আর্জেন্টিনার কোপা-জয়ের নেপথ্যে

ফেলিপে কারদেনাস

১৬ জুলাই ২০২১

আর্জেন্টিনার কোপা-জয়ের নেপথ্যে

২৮ বছর পর বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা, মেসি পেয়েছেন আজন্ম কাঙ্ক্ষিত জাতীয় দলের হয়ে একটা কিছু জেতার স্বাদ। কীভাবে? `দ্য অ্যাথলেটিক`-এ নেপথ্যের কারণগুলো নিয়ে দুর্দান্ত একটা লেখার অনূদিত রূপ উৎপলশুভ্রডটকম-এর পাঠকদের জন্য।

ডাগআউটে অস্থির ভঙিতে পায়চারি করছেন সব সময়। দলের কোনো খেলোয়াড়কে কড়া ট্যাকল করা হলে চকিতেই দু'হাত উঠে যাচ্ছে প্রতিবাদ জানিয়ে। আর গোল হলে তো কথাই নেই, কোচদের জন্য নির্ধারিত বক্সটাকে বানিয়ে ফেলছেন ১০০ মিটার স্প্রিন্টের ট্র‍্যাক। আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে বসেছেন আর সদা উত্তেজিত লিওনেল স্কালোনিকে আপনি দেখেননি--এমনটা এখনো হয়নি; আর তিনি যতদিন ম্যানেজারের পদটায় আছেন, খুব সম্ভবত হবেও না।

তাঁর কারণে আর্জেন্টিনা বেঞ্চের অন্যরা এক প্রকার অদৃশ্যই হয়ে যান, তবে দলের উন্নতিতে বাকিদের ভূমিকাই বা অস্বীকার করা যায় কী করে! তাঁদের মধ্যে এমন মানুষও তো আছেন, এই দলে, বিশেষ করে লিওনেল মেসির ওপর যাঁর প্রভাবটা ঠিক সংখ্যার মাপকাঠিতে মাপা যাবে না। স্কালোনি যে মুহূর্তে রেফারির সিদ্ধান্তে তার স্বরে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, চিৎকার করে তাঁর খেলোয়াড়, সহকারীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন; সে মুহূর্তে ওই মানুষটা চুপচাপ বেঞ্চে বসে খেলার গতিবিধি দেখছেন। ওই মানুষটা পাবলো আইমার, লিওনেল মেসি যাঁকে 'আইডল' মেনে বড় হয়েছেন।

নিজের খেলায় রিভার প্লেট, ভ্যালেন্সিয়া এবং আর্জেন্টিনার এই প্রাক্তন ফুটবলারের প্রভাব সম্পর্কে মেসি অনেকবারই বলেছেন। সাইড লাইনে নিরাবেগ বসে থাকা আইমার পুরো আর্জেন্টিনা দলেই একটা শান্তির আবহ ছড়িয়ে দিয়েছেন। অসন্তোষ, স্বার্থের সংঘাত, ফেডারেশনের দুর্নীতি শব্দগুলো যেখানে গত এক দশকে আর্জেন্টিনার সমার্থকই হয়ে ছিল, সেখানে আইমারের এই ভূমিকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন দরকার ছিল লিওনেল স্কালোনিকে। প্রত্যাশার দায়ভারের বিন্দুবিসর্গও যখন হোর্হে সাম্পাওলি মেটাতে পারলেন না, বাদ পড়লেন ২০১৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বেই, আর্জেন্টিনা দ্বারস্থ হয়েছিল সাম্পাওলিরই সহকারী স্কালোনির। স্কালোনি তখন আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্বে। সিনিয়র দলের দায়িত্ব বুঝে পেয়েই স্কালোনি নিজের কোচিং স্টাফে অন্তর্ভুক্ত করলেন পাবলো আইমারকে। আইমার নিজেও ছিলেন অনূর্ধ্ব-১৭ দলের দায়িত্বে, স্কালোনি অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব ছাড়লেও আইমার যুব দলটার দায়িত্ব ধরে রেখেছেন এখনো, ২০১৯ সালে দলটাকে নিয়ে খেলেছেন দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপও।

ছবি: মুন্দো আলবিসেলেস্তে

শুধু তো এই দুজনই নন, এই আর্জেন্টিনা দলের কোচিং স্টাফে আছেন রবার্তো আয়ালা, ওয়াল্টার স্যামুয়েল, মার্টিন তোকায়ির মতো মানুষজন। কোচ হিসেবে তাঁরা প্রত্যেকেই ক্যারিয়ারের 'হাঁটি হাঁটি পা পা' পর্যায়ে থাকলেও খেলোয়াড়ি কীর্তিতে একেকজন রীতিমতো মহীরূহ! আইমারের সঙ্গে মিলে ভ্যালেন্সিয়াকে স্প্যানিশ লা লিগার চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিলেন আয়ালা, নিয়ে গিয়েছিলেন ইউরোপ-সেরা বানানোর দোরগোড়ায়; ওয়াল্টার স্যামুয়েল তো জোসে মরিনহোর অধীনে ইন্টার মিলানের হয়ে জিতেছিলেন ট্রেবলই। স্কালোনির চার সহকারীর আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যার যোগফলও ২২৩। কোচ হিসেবে অনভিজ্ঞতার ঘাটতি তো তাঁরা খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতা দিয়েই পুষিয়ে দিতে পারেন।

সিজার লুইস মেনোত্তিও ভাবছেন একই ধারায়। সেই মেনোত্তি, ১৯৭৮ সালে যাঁর কোচিংয়েই আর্জেন্টিনা পেয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ। এখন তিনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের স্পোর্টিং ডিরেক্টর। কয়েকদিন আগে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে বলেছেন, 'শুধু স্কালোনিই নয়, তরুণ এই কোচিং দলটার প্রত্যেকেরই কাজ করবার দুর্দমনীয় আগ্রহ আছে। কথায় চিড়ে ভেজানোতে বিশ্বাসী নয় এরা, কারণ এদের মাথায় অনেক আইডিয়া গিজগিজ করছে।'

খেলোয়াড়ি জীবনে দশ নম্বরের ভূমিকা পালন করা আইমার কোচ হিসেবে আদর্শ মানেন তাঁর সাবেক দুই গুরু মার্সেলো বিয়েলসা আর হোসে পেকারম্যানকে। বিয়েলসার আক্রমণাত্মক আর প্রচণ্ড শারীরিক সামর্থ্য দাবি করা ফুটবলের সঙ্গে পেকারম্যানের সহজ-সাবলীল ফুটবলের মিশ্রণ ঘটেছে আইমারের চিন্তাধারায়। গত এপ্রিলে কোচেস ভয়েসকে আইমার নিজেই জানান, 'হোসে পেকারম্যান আমাদের স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধির প্রয়োগ করে শান্ত মনে খেলতে বলতেন। মনে আছে, ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ঠিক আগে-আগে আমাদের ক্যাম্পে এসে তিনি বলেছিলেন, "দুশ্চিন্তা কোরো না। আমরা ভালোই করব।" তিনি এমনই এক যুব দলকে নিয়ে ১৯৯৫ সালে শিরোপা জিতেছিলেন এবং আমাদের মধ্যে নির্ভার থাকার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমরা এখনও স্বীকার করি, পেকারম্যানের কাছ থেকে ওই শান্ত থাকার টোটকা পেয়েই আমরা ভালো খেলতে পেরেছিলাম। খেলো, আর কিছু সুন্দর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যাও, পেকারম্যান এমনটাই বলতেন।'

স্কালোনির মধ্যেও যেন পেকারম্যানেরই ছায়া দেখতে পান আইমার। 'স্কালোনির কাজের যে দিকটা আমার সবচেয়ে নজর কাড়ে, সেটা হলো ওর স্থিতধী স্বভাব, খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন। দু'বছরে রবার্তো আয়ালা, ওয়াল্টার স্যামুয়েলের সঙ্গে মিলে স্কালোনি আমাকে যে অনুভূতিটা দিয়েছে, সেটা ইতিবাচক।'

লিওনেল স্কালোনি আর পাবলো আইমার, এক সময়ের দুই সতীর্থর কাঁধেই বর্তেছিল আর্জেন্টিনাকে টেনে তোলার দায়িত্ব। ছবি: মুন্দো আলবিসেলেস্তে

আর্জেন্টিনার এবারের কোপা-অভিযানের পুরোটা জুড়েই শান্ত-ইতিবাচক এক দলের ছাপ দেখা গেছে। মেসিকে দেখলেই তো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। জাতীয় দলের হয়ে ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে মেসি খেলেছেন ১৩ জন কোচের অধীনে, আর বেশির ভাগের সময়েই জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা তাঁর কাছে বোঝাই মনে হয়েছে। 'আর্জেন্টিনা পারছে না' আলোচনাটা শেষ হতো 'মেসি কোনোভাবেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি না' বাক্যে, সমালোচক-বিশ্লেষকদের তরফ থেকে ছুট আসত তীব্র আক্রমণ। জাতীয় দলকে তিনবার ফাইনালে তুলেও এসব আক্রমণের মুখে মেসি তো অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন ২০১৬ সালে।

'আমার সাধ্যমতো সবটুকুই আমি করেছি, তবুও চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা দুঃখজনক। এই জিনিসটাই আমি সবচেয়ে বেশি করে পেতে চেয়েছি, আমার মতো আরও অনেকেই পেতে চেয়েছে, কিন্তু পেলাম না। বারবার ফাইনালে উঠে হারতে হারতে আমরা ক্লান্ত। আমি তাই এখানেই ইস্তফা টানছি,' ২০১৬ কোপা আমেরিকা শেষে এভাবেই জাতীয় দলকে বিদায় বলেছিলেন মেসি।

লিওনেল মেসি আবার ফেরত এসেছেন অবসর ভেঙে, এই টুর্নামেন্টে তো তাঁকে দারুণ খুশি খুশিই দেখিয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে কোপায় আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স। কেননা, মাঠে দল কেমন খেলছে, দলের আবহ ঠিক করে দিতে এটা তো খুব গুরুত্বপূর্ণ এক প্রভাবক।

আর আর্জেন্টিনার ভালো খেলার সিংহভাগই নির্ভর করে, মেসিকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে তার ওপর। বছরের গোড়ায় পাবলো আইমারের দেওয়া এক সাক্ষাৎকার পড়ে অনুধাবন করা যায়, আর্জেন্টিনার বর্তমান ম্যানেজমেন্ট মেসিকে তাঁর মতো করেই খেলতে দিতে চাইছে।

'এখন সৃজনশীল খেলোয়াড় নেই কথাটা শুনতে আমি একদমই পছন্দ করি না। বিশেষ করে আট শর মতো মুখস্থ ট্রেনিং সেশন চালিয়ে তো একদমই না। সব কিছু সাজানো-গোছানো হলে সেখান থেকে সৃজনশীল কিছু বেরোবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। আমি পজিশনাল প্লে, প্রতিপক্ষের ফাঁকা জায়গা আক্রমণ করা ব্যাপারগুলো বুঝি। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝি, মাঠে যে খেলোয়াড়দের পায়ে সৃজনশীলতার ঘাটতি দেখা যায়, এর দায়টা আমাদের কোচদেরই নিতে হবে। একজন সৃজনশীল খেলোয়াড়, একটা ক্রিয়েটিভ ড্রিবল দিয়েই তো প্রতিপক্ষের গড়ে তোলা ডিফেন্সিভ ব্লকগুলো ভেঙে ফেলা যায়। খেলাটা যখন বিরক্তি জাগাচ্ছে, একজন সৃজনশীল খেলোয়াড় এমন কিছু করে দেখাবে, যেটা আর সবার চেয়ে আলাদা। আর এই সৃজনশীলতার চর্চা তখনই দেখা যাবে, যদি আমরা খেলোয়াড়টিকে সেই পরিবেশটা দিতে পারি। একটা জিনিস সব সময় মাথায় রাখতে হবে, ফুটবলটা দাবা নয়। এতে কল্পনাশক্তি আর আবেগের বড় ভূমিকা আছে।'

মেসি আস্থা খুঁজে পেয়েছেন স্কালোনির কোচিংয়ে। ছবি: গেটি ইমেজেস

কৌশলগতভাবে বিচার করলে বিয়েলসা-অনুপ্রাণিত সাম্পাওলির ২-৩-৩-২ ফর্মেশনের তুলনায় স্কালোনি অনেক বেশি চিরাচরিত। পজিশনাল প্লে, প্রতিপক্ষকে প্রেস করা, বলের দখল রাখা ওই কৌশলে খেলেই সাম্পাওলি চিলিতে সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে একই কৌশলে খেলাতে গিয়েই মার খেয়ে যান। 'থ্রি ম্যান ব্যাকলাইন' সিস্টেমে খেলিয়ে মেসির সামর্থ্যের পুরোটাও তিনি আদায় করে নিতে পারেননি। রাশিয়া বিশ্বকাপে আমরা তাই দেখতে পেয়েছিলাম প্রতিপক্ষের আঁটসাঁট রক্ষণের সামনে হতাশ এক মেসিকে, নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গোল ছাড়া মেসি কোনো দাগই রাখতে পারেননি ওই টুর্নামেন্টে। যার জেরে সাম্পাওলিকে বহিষ্কৃতই হতে হয় বিশ্বকাপ শেষে। যদিও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা খেলোয়াড়-বিদ্রোহই সাম্পাওলির বহিষ্কৃত হওয়ার কারণ।

বিপরীতে স্কালোনিকে আমরা দেখছি গতানুগতিক ৪-৩-২-১ ফর্মেশনে খেলাতে, এবং এই সিস্টেমটা মেসিকে খেলার ধারার সঙ্গে খেলতে দিচ্ছে। এর ফলাফল তো আর্জেন্টিনা এবারের কোপা আমেরিকাতেই পেল। লুইস দিয়াজের সঙ্গে যৌথভাবে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোল (৪), সর্বোচ্চ সংখ্যক গোলে সহায়তা (৫), সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান (৯), সবচেয়ে বেশি থ্রু-বল (৯), সর্বোচ্চ সুযোগ সৃষ্টি (২১), অ্যাটাকিং থার্ডে সবচেয়ে বেশি পাস (১৩৩), সবচেয়ে বেশি শট (২৮), লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি শট (১১); এবারের টুর্নামেন্টে মেসির পারফরম্যান্স ছিল এমনই। ওহ, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও মেসিই জিতেছেন।

২০০৬ বিশ্বকাপ-যাত্রায় স্কালোনি আর আয়ালাকে ১৯ বছরের নবীন মেসি পেয়েছিলেন সতীর্থ হিসেবে। এখনো যেন ওই সৌহার্দ্যটা বজায় আছে তাঁদের মধ্যে। কোপা আমেরিকা জয়ের পর মেসি পরম মমতায় জড়িয়ে ধরছেন কোচকে, এমন ভিডিওতে নেট-দুনিয়া তো সয়লাবই হয়ে গেছে গত কিছুদিনে। স্কালোনি নিজেও তো জানিয়েছেন, মেসির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা যে খেলোয়াড়-কোচের চেয়েও গভীর, 'মেসি এবং আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুবই নিবিড়। ওর (মেসি) আর ওর সতীর্থদের প্রতি আমি দারুণভাবে কৃতজ্ঞ। বহুবার হতাশায় টুর্নামেন্ট শেষ করতে হওয়ার পরও মেসি হাল ছেড়ে দেয়নি।  অবশেষে ও জিতেছে।'

২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। ছবি: রয়টার্স

আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফি-খরা ঘোচাতে মেসিকে তাঁর মতো করে খেলতে দেওয়ার ভূমিকা অবশ্যই আছে, তবে এটাই কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব, প্রথমার্ধে জার্মান মিডফিল্ডার টনি ক্রুসের হেড করে পাঠানো ব্যাক পাসটা এসে পড়ল গঞ্জালো হিগুয়েইনের পায়ে, সামনে দাঁড়ানো ম্যানুয়েল নয়্যারকে পরাস্ত করতে পারলেই গোল। কিন্তু নিখুঁত হওয়ার চেষ্টার বদলে শক্তির ব্যবহার করতে হিগুয়েইন বল রাখতে পারেননি পোস্টে, বল চলে যায় গোলের হাতখানেক বাইরে দিয়ে।  মেসি নিজেও সুযোগ নষ্ট করেছিলেন দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। অতঃপর জার্মানি ম্যাচটা জিতে নেয় মারিও গোটজের অতিরিক্ত সময়ের গোলে। এর পরের দুই বছরেও একই পরিণতি, কোপা আমেরিকার সব বাধা পেরিয়ে এসে আর্জেন্টিনা বারেবারে আটকে গিয়েছে শেষ হার্ডলে।

তবে এবার আর আটকায়নি। আটকায়নি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক ঝাঁক খেলোয়াড়ের কারণে। নিকোলাস ওটামেন্ডির নেতৃত্বে গড়া ব্যাকলাইনটা পুরো টুর্নামেন্টে গোল খেয়েছে মাত্র তিনটি। ফাইনালে ওয়াল্টার স্যামুয়েলের মতোই দুর্দান্ত শারীরিক উপস্থিতির ওটামেন্ডিতে বাধা পেয়ে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়রা ফিরে গিয়েছেন বারবার।

বলতে হবে রদ্রিগো ডি পলের কথাও। তাঁর সারা মাঠজুড়ে খেটে খেলা, ম্যাচে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখা, নিজেদের অর্ধের মতো ব্রাজিলের পেনাল্টি বক্সের আশেপাশেও দাপট দেখাতে পারার সক্ষমতা মেসিকে দিয়েছিল অবাধে বিচরণের সুযোগ। আনহেল ডি মারিয়ার বদলে ফাইনাল-সেরার পুরস্কারটা যদি ডি পলের হাতেও উঠত, আপত্তির সুযোগ ছিল না।

অবশ্য ডি মারিয়ার হাতে ওঠাতেও আপত্তির সুযোগ কোথায়! ম্যাচের ২২ মিনিটে ডি পলের বাড়ানো লং পাসটা দারুণ দক্ষতায় নিজের অধিকারে নিয়েছেন, পরে ঠাণ্ডা মাথায় বলটাকে এডারসনের মাথার ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন জালে। ফাইনালের মঞ্চে যে গোলের অপেক্ষায় কেটে গেছে আর্জেন্টাইনদের ১৭ বছর!

ডি মারিয়ার নিজেরও তো অনেক হিসাব চুকানোর ছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল মিস করেছেন চোটে পড়ে, একই পরিণতি মেনে নিতে হয়েছিল ২০১৬ কোপা আমেরিকায়। মাঝে ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও চোটের কাছে হার মেনে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। অবশেষে ২০২১ কোপাতে ভাগ্য কাজ করল মারিয়ার হয়ে, আর তিনিও সুযোগটা লুফে নিলেন দু'হাত ভরে।

যেখানেই বল, সেখানেই ডি পল। ছবি: গেটি ইমেজেস

ডি মারিয়া যে এমন কিছু ঘটাবেন, একজন অবশ্য খেলা শুরুর আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের ডি মারিয়া জানিয়েছেন, 'মেসি আমাকে ম্যাচের আগেই বলেছিল, এটা আমার ফাইনাল হবে। এর আগে যে ফাইনালগুলো খেলার সুযোগ থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি, এটা হবে সবকিছুর প্রতিশোধ। মেসি বলেছিল, এটা আজই হতে হবে এবং তা-ই হয়েছে।'

ডি মারিয়ার গোলের পরও আর্জেন্টিনার কাজ শেষ হয়ে যায়নি। ফাইনালের আগে টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১২ গোল করেছিল তিতের ব্রাজিল। আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে তাই লিডটা ধরেও রাখতে হতো। গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে রেখে সে কাজটাও আর্জেন্টিনা সুচারুভাবেই সম্পন্ন করেছে। অ্যাস্টন ভিলার এই গোলরক্ষকই যেন এই আর্জেন্টিনা দলটার চরিত্র পুরোপুরিভাবে ধারণ করেন। এই দীর্ঘদেহী গোলরক্ষকের খুনে দৃষ্টি আর রক্ত হিম করে দেওয়া কথাবার্তা তাঁর ব্যক্তিত্বের অপরিহার্য অংশ। সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনটি শট ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনিই, যেখানে তাঁর গোল রক্ষণের দারুণ দক্ষতার সঙ্গে মাইন্ড গেম খেলতে পারার ক্ষমতারও ভূমিকা ছিল।

টুর্নামেন্টের রেকর্ড খাতাতেও রেখে গিয়েছেন নিজের নাম, ফ্রাঙ্কো আরমানির বদলে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে সুযোগ পেয়েই প্রথম আর্জেন্টাইন হিসেবে জিতেছেন কোপা আমেরিকার সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। নিজের ইনস্টাগ্রামে মেসি তাই লিখেছেন, 'অভিনন্দন, দ্য বিস্ট৷ এটা তোমার প্রাপ্য বললে কম বলা হয়।'

ডি মারিয়ার এই গোলেই অপেক্ষার অবসান। ছবি: গেটি ইমেজেস

এই আর্জেন্টিনা আলাদা হয়ে গেছে দলীয় সংহতিতেও। কোপা আমেরিকার ট্রফি উঁচিয়ে ধরে মেসি জানিয়েছেন, 'এই দলটাকে আমি বিশ্বাস করি। গত (২০১৯) কোপার পর থেকে এই দলটা কেবল শক্তিশালীই হয়েছে। কোনো কিছু নিয়ে অভিযোগ না করে দলটা শুধু সামনে এগোতেই শিখেছে।'

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অনবদ্য খেলা মেসি অবশ্য ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে নিজের ছায়া হয়েই ছিলেন। স্কালোনি জানিয়েছেন, কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেমিতে মেসির গোড়ালি দিয়ে রক্ত ঝরতে তো দেখাই গেছে, তবে ওই ম্যাচে মেসি হ্যামস্ট্রিংয়েও ব্যথা পেয়েছিলেন আর ফাইনালটা ওই চোট লুকিয়েই খেলেছেন। ফাইনালের ৮৮তম মিনিটে সহজতম এক সুযোগ হাতছাড়া (পড়ুন পা-ছাড়া) করে মেসিও বুঝিয়েছেন, প্রচণ্ড শারীরিক সক্ষমতা দাবি করা এই টুর্নামেন্টটা তাঁর ভেতরটাও সম্পূর্ণ শুষে নিয়েছে।

ফাইনাল শেষে মেসির ভেতরে অবশ্য ক্লান্তির ছিঁটেফোঁটাও দেখা যায়নি। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও যা পেতে চেয়েছেন, সতীর্থদের সৌজন্যে অবশেষে সেই মহামূল্যবান শিরোপার দেখা যে পেয়েছেন!

*'দ্য অ্যাথলেটিক' থেকে ভাষান্তর: রিজওয়ান রেহমান সাদিদ।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×