রোনালদোকে পেয়ে ইউনাইটেডের অন্য লাভ-২

দ্য অ্যাথলেটিক

৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

রোনালদোকে পেয়ে ইউনাইটেডের অন্য লাভ-২

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসার পর `ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে` জাতীয় একটা রব উঠেছে। কিন্তু `ঘরের ছেলে` ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে কি আর লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ ছাড়াই ফিরিয়েছে ইউনাইটেড? মাঠের পারফরম্যান্স তো অবশ্যই বড় একটা বিবেচনা, তবে বাণিজ্যিক দিকটাও এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। `দ্য অ্যাথলেটিক`-এরই চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে একটা লেখায়। সেটির অনূদিত রূপের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব এখানে।

ইউনাইটেডে রোনালদোর মূল্যটা স্রেফ পাউন্ড-পেনির অঙ্কে বিচার করাটা উচিত হবে না মোটেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউরোপর একটা শীর্ষস্থানীয় ক্লাবের নির্বাহী জানাচ্ছেন, 'রোনালদোর মতো একজন ফুটবলারকে যখন দলে টানা হয়, তখন ক্লাবের বাণিজ্যিক খাতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কেমন হবে, অনেক সময় সেটা এড়িয়েই যাওয়া হয়। কিন্তু ফুটবল যদি গাছ হয়, তো রোনালদোর প্রত্যাবর্তন ইউনাইটেডকে গাছের মগডালেই বসিয়ে দিয়েছে।'

এহসান শাহ বলছেন, 'গত কয়েক বছর ধরে ইউনাইটেড একটা জিনিসেরই অভাব বোধ করছিল। রোনালদোকে দলে টেনে তারা পুনরায় সবাইকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারাও বড় নামের খেলোয়াড়দের সই করাতে পারে। ব্যাংক-ব্যালেন্সের চেয়ে এই যে ধারণার বদল, এটার গুরুত্বই বেশি।'

তিনি আরও বলছেন, 'হ্যাঁ, জ্যাডন সাঞ্চোও দারুণ খেলোয়াড়, কিন্তু ওর সেরকম প্রোফাইল নেই। বৈশ্বিক মানদণ্ডে মাপতে গেলে পল পগবাই সম্ভবত (রোনালদোর) সবচেয়ে কাছাকাছি আসতে পারবে। আর রোনালদো-মেসি তো ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই। আপনার দলে দুজনের একজন থাকা মানে ফুটবল বাণিজ্যের "পাওয়ারহাউজ" হিসেবেই আপনার অবস্থান।'

গত চার বছর ধরে রোনালদো ঘুরছেন আমেরিকার এক মডলেকে ধর্ষণের অভিযোগ সঙ্গী করে। কিন্তু এরপরও রোনালদোর আবেদন তো কমেইনি, উল্টো বেড়েছে। এই ৩৬-এ পা দিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোনালদো ধরে রেখেছেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। ইউনাইটেডের চেয়ে তাঁর অনুসারী সংখ্যা ঢের বেশি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউনাইটেড কাজে লাগাতে চাইছে রোনালদোর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। ছবি: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

টিকটক-ইউটিউবসহ অন্যান্য মাধ্যম যোগ করলেও ইউনাইটেডের ফলোয়ার সংখ্যা এখন ঘোরাঘুরি ১৯০ মিলিয়নের আশেপাশে। সেখানে এক ইন্সটাগ্রামেই রোনালদোকে অনুসরণ করেন ৩৩৭ মিলিয়ন মানুষ, ইন্সটাগ্রামেই এর চেয়ে বেশি ফলোয়ার নেই আর কারও; টুইটারে অ্যাথলেটদের মধ্যে তাঁর অনুসারীই সবচেয়ে বেশি, সব সেক্টর মিলিয়েও কেবল বারাক ওবামা, কেটি পেরি আর রিহান্নার অনুসারীই তাঁর চেয়ে বেশি। এর সঙ্গে যদি যোগ করা হয় ফেসবুকে তাঁর ১৫০ মিলিয়ন অনুসারী, তো প্রতিদিন রোনালদো পৌঁছে যাচ্ছেন অন্তত ৬০০ মিলিয়ন মানুষের দ্বারে, সংখ্যাটা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার দ্বিগুণ!

ইউনাইটেডের অনুসারী সংখ্যা ইদানীং যে হু হু করে বাড়ছে, তার কারণও তো রোনালদো। এমনিতে ইউনাইটেডের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ৩০ হাজারের কাছাকাছি মানুষই নতুন যুক্ত হতো প্রতিদিন। কিন্তু রোনালদোর ইউনাইটেডে প্রত্যাবর্তনের খবরটা জানাজানি হওয়ার এক ঘণ্টার মাঝে ক্লাবের অনুসারী বেড়েছে আট লাখ। শতাংশের হিসাবে সংখ্যাটা ৮%। ইউনাইটেডের টুইটার আর ফেসবুক পেজেও অনুসারী সংখ্যার দৃশ্যমান উন্নতি দেখা গেছে, যদিও সেটা ইন্সটাগ্রামের মতো এমন চক্রবৃদ্ধি হারে নয়।

ভাবা হচ্ছে, মেসি প্যারিসে পাড়ি জমানোর পর যে ৭ লাখ টুইট হয়েছিল ওই দলবদল নিয়ে, সেটাকে ছাড়িয়ে 'রোনালদো রিটার্নস'টাই টুইটারে সবচেয়ে আলোচিত দলবদল হবে। এর আগে উডওয়ার্ড অংশীদারদের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউনাইটেডের অনুসারী সংখ্যার উল্লেখ করে হাসির পাত্র হলেও ক্লাবটার ওপর শ্যেনদৃষ্টি রাখা প্রতিটা চোখই জানে, রোনালদোর কারণে বৃদ্ধি পাওয়া সংখ্যাগুলোকে আয়ে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি প্রাচ্যদেশীয় অঞ্চলগুলোতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এখনকার প্রজন্ম ক্লাবের চেয়ে খেলোয়াড়কে বেশি অনুসরণ করে। শাহ জানাচ্ছেন, 'অনেকটা এনবিএর মতো মডেল দাঁড়িয়ে গেছে এখানে। লেব্রন জেমস যদি মায়ামি হিট ছেড়ে ক্লিভল্যান্ড ক্যাভালিয়ার্সে যায় তো তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বহু লোক সেই দলে পাড়ি জমায়। ফুটবলেও তেমনটাই হচ্ছে, খেলোয়াড়রাই ক্লাবে সমর্থক টানছে।'

তাই আপনার আশেপাশে নব্য কিছু ইউনাইটেড-সমর্থক দেখলেও অবাক হবেন না মোটেই।

ইউনাইটেডের ক্যাম্পে অনুশীলন শুরু করেছেন রোনালদো। ছবি: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

***

এতক্ষণ তো কেবল বাণিজ্য খাতে রোনালদো কেমন রাজস্ব এনে দিতে পারেন, তা নিয়েই কথা হলো। কিন্তু মাঠের বাইরের এই রমরমা বাজার আরও কয়েক বছর জারি রাখতে হলে তাঁকে মাঠেও নিজের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ম্যাচের বিরতির পর নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই যে মিশন শুরু হচ্ছে।

আট বছর হয়ে গেছে, ইউনাইটেড ঘরোয়া লিগের শিরোপার দেখা পায় না। ২০১০-১১ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার পর ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে শেষ আটের বাধা পেরোনো হয়নি তাদের। চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়া আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্যে ফারাকটা ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের। এর সঙ্গে স্পন্সর বোনাস, উয়েফা সুপার কাপ কিংবা ক্লাব বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ যদি জুড়ে দেওয়া হয় তো অঙ্কটা বেড়ে যাচ্ছে আরও। তাই রোনালদো যদি আগামী মে-তে ইউনাইটেডকে সেন্ট পিটার্সবার্গে (এই মৌসুমের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের ভেন্যু)  নিয়ে যেতে পারেন তবেই কেবল ইউনাইটেডের বিনিয়োগ পূর্ণমাত্রায় সার্থক হবে।

জুভেন্টাসের তখন অবশ্য 'ঠকে গেলাম' অনুভূতিটাই হবে। আন্দ্রেয়া সার্তোরি বলছেন, 'জুভেন্টাস রোনালদোকে এনেছিল দুটি কারণে। এক. রাজস্ব, বিশেষ করে বাণিজ্য খাতের রাজস্বের মধ্যে ব্যবধান কমানো। দুই. ইউরোপে সাফল্য আনা, অর্থাৎ চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা।

'আপনি যদি ব্র‍্যান্ডের আন্তর্জাতিক আঙিনায় পরিচিতি কিংবা বাণিজ্যিক রাজস্বের কথা বিবেচনায় নেন তো রোনালদোর মাধ্যমে জুভেন্টাস লাভবানই হয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় মঞ্চে জুভেন্টাস যে সাফল্য চাইছিল, রোনালদো সেখানটায় ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাই রোনালদো-প্রকল্পে জুভেন্টাসের ক্ষতি কেবল মাঠের খেলাতেই। জুভেন্টাস তাঁকে ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেনি এবং তাঁকে কেন্দ্র করে যথাযথ দল সাজাতে পারেনি।'

ইউনাইটেড রোনালদোকে ফের দলে ভেড়ানোর পেছনে এই ক্রীড়া সাফল্য পাওয়াকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিশেষ করে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়টাই তাদের প্রধান লক্ষ্য, যেটা ২০০৮ সালের পর থেকে তারা জেতেনি।

রোনালদো যদি তা জেতাতে পারেন, তবে তো ইউনাইটেডের সোনায় সোহাগা! বাদবাকি সুফলগুলো তো তখন ভোগ করা যাবে এমনিতেই।

*'দ্য অ্যাথলেটিক' থেকে ভাষান্তর: রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

আরও পড়ুন:

পর্ব ১: রোনালদোকে পেয়ে ইউনাইটেডের অন্য লাভ

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×