফাহিম বলছেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের কথা যদি আমরা বলি, হ্যাঁ, মার্ক টেলর একজন দারুণ ক্যাপ্টেন ছিল, সেভাবে মাশরাফির কথা আমরা বলি, মাশরাফি বোধ হয় কিছুটা হয়ে গেছে কেমন করে জানি আমি বলবো। সাকিব সারা পৃথিবী ঘুরেছে, অনেক দেখেছে এবং ও প্রাকৃতিক ভাবে একটু ভিন্ন। এদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা আছে। এর বাইরে আমরা কিন্তু ক্যাপ্টেন তৈরি করিনি, এটা আমাদেরই দোষ।’ 

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে আমাদের দলের শক্তির জায়গাটা যদি আমরা দেখি, সেখানেও কিন্ত যথেষ্ট ঘাটতি আছে। আমাদের সেই মানের ক্যাপ্টেন আমরা তৈরি করতে পারিনি। এর মধ্যে থেকেও হয়তো বোলারের সাথে বুদ্ধি করে আলাপ করে নির্দিষ্ট কোনো দিক দিয়ে কোন ব্যাটসম্যানকে প্রলুব্ধ বা হতাশ করে কিছু একটা করার যে চেষ্টা, সেগুলা হতে পারত।’ 

বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের একটা সময়ে মিরাজ-তাইজুলরা চারজন ফিল্ডার বাইরে রেখেই বোলিং করে গেছেন। লেগ সাইডে তিন ফিল্ডার বাউন্ডারিতে, অথচ ব্যাটসম্যানেরা তেমন আক্রমণাত্মকই ছিলেন না। ওয়ানডে ক্রিকেটেরই ছাপ যেন দেখা গেল সাদা পোশাকের খেলায়। মুমিনুল কি আরেকটু আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাজাতে পারতেন না? নাজমূল আবেদীন ফাহিম সেই কারণটার মূলে গিয়েই বলেছেন, ‘ফিল্ড সেটিংটা আক্রমণাত্মক হবে কি না, এটা আসলে নির্ভর করে বোলাররা কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারছে ব্যাটসম্যানদের ওপরে। আজকে বোলাররা কিন্ত তেমন একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছিল না, সে কারণেই হয়তো ক্যাপ্টেন কিছুটা রান বাঁচানোর দিকে মনযোগ দিয়েছিল। যদি এমন হতো, উইকেটে টার্ন হচ্ছে, ব্যাটসম্যান দুই একটা বলে বিট হয়ে যাচ্ছে বা ব্যাটে লেগে কিংবা প্যাডে লেগে এদিক-ওদিক বল গিয়েছে, তেমন একটা আমরা দেখিনি কিন্ত। হ্যাঁ, দু-একটা আপিল হয়েছে, যেমন তাইজুলের একটা আউট ছিল ওইটা আমরা রিভিউ নেইনি। সেটা ভিন্ন বিষয়।’

‘বোলাররা তেমন একটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে তা কিন্ত না। তো এরকম একটা পরিস্থিতিতে এবাদতের বোলিংয়ে তিনটা স্লিপ, একটা গালি রেখে দিই, দেখতে অনেক অ্যাটাকিং মনে হবে ঠিকই। কিন্ত তাঁর বোলিং ক্ষমতা এবং ব্যাটসম্যানের খেলার ধারা, তার সাথে কিন্ত সেটা মিলবে না। অনেক সময় ব্যাটসম্যানের রানটা আটকে রাখতে পারলে হয়তো ব্যাটসম্যান কিছুটা চাপে পড়ে। কারণ কোন ব্যাটসম্যানই ডট বল পছন্দ করে না। সেটা টেস্ট ক্রিকেটে হলেও। হয়তো উইকেট পড়লে আমরা দেখব, এক্সট্রা স্লিপ হয়তো চলে আসবে কিংবা সিলিতে একটা প্লেয়ার চলে আসবে। একটা উইকেট পড়ার অপেক্ষায় হয়তো আছে ক্যাপ্টেন।’

টেস্টের তৃতীয় দিনে মুমিনুলের জন্য, বাংলাদেশের জন্য কী অপেক্ষা করছে কে জানে! তবে ভবিষ্যত চিন্তায় আমাদের ক্রিকেটার গড়ে তোলার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন গড়ে তোলার ব্যাপারটাও আসা উচিত বলেই মনে করেন নাজমূল আবেদীন ফাহিম, ‘এটাও কিন্ত খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার। আমাদের ক্রিকেট সিস্টেমের মধ্যে সে জিনিসটার খুব অভাব আছে। আমার মনে হয় সেদিকেও আমাদের খুব মনোযোগ দিতে হবে। কারণ একজন ভালো ক্যাপ্টেন খুব বেশি গুরুত্বপুর্ণ ক্রিকেটের মাঠে। কাজেই ভালো ক্যাপ্টেন ছাড়া এগুনো খুব মুশকিল।’

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×