আশরাফুলের কল্যাণে একটু মান বাঁচাতে পারল বাংলাদেশ

উৎপল শুভ্র

৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

আশরাফুলের কল্যাণে একটু মান বাঁচাতে পারল বাংলাদেশ

মোহাম্মদ আশরাফুল: কে বলবে, এটাই তাঁর টেস্ট অভিষেক!

মোহাম্মদ আশরাফুলের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরির কল্যাণেই কলম্বোর ওই টেস্টে যা একটু প্রতিরোধ। বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানেই হেরেছিল, কিন্তু আশরাফুল যতক্ষণ ব্যাটিং করছিলেন, ততক্ষণ মনে হচ্ছিল খেলাটা হচ্ছে সমানে-সমানে। আশরাফুলে অনুপ্রাণিত আমিনুল ও নাঈমুরও সঙ্গত দেওয়ায় অভিষেক টেস্টের পর প্রথম তিন শ পেরিয়েছিল বাংলাদেশের ইনিংস।

প্রথম প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০০১। প্রথম আলো।

দৃশ্য ১: তাজ সমুদ্র হোটেল। রাত সাড়ে ৯টা। তিন তলার নিচের রুমের সামনের লাউঞ্জে বসে বিয়ার খাচ্ছেন হাশান তিলকরত্নে। তাঁর সঙ্গে তুমুল আড্ডায় সঙ্গী চামিন্ডা ভাস, রুচিরা পেরেরা, রবীন্দ্র পুষ্পকুমারা। 'কাল সকালে না তোমাদের বোলিং করতে হবে' প্রশ্নের জবাবে সবার মুখেই হাসি।

দৃশ্য ২: তাজ সমুদ্র হোটেল, রাত ১০টা। পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে রাতের খাবার খেয়ে ফিরছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। হোটেলের লবিতে বাংলাদেশের পরিচিত সাংবাদিকদের দেখে তাঁর মুখে মৃদু হাসি। নিজে থেকেই ঘোষণা, 'কাল ভালো খেলব ইনশাআল্লাহ'।

গত পরশু আধা ঘণ্টা ব্যবধানে দেখা দুটি দৃশ্যের মধ্যে মোহাম্মদ আশরাফুলের ওই প্রতিশ্রুতিবোধক হাসির চেয়ে শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের হাসিটাই মনে হচ্ছিল কলম্বো টেস্টের পরিস্থিতির সঙ্গে বেশি মানানসই। মুলতানে হাতে ৭ উইকেট নিয়ে তৃতীয় দিন শুরু করে পৌনে দুই ঘণ্টার মধ্যে অলআউট হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কলম্বো টেস্টও যে সেই পথেই যাচ্ছে, এ ব্যাপারে বলতে গেলে কোনো সংশয়ই ছিল না কারও। ৪ উইকেট চলে গেছে, মোহাম্মদ আশরাফুল খেলছেন তাঁর প্রথম টেস্ট, কতটাই বা স্বপ্ন দেখা যায় তাঁকে নিয়ে?

অথচ এই আশরাফুলের জন্যই এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো ম্যাচ রিপোর্ট লিখতে হচ্ছে একটু অন্যভাবে। মুলতানের মতো এখানেও ইনিংস ব্যবধানেই হেরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ইনিংস ও ১৩৭ রানের সেই বিশাল পরাজয়ে ব্যতিক্রম একটাই, অবশেষে গর্ব করার কিছু একটা পেয়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ে তা উপহার দিয়েছেন মোহাম্মদ আশরাফুলই।

প্রথম টেস্ট খেলতে নামