যে ড্র জয়ের সমান

সাইফুল বারী টিটু

৪ অক্টোবর ২০২১

যে ড্র জয়ের সমান

এক গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় লাল কার্ড...বাংলাদেশ পরিণত ১০ জনের দলে। সেই ১০ জন নিয়েই সমতাসূচক গোল, সাফ পরাশক্তি ভারতকে চাপে ফেলা। নতুন কোচ অস্কার ব্রুজোনকে তো কৃতিত্ব দিচ্ছেনই আরেক কোচ সাইফুল বারী টিটু, এই ড্র-কে মানছেন জয়ের সমান বলেও।

অসাধারণ এক ফেরার গল্প লিখতে দেখলাম বাংলাদেশকে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের বিপক্ষে এই ১-১ গোলে ড্র আমার কাছে জয়ের সমান। এক গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় দশজনের দলে পরিণত হওয়ার পর যে লড়াইটা দেখলাম, তা অনেক দিন মনে থাকবে।  

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই বাংলাদেশ দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল দারুণ। যা অনেক বেশি আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক। প্রথম থেকেই কাউন্টার অ্যাটাকে বাংলাদেশ ভালো করছিল। ভারতকে বিপদে ফেলছিল। প্রধমার্ধে হয়তো ওভাবে সুযোগ তৈরি হয়নি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ দল হিসেবে চমৎকার খেলেছে।

এই অর্ধের শুরুতে রাকিব মিস না করলে তখনই ১-১ হয়ে যায়। ওই মিসটা খেলার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাকিব গোল করে ফেললে তার কয়েক মিনিট পর হয়তো লাল কার্ডের জন্য বিশ্বনাথকে হারাতে হতো না।ইয়াসিন আরাফাত, বাংলাদেশ ম্যাচে ফিরেছিল তাঁর কল্যাণেই

প্রথমার্ধে আমরা ভারতকে মাঝমাঠে আটকেছি। ওদের নিচে থেকে উঠতে দেইনি। ওখানে ভারত বাংলাদেশের বাঁ দিকটা ব্যবহার করে খেলার পরিকল্পনা করে। এ কারণেই তাদের রাইট সাইড দিয়ে অ্যাটাক করছিল। গোলটা তারা ওভাবেই পেয়েছে। সুনীল ছেত্রির করা গোলের দায়ভার অবশ্য রাকিবকে নিতে হবে। আমরা সাধারণত লেফট ব্যাককে প্রতিপক্ষের রাইট ব্যাকের একই লাইনে রাখি। কিন্তু রাকিব পেছনে চলে এসেছিল। উদান্ত সিং কাটব্যাক করে। ছেত্রি আনমার্কড অবস্থায় বল পেয়ে যায়।

বাংলাদেশ একটু ডিফেন্সিভ হয়ে খেলছিল। সেটাই স্বাভাবিক। ২৬/২৭ মিনিটের মধ্যে গোল হজম করতে হলে খেলাটা একটু কঠিন তো হওয়ারই ছিল। এরপর বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চারাস হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু তা হতে গেলে প্রতিপক্ষ তো কিছুটা সুযোগ পাবেই।

দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের চমৎকার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের পাশাপাশি বদলি খেলোয়াড় নামানোটাও ভালো হয়েছে। ভারতের কোচ ইগর স্টিমাচ এই অর্ধের শুরুতে বাংলাদেশকে মনে হয় একটু আন্ডার এস্টিমেটই করেছিলেন। ভেবেছিলেন, ওরা আর কী আক্রমণ করবে! অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে হয়তো নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ আর ফিরে আসতে পারবে না। তাঁর বদলি খেলোয়াড় নামানোটাও ঠিকঠাক না হওয়ায় পরে ভারত আর সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। খেলার প্রায় ৩৫ মিনিট বাকি থাকতে বাংলাদেশ ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও।

এখানে অস্কার ব্রুজোনের সাবস্টিটিউশন নিয়ে কথা বলতেই হয়। ১০ জন হয়ে যাওয়ার পর মতিন মিয়া পুরোপুরি ডিফেন্সে চলে যায়। তখন বাংলাদেশকে ৪-৪-১ এ চলে যেতে হয়। যখন সোহেল রানা নামল, তখন সেটা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে পজিটিভ ছিল। ১০ জনের দল নিয়ে আমরা যখন আক্রমণ তৈরি করছিলাম, তখন ও কিন্তু বলটা হোল্ড করতে পেরেছে।

আজ বাংলাদেশের কাউন্টার অ্যাটাকে ৩/৪ জন যাচ্ছিল। খুবই কার্যকর হচ্ছিল তা। দ্বিতীয়ার্ধে ১০ জন হয়ে যাওয়ার পর এই কাউন্টার অ্যাটাক কৌশলটাই বাংলাদেশের পক্ষে আসে। কারণ, সবার মনে গেঁথে যায় যে, আমাকে ডিফেন্ডিং করে ওখান থেকেই কাউন্টার অ্যাটাক করতে হবে।

সুমন রেজা, সোহেল রানা, সুফিল এবং শেষটায় রহমতের মতো ফ্রেশ লেগ নামানোটা বাংলাদেশের জন্য অনেক পজিটিভ হয়েছে। ১০ জনের দল নিয়ে খেললে একটু আগেভাগে টায়ার্ডনেস আসবে। কিন্তু ফ্রেশ লেগ থাকলে সেটা প্রভাব ফেলবে কম। মতিন মিয়ার জায়গায় সুমন রেজা, বিপলুর জায়গায় সোহেল রানা, ইব্রাহিমের জায়গায় সুফিল..এই পরিবর্তনগুলো খুব কাজে এসেছে। যে খেলোয়াড়দের নামানো হয়েছে, তারা সবাই বল প্লেয়ার। কাউন্টার অ্যাটাকেও ভালো। এ কারণে ইন্ডিয়ান দলের কোয়ালিটির সঙ্গে বাংলাদেশ মানিয়ে নিতে পেরেছে ১০ জন নিয়েও। এজন্য বড় কৃতিত্ব অস্কার ব্রুজোনের পাওনা।

 ১০ জন নিয়ে খেলে ভারতকে রুখে দেওয়া কিংবা প্রায় হারিয়ে দিতে যাওয়া টুর্নামেন্টে বড় একটা প্রেরণা হবে বাংলাদেশের জন্য। এর চেয়েও বড় কথা হলো, আমরা ভারতকে দারুণ চাপে রেখে ড্র করেছি। বিপলু যে শটটা নিয়েছিল, সেটা ওদের গোলকিপার গুরপ্রীত ভালো সেভ করেছে। বিপলু খারাপও মারেনি। তবে রাকিবের গোল করা উচিত ছিল। অত্যন্ত ভালো একটা কাউন্টার অ্যাটাক ছিল। মতিন ভালো একটা বল তৈরি করেছিল। আমাদের সমস্যাটা আসলে আক্রমণভাগে ভালো ফিনিশারের অভাব। এখন পর্যন্ত যে দুইটা গোল হয়েছে, দুইটাই করেছে ডিফেন্ডার। এই জায়গায় অস্কারের চিন্তার জায়গা থেকেই যাচ্ছে।

আজ সমতাসূচক গোলটা যে করেছে, সেই ইয়াসিন আরাফাতের জন্য দিনটা খুব ভালো ছিল না। কিছু ভুল পাস দিয়েছে। আবার ছেত্রি যে গোল করল, সেই গোলের জন্যও তার দায় আছে। ইয়াসিনের আনমার্কড থেকে গোল করার পুরো কৃতিত্ব দেব আমি জামালের নেওয়া কর্নার কিককে। নিয়ার পোস্টে রাকিবের ফ্লিকের কারণে সবাই বিটেন। এমন কর্নার থেকে ইয়াসিনের গোল করার আরও ঘটনা আছে। এটা ওর জন্য নতুন কিছু না।

সব কিছুর পর বলব, এই যে ১০ জন নিয়ে বাংলাদেশের কামব্যাক, তাতে শিরোনামটা হতে পারে এমন, ‘এই ড্র জয়ের সমান’।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন