পেশোয়ার-মুলতানের সঙ্গে মিলটা শেষ হোক এখানেই

উৎপল শুভ্র

২৮ নভেম্বর ২০২১

পেশোয়ার-মুলতানের সঙ্গে মিলটা শেষ হোক এখানেই

ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়েও বাংলাদেশের দারুণ কামব্যাকের সাক্ষী চট্টগ্রাম টেস্ট। দুইয়ে মিলে বড় একটা ঘটনাও ঘটে গেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২ নম্বর টেস্টে মাত্রই তৃতীয়বার প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের লিড। প্রথম দুবার দেড় যুগেরও বেশি আগে। শেষটা অবশ্য না মিলে গেলেই ভালো!

প্রথম ইনিংসে ৪৯ রানে ৪ উইকেট পড়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৫ রানে। নৈরাশ্যবাদী হলে এটাকেই আপনি বড় করে দেখবেন। ভুলে যাবেন চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম তিন দিনে বাংলাদেশের বাকি সব প্রাপ্তির কথা। তা বড় অন্যায় হবে।

দুই ইনিংসেই টপ অর্ডারের এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া নিয়ে মন খারাপ করতেই পারেন। মন খারাপ থেকে রাগ-ক্ষোভ…এবং বাংলাদেশ কিচ্ছু পারে না সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ারও যথেষ্টই আশঙ্কা। ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়েও বাংলাদেশের দুর্দান্ত কামব্যাক হয়তো তখন মূল্যই পাবে না আপনার কাছে। তা বড় অন্যায় হবে।

৪ উইকেটে ৪৯ অবশ্যই খারাপ কথা। তবে এর ভালো দিকও কি নেই! সেটি আবার কেমন? কেন, ৪৯ রানে ৪ উইকেট পড়ে গেছে বলেই না বাংলাদেশের ৩৩০ রানের প্রথম ইনিংস আরও মহিমান্বিত। এক সময় পাকিস্তান ছিল বিনা উইকেটে ১৪৬, এটা মনে রাখলে যেমন বেড়ে যাচ্ছে ২৮৬ রানে ওদের আটকে দেওয়ার মহিমা।

দুইয়ে মিলে বড় একটা ঘটনাও ঘটে গেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২ নম্বর টেস্টে মাত্রই তৃতীয়বার প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের লিড। প্রথম দুবার দেড় যুগেরও বেশি আগে। যা এসেছিল চরম এক (আসলে দুই) বিস্ময় হয়ে। টেস্ট ক্রিকেটে হাঁটি হাঁটি পা পা সময়ে ২০০৩ সালের পাকিস্তান সফরে পরপর দুই টেস্টে বাংলাদেশের লিড নেওয়ার সেই বিস্ময় এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারি। বাংলাদেশের কোচ ডেভ হোয়াটমোরও যা গোপন করতে পারেননি। 

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকেও মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। পেশোয়ারে ৬৬ রানের লিড নিয়েও হারতে হয়েছিল ৯ উইকেটে। মোহাম্মদ হাফিজের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তান যে হেসেখেলে ১৬৫ করে জিতে যায়, এটা অবশ্য একদমই ওই টেস্টের হাইলাইট নয়। হাইলাইট শোয়েব আখতারের বিধ্বংসী এক স্পেল। লাঞ্চের পর হঠাৎই কোন জাদুমন্ত্রবলে অমন ভয়ঙ্কর রিভার্স সুইং করতে শুরু করেছিল বল, এই প্রশ্নের উত্তর আজও রহস্যাবৃত। তবে অনুমান তো করাই যায়। ওই রিভার্সে ২ উইকেটে ৩১০ থেকে চোখের পলকে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে ৩২০! সেখান থেকে ৩৬১-ও কম ছিল না।

কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৯৬ রানে গুটিয়ে যাওয়ায় তা আর সুখস্মৃতি হয়ে থাকেনি। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেটের সঙ্গে আরও ৪ উইকেট যোগ করে শোয়েব ম্যাচ-সেরার ট্রফি নিয়ে ফিরে গেলেন ইংল্যান্ডে। কাউন্টি দল ডারহাম থেকে যে দুই টেস্টের জন্যই ছুটি নিয়ে এসেছিলেন। এর প্রথমটি খেলেছিলেন করাচিতে। মুটিয়ে যাওয়া, গরমে মাঠে হাসফাঁস করতে থাকা শোয়েব আখতারকে যেখানে পাকিস্তানের বোঝা আর বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ বলে মনে হয়েছিল। সেই সিরিজের পাকিস্তান অধিনায়ক রশিদ লতিফ ‘আনফিট এক বোলার’কে নিয়ে খেলতে হওয়ার বিরক্তি গোপন করতে চেয়েও পারেননি। পরের টেস্টেই কিনা নায়ক ওই ’আনফিট বোলার’! 

পেশোয়ারে লিড নেওয়াটা নিছকই দুর্ঘটনা বলে মনে হওয়ার যথেষ্টই কারণ ছিল। মুলতান তাই শুধু বিস্ময় নয়, এসেছিল মহাবিস্ময় হয়ে। এখানে যে লিড আরও বড়। বাংলাদেশের ক্রিকেটে চিরন্তন এক দু:খগাথা হয়ে থাকা সেই টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১০৬ রানের লিড। দ্বিতীয় ইনিংস ১৫৪ রানে শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যে কারণ ছুঁড়ে দেওয়া পাকিস্তানের সামনে ২৬১ রানের টার্গেট। যা ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই মনে হচ্ছিল প্রায় পুরোটা সময়। তারপরও বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের স্বপ্ন কিভাবে মরীচিকা হয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল, সেই কাহিনি বহুল চর্চিত। ইনজামাম-উল হকের পুনর্জন্ম ঘটানো সেই সেঞ্চুরি এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেটে দগদগে এক ক্ষত হয়ে আছে।

চট্টগ্রামে প্রথম ইনিংসে ৪৪ রানের লিড। দিনশেষে যা বেড়ে হয়েছে ৮৩। হাতে এখনো ৬ উইকেট। শেষটায় কী লেখা আছে কে জানে, তবে প্রথম তিন দিনে টেস্ট ক্রিকেট কিন্তু পূর্ণ মহিমায় প্রকাশিত। প্রথম দুদিন উইকেট যা পড়েছে, তা শুধুই প্রথম সেশনে। তৃতীয় দিনে উইকেট যখন ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ হওয়ার কথা, সেদিন তিন সেশনেই উইকেটপ্রপাত! এক দিনেই ১৪ উইকেট!

শুনে মনে হতেই পারে, সাগরিকার পিচ না জানি কী ভয়ঙ্কর! খেলা দেখে থাকলে আপনিও জানেন, তা একেবারেই ভুল কথা। তাহলে এক দিনে ১৪ উইকেটের ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা দারুণ বোলিংয়ের সঙ্গে ব্যাটসম্যানদের ভুল। কখনো হঠাৎ ভুল হয়ে যাওয়া, যেমন মুমিনুল। আবার কখনো বা টেকনিকের দীনতা প্রকাশ পেয়ে যাওয়া, যেমন সাইফ আর শান্ত। ধরে ধরে বললে এমন আরও বলা যাবে। ক্রিকেটে তো বেশির ভাগ আউটই বোলারদের কৃতিত্বের চেয়ে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাতে।

কথাটা লিখতে লিখতেই চোখে ভাসছে তাইজুলের মুখ। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সেরা বোলিং এই বাঁহাতি স্পিনারের। কিন্তু কখনো কখনো ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮ উইকেটের চেয়েও যে এগিয়ে রাখতে ইচ্ছা করছে এ দিনের ৭ উইকেটকে। চট্টগ্রামের এই উইকেট তো মিরপুরের মতো চষা খেত নয়। এখানে তাইজুলের প্রতিটি উইকেট ধৈর্য্য, দক্ষতা আর ঐকান্তিকতার পুরস্কার। 

এবাদতের কথা ভুলে গেলেও অন্যায় হবে। টেস্টটা শুরু করেছিলেন ৯১ ছাড়ানো বোলিং গড় নিয়ে। বোলিং গড় এক শ ছুঁইছুঁই, ব্যাটিং গড় ভগ্নাংশ পেরিয়ে পূর্ণ সংখ্যার রূপ পেতেও ব্যর্থ। দুইয়ে মিলে টেস্ট স্পেশালিস্ট কথাটা পরিণত হয়েছিল হাস্যরসিকতার বিষয়ে। সেই এবাদতই এদিন গতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের সুষম মিশেলে আদর্শ এক ফাস্ট বোলার। অন্য প্রান্ত থেকে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের গলায় ফাঁসটা একটুও আলগা হতে না দেওয়ারও তো ভূমিকা আছে তাইজুলের সাফল্যে। সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ’গুড বোলিং ডে’র তালিকার ওপরের দিকেই থাকবে এই দিনটি।

প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেটে ৪৯ রানের মহিমার কথা বলছিলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ২৫ নিয়েও কি বলা যাবে এমন কিছু? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে পেশোয়ার আর মুলতানের চেয়ে চট্টগ্রাম ব্যতিক্রমী কিছু হবে নাকি নতুন সংযোজন! 

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×