আইপিএলের মোস্তাফিজ: এই ভালো, এই মন্দ

রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

৮ অক্টোবর ২০২১

আইপিএলের মোস্তাফিজ: এই ভালো, এই মন্দ

মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি: রাজস্থান রয়্যালস

কোনোদিন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে ২০ রান খরচায় পাচ্ছেন তিন উইকেট, কোনোদিন বা আবার পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ১৯তম ওভারে ৪ রান দিয়ে জিতিয়ে দিচ্ছেন দলকে। এবারের আইপিএলে এমন অনেক স্মরণীয় পারফরম্যান্সই উপহার দিয়েছেন মোস্তাফিজ। তবুও মৌসুম শেষে দেখা যাচ্ছে, তাঁর ইকোনমি রেটটা সাড়ে ৮ ছুঁইছুঁই। কারণটা খুঁজতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে, বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষেই মোস্তাফিজের আসল সমস্যা। ১০.১৫ ইকোনমি রেট-ই যা জানিয়ে দিচ্ছে।

প্রশ্নটা এমনিতেই উঠত। যে টুর্নামেন্টে নজর থাকে লক্ষ-কোটি চোখের, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও মাস দুয়েকের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে ওই টুর্নামেন্টের জন্য জায়গা করে দিতে; সেখানে ১৪ ম্যাচ খেলে মোস্তাফিজুর রহমান কেমন করলেন, তা জানতে কৌতূহল হওয়া তো খুবই স্বাভাবিক। আইপিএলের দ্বিতীয় পর্বটা হচ্ছে আরব আমিরাতে, প্রথম পর্বের বাধা টপকাতে পারলে বাংলাদেশ আর দিন পনেরোর মধ্যেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবে ওখানেই; এই দুটি তথ্য তো বাড়তি তাৎপর্য যোগ করেই।

১৩ ইনিংসে ৪৭.৫ ওভার বল করে ১৪ উইকেট। ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৮.৪৭ করে। সংক্ষেপে এই হলো ২০২১ আইপিএলের মোস্তাফিজুর রহমান। যে ২০১৮ আইপিএল দেখে মোস্তাফিজ ফুরিয়ে গেছেন বলে গুঞ্জন উঠতে শুরু করেছিল, সেবারকার পরিসংখ্যানও এর চেয়ে বেশ কিছুটা ভালো। যা দেখে আপনার মনে হতেই পারে, মোস্তাফিজের প্রস্তুতিতে বিরাট এক খামতিই রয়ে গেল।

তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরেকটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কিছু ব্যাপার দেখে নিলে ভালো হয় না? ১৩ ইনিংস বোলিং করে মোস্তাফিজ ৪০৫ রান দিয়েছেন সত্যি; কিন্তু এর মধ্যে ২৩৬-ই তো ছয় ম্যাচে। অর্থাৎ, বাকি সাত ম্যাচে রান দিয়েছেন ১৬৯, ম্যাচপ্রতি সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ২৪.১-এ। পারফরম্যান্সের এমন উত্থান-পতনে একটা কথাই বলা চলে, 'ধারাবাহিকতার অভাব'।

তবুও কবজি দিয়ে যা-ইচ্ছে-তাই করেছেন, সঙ্গে বেশ কয়েকটা ম্যাচ উইনিং পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন বলে মোস্তাফিজের নামটা আলোচনায় এসেছিল ভালোই। আর রাজস্থান রয়্যালসের বোলিং লাইনআপও এবার মোস্তাফিজের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিল বাড়তি দায়িত্ব। জফরা আর্চারকে পাওয়া যায়নি পুরো টুর্নামেন্টেই, ক্রিস মরিসও নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন আইপিএলের দ্বিতীয়ার্ধে। কার্তিক ত্যাগী-চেতন সাকারিয়াদের মতো তরুণদের পথ দেখাতে হয়েছে মোস্তাফিজকেই, কিছু ম্যাচে সেটা নতুন বল হাতে নিয়েও।

২০১৭ আইপিএলে মোস্তাফিজ ম্যাচ খেলেছিলেন মাত্র একটা, এই আলোচনায় ওই মৌসুমকে তাই এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। বাকি দুই মৌসুম, অর্থাৎ ২০১৬ কিংবা ২০১৮, নতুন বল হাতে কী করবেন, সেটা নিয়ে মোস্তাফিজকে ভাবতে হয়নি খুব একটা। ২০১৬ সালে কোনো প্রান্ত থেকেই বোলিংয়ের উদ্বোধন করেননি, ২০১৮ সালে করেছিলেন মাত্র একবার। কিন্তু এই মৌসুমে ইনিংসের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ওভারে তিনি বল হাতে নিয়েছেন অন্তত পাঁচ ম্যাচে। সেখানে ৪১ রান দিলেও উইকেটের কলামটা শূন্য। যদিও উইকেট পেতে পারতেন টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় বলেই, মায়াঙ্ক আগারওয়ালের প্যাডে লাগা বলটাকে থার্ড আম্পায়ারের কাছে পাঠাতে হতো সেক্ষেত্রে।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, আইপিএলে গিয়ে প্রতিপক্ষ টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের মোস্তাফিজ সবচেয়ে বেশি বল করেছেন এবারই। তাঁর ১৪ উইকেটের ৬টি প্রতিপক্ষ লাইন-আপের এক থেকে তিনে ব্যাট করা ব্যাটারের। তবে, ৮.৮৮ ইকোনমি রেটটা বলছে, আউট হওয়ার আগে মোস্তাফিজকে তাঁরা সহজেই খেলেছেন।

মোস্তাফিজকে সহজে খেলার কথা যদি বলা হয়, তো বাঁহাতি ব্যাটসম্যানরাই সেটা সবচেয়ে ভালো পেরেছেন। মোস্তাফিজের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হওয়ার কথা এখন এটাই। নিজে বাঁহাতি হলেও এই আইপিএলে সমগোত্রীয়দের বিপক্ষে মোস্তাফিজের দিশেহারা দশাও স্পষ্ট হয়েছে প্রকটভাবে।

এই আসরেই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে পাওয়ার-প্লেতে মোস্তাফিজ বল করেছেন সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের জার্সিতে যা করেছিলেন, তার চেয়ে পারফরম্যান্সে কিছুটা উন্নতি হলেও সেটাকে 'ভালো'র স্বীকৃতি দেওয়া যাচ্ছে না। ইকোনমি রেট এখনো ৯.২০, ২০১৬ মৌসুমের ওভারপ্রতি ৫.৪৮ রান খরচার খতিয়ান এখন কেবল আক্ষেপই জায়গায়, 'কী একটা বোলার ছিলেন!'

পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার অভাবের কারণটাও বোঝা যাচ্ছে ওপরের ছবি থেকেই। বোলিংটাই যে ধারাবাহিক হচ্ছে না! এই মৌসুমেও তাঁর ডট বল দেওয়ার হার ২০১৬ সালের অবিশ্বাস্য ওই মৌসুমের মতোই, কিন্তু বাউন্ডারি প্রতি বল সংখ্যাটা আবার মিলে যাচ্ছে ২০১৮ মৌসুমের সঙ্গে। দুয়ের মিশেলে মোস্তাফিজ হয়ে যাচ্ছেন গড়পড়তা এক বোলারই।

বাঁহাতিদের বিপক্ষে মোস্তাফিজকে ভুগতে হয়েছে ইনিংসের শেষ দিকেও। শেষ ছয় ওভারে মোস্তাফিজের ইকোনমি রেট এবার দশেরও বেশি।ভারত কিংবা আমিরাতে, কোথাও পার্থক্য হয়নি তেমন।

বাঁহাতিদের বিপক্ষে মোস্তাফিজের এই দুর্দশার কারণ খুঁজতে গেলে তাঁর 'বৈচিত্র‍্যহীনতা' আর 'মাঝেমধ্যেই বাজে ডেলিভারি করার প্রবণতা'কেই সামনে দাঁড় করাতে হচ্ছে। টুর্নামেন্টের প্রথম ১৩ ম্যাচে ডানহাতি ব্যাটসম্যানরা তাঁর শতকরা ৩৫.৭ শতাংশ বলে রান নিতে পারেননি, আর বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে ডট পার্সেন্টেজ ৩৮.৫। তবুও ডানহাতিদের বিপক্ষে তাঁর ইকোনমি রেট ৭.৬৮, আর বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে ১০-এর ঘর (পাই-টু-পাই হিসাব চাইলে বলতে হবে, ১০.১৫)। কারণ, ডানহাতি ব্যাটসম্যানরা যেখানে গড়ে তাঁর ৭.১ বলে একটা চার কিংবা ছয় হাঁকাতে পেরেছেন, বাঁহাতিরা সেটা পেরেছেন ৪.১ বলেই। এবারকার আইপিএলে বাঁহাতিদের বিপক্ষে কমপক্ষে ৮ ওভার করেছেন, এমন পেসারদের মধ্যে এর চেয়ে বেশি হারে বাউন্ডারি খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে আর মাত্র চার জনের।ছবি: বিসিসিআই

বৈচিত্র‍্যহীনতাকে দায়ী করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলেও সংখ্যাই সহায়। মোস্তাফিজের যে স্লোয়ার নিয়ে ধন্যি ধন্যি রব ক্রিকেটপাড়ায়, সেই স্লোয়ার ডেলিভারিগুলোই বাঁহাতিদের সামনে মাথা কুটে মরছে এবার। টুর্নামেন্টের প্রথম পর্বে বাঁহাতিদের বিপক্ষে ১১টা স্লোয়ার ডেলিভারি করেছিলেন তিনি, তবে এর মধ্যে বেশ কিছু বল 'শর্ট অর ওয়াইড' ছিল বলে ওই বলগুলোতে বিলিয়েছিলেন ২৬ রান। রান খরচের পরিসংখ্যানটা মোস্তাফিজের কানেও গিয়ে থাকবে বোধ হয়। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম ম্যাচেই নিকোলাস পুরানকে ১১৩.৪ কি.মি/ঘণ্টায় স্লোয়ার দিয়েছিলেন ফের। ফলাফল? বলটাকে পত্রপাঠ সীমানাছাড়া করেছিলেন পুরান। এরপর আর ওমুখো হননি মোস্তাফিজ। দেখা যাচ্ছে, বাঁহাতিদের বিপক্ষে এরপর আরও ৪২ বল করলেও ১২৫ কি.মি/ঘণ্টার নিচে কোনো বলই করেননি মোস্তাফিজ। কোনো এক্সপ্রেস গতির পেসার নন, তাঁর তৈরি করা কোণটাও বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের পক্ষেই কাজ করে--খেলা তো সহজ হবেই।

তাঁর বোলিংয়ে নিকোলাস পুরানের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে আরেকটা ক্ষেত্রেও। চাপে পড়লে কিংবা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মারমুখী ভঙিতে সামনে দাঁড়ালেই মোস্তাফিজ তাঁর 'গো-টু বল' হিসেবে বেছে নিয়েছেন ইয়র্কারকে। দিল্লি ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ম্যাচে শিমরান হেটমায়ারের বিপক্ষে যার সফল প্রয়োগও আমরা দেখতে পেয়েছি। ১৬তম ওভারেই কার্তিক ত্যাগীর বলে তিনটা চার মেরেছিলেন হেটমায়ার, ১৪ বলেই তুলে নিয়েছিলেন ২৮ রান। ১৭তম ওভারে বল করতে এসে মোস্তাফিজ ইয়র্কার দিয়ে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলেন তাঁকে, 'ব্লক হোল'টা একটুর জন্য মিস করলেও ওই চেষ্টাতেই আউট করা গিয়েছিল হেটমায়ারকে।

শুধু হেটমায়ারই নন, একই পরিকল্পনার যথাযথ প্রয়োগে মাঝের চার ম্যাচে বাকি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষেও সাফল্যই পেয়েছিলেন। ওই চার ম্যাচে বাঁহাতিদের বল করেছিলেন ৩১টি, ৪৫.২ শতাংশ বলেই কোনো রান তুলতে পারেননি ব্যাটসম্যান। বাউন্ডারি পেতেও অপেক্ষা করতে হয়েছে ৭.৮ বল, ইকোনমি রেটটা তাই ছিল মাত্র ৬.৭৭। ওই সময়ে তাঁর পাওয়া ৫ উইকেটের তিনজনই বাঁহাতি!রবীন্দ্র জাদেজাকে উইকেটে গেড়ে বসে যেতে দেখেও পরিকল্পনায় বদল আনেননি মোস্তাফিজ। ছবি: র‍্যাবিটহোল

কিন্তু পরিকল্পনাটার প্রয়োগ যে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেছে, রবীন্দ্র জাদেজা সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন হাড়ে হাড়ে। চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর পরিকল্পনা বুঝতে পেরেই রবীন্দ্র জাদেজা আগে থেকেই কিছুটা কুঁজো হয়ে তৈরি ছিলেন, মোস্তাফিজের ইয়র্কার লেংথের বলগুলোকে কবজির মোচড়ে লেগ সাইডে ঘুরিয়ে দেওয়াটাই ছিল উদ্দেশ্য। মোস্তাফিজও তাঁর চাওয়ামতোই বল করে বাউন্ডারি খেয়েছিলেন পর পর দুই বলে। লেংথ বদলালেও বাকি সব বল একই গতিতে করে আট বলেই হজম করেছিলেন ২৩! পরের ম্যাচেও একই হাল। মোস্তাফিজের জেন্টল-মিডিয়াম পেস বলগুলোর তিনটা খেলার সুযোগ পেয়েছেন ইষাণ কিষান, সেখানে নিয়েছেন ১৩ রান।

ডানহাতিদের বিপক্ষে তাঁর কাটার আছে, ইয়র্কার-ওয়াইড ইয়র্কার আছে, গতি দিয়েও চমকে দিতে পারেন ব্যাটসম্যানদের। কিন্তু বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে মোস্তাফিজ কোন অস্ত্র বের করবেন, সেটাই এখন ভাবনার বিষয়।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কড়া নাড়ছে দুয়ারে। রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ভাষায় 'শিক্ষার অর্ধবৃত্ত' সম্পূর্ণ করতে কিংবা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভালো করতে হলে, মোস্তাফিজকে একটা না একটা উপায় বের করতেই হবে!

*সব পরিসংখ্যান রাজস্থান রয়্যালস-মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ম্যাচ পর্যন্ত

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন