মাতারা হারিকেনের সঙ্গে মাতারায়

উৎপল শুভ্র

৩ এপ্রিল ২০২১

মাতারা হারিকেনের সঙ্গে মাতারায়

মাতারায় আরও কিছু থাকতে পারে। তবে ক্রিকেট অনুরাগীদের কাছে মাতারা মানেই সনাৎ জয়াসুরিয়া। মাতারা হারিকেন! এর আগে কত দেশে, কত শহরেই তো কথা বলেছি, তবে মাতারায় বসে মাতারা হারিকেনের সঙ্গে কথা বলাটা অবশ্যই আলাদা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা ট্যুর করে দিয়েছিল সেই সুযোগ।

প্রথম প্রকাশ: ৪ মার্চ ২০১৩। প্রথম আলো।

আরে, ওটা কে বসে আছে! সনাৎ জয়াসুরিয়া না? উনি কোত্থেকে উদয় হলেন?

এত বছর পর মাতারায় কোনো আন্তর্জাতিক দল খেলছে, মাতারার সবচেয়ে বিখ্যাত ক্রিকেট-সন্তানের তো মাঠে থাকারই কথা। সেটি তাঁর দায়িত্বের অংশও। ‘মাতারা হারিকেন’ যে এখন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের প্রধান নির্বাচক। তারপরও কাল সকালে ওয়াইনওয়াত্তা স্টেডিয়ামের প্যাভিলিয়নের দোতলায় জয়াসুরিয়াকে দেখে অমন চমকে উঠলাম কেন?

কারণ আগের দিনই মাতারার মহামায়া রোডে জয়াসুরিয়াদের বাড়িতে গিয়ে জেনেছি, এই ম্যাচের প্রথম দিন অন্তত তাঁর থাকার সম্ভাবনা নেই। তিনি আছেন কুয়েতে। মাঠে শুনে গিয়েছি, পরদিন জয়াসুরিয়া থাকবেন। তারপরও না-থাকার খবরটাকেই বেশি বিশ্বাস্য মনে হয়েছিল, কারণ সেটি দিয়েছিলেন তাঁর বাবা-মা। 

অনেক দিনের পরিচয়ের সূত্রে অনুযোগও করলাম, ‘আপনি তো দেখছি পাঠকদের কাছে আমার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন। আপনার বাবা-মায়ের কথা শুনে লিখে দিলাম আপনি কুয়েতে আর এখন দেখি আপনি মাঠে!’ জয়াসুরিয়া হেসে বললেন, ‘কুয়েতেই ছিলাম। ভোর পাঁচটায় কলম্বোতে নেমে সেখান থেকে সরাসরি মাঠে চলে এসেছি।’ তা আপনি আসছেন, আপনার বাবা-মা তা জানতেন না? জয়াসুরিয়া বললেন, ‘না, জানানোর সময় পাইনি।’

তাঁর মাপের ক্রিকেটারদের মধ্যে জয়াসুরিয়ারই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ইন্টারভিউ করেছি। কখনো ‘না’-তো করেনইনি, এমনকি প্রতিশ্রুতি রাখতে একবার কলম্বোর তাজ সমুদ্র হোটেলে একই ফ্লোরে আমার রুমে এসে পর্যন্ত ইন্টারভিউ দিয়ে গেছেন।

মাতারার এই গণ্ডগ্রাম থেকে উঠে গিয়ে সনাৎ জয়াসুরিয়ার ব্যাট হাতে বিশ্বজয় ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর একটি। এখন অবশ্য ‘গণ্ডগ্রাম’ বলাটা একদমই ভুল হবে। জয়াসুরিয়ার শৈশব-কৈশোরে মাতারা হয়তো গণ্ডগ্রামই ছিল। কিন্তু এখন সেটি ছিমছাম সুন্দর এক শহর। শহর মানে শহরই, সমুদ্রপারের শহরগুলোর বাড়িঘর-দোকানপাটে যেমন একটা ঝুপড়ি-ঝুপড়ি ভাব থাকে, সেটি একেবারেই নেই। 

২০০৪ সালে সুনামিতে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল এই মাতারা। পলহেনা গার্ডেন রিফ নামে যে হোটেলে আছি, সেটির বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যায়। সেখানে বসলেই মনে হয়, আবার যদি ফিরে আসে ২০০৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর! এই পলহেনা সৈকতের আশপাশের সব বাড়িঘরকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দিয়েছিল ওই সুনামি। পাকা বাড়ি বলে হোটেলটা টিকে গেছে। ওই দিনটির কথা তুললে স্থানীয় লোকজন এখনো শিউরে ওঠেন। সেটিই স্বাভাবিক। সেদিন এখানে থাকলে আমারও একই অনুভূতি হতো। ছিলাম না বলেই ওই সুনামির রাতের কথা উঠলে আমার উল্টো একটা সুখস্মৃতি মনে পড়ে যায়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ হারিয়েছিল ভারতকে। এখন বাংলাদেশ দলের বড় বড় অনেক জয় আছে। সেই সময়ে ভারতকে হারানো ছিল অভাবনীয় এক আনন্দে ভেসে যাওয়ার উপলক্ষ।

সুনামির সেই দুঃস্বপ্ন ভুলে শহরটার যেন পুনর্জন্ম হয়েছে। জয়াসুরিয়াও খুব গর্ব করে সেটি বললেন, ‘সুনামি অনেক দিন আগের ব্যাপার। সেই ধাক্কা আমরা সামলে উঠেছি। দেখেছেন নিশ্চয়ই, রাস্তাঘাট কত সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।’

তা তো দেখেছিই। তবে এখানে কথাটা জয়াসুরিয়া এই শহরের ছেলে হিসেবে বললেন নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে? মাঠে জয়াসুরিয়াকে দেখে অবশ্য সংসদ সদস্য মনে করার কোনো কারণই নেই। বাংলাদেশে সংসদ সদস্যরা নিজের এলাকায় গেলে যেমন চারপাশে মাছির মতো মানুষের ভিড় জমে থাকে, এখানে সংস্কৃতিটা মোটেই এ রকম নয়। কিছুক্ষণ পর দোতলা থেকে নেমে নিচে গ্যালারিতে সাধারণ দর্শকদের পাশে বসে কিছুক্ষণ খেলা দেখলেন। তাঁকে ঘিরে বাড়তি কোনো ঔৎসুক্য নেই। যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখনো তিনি একা। একটু অবাকই হলাম। সংসদ সদস্য হিসেবে না হোক, এত বড় একজন ক্রিকেট তারকাকে নিয়েও কোনো হুল্লোড় উঠবে না! শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট-সংস্কৃতিটা আসলেই এই উপমহাদেশের মধ্যে ব্যতিক্রমী।

তাঁর মাপের ক্রিকেটারদের মধ্যে জয়াসুরিয়ারই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ইন্টারভিউ করেছি। কখনো ‘না’-তো করেনইনি, এমনকি প্রতিশ্রুতি রাখতে একবার কলম্বোর তাজ সমুদ্র হোটেলে একই ফ্লোরে আমার রুমে এসে পর্যন্ত ইন্টারভিউ দিয়ে গেছেন। কালও ইন্টারভিউ করলাম। আগেরগুলোর সঙ্গে পার্থক্য হলো, ক্রিকেটের চেয়ে রাজনীতি নিয়েই বেশি কথা হলো। মাতারার জয়াসুরিয়ার সঙ্গে মাতারায় বসে কথাও এই প্রথম।

যখন বেরিয়ে যাচ্ছেন, মনে হলো একটা প্রশ্ন তো করা হয়নি। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্সের এমপি তিনি। যাঁর ছায়ায় তাঁর ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠা, সেই অর্জুনা রানাতুঙ্গা আছেন বিরোধী দলে। জয়াসুরিয়ার দলের তীব্র সমালোচকও তিনি। রানাতুঙ্গার সঙ্গে সম্পর্কটা কি তাহলে আগের মতোই আছে? জয়াসুরিয়া দাবি করলেন, তা-ই নাকি আছে! প্রায়ই তাঁদের কথাও হয়।

রানাতুঙ্গাকে কি এখনো তাঁর ক্যাপ্টেন বলেই মানেন? ‘হি ওয়াজ আ গুড প্লেয়ার’—জয়াসুরিয়ার এই কথায় প্রশ্নের উত্তরটা ঠিক পেলাম না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×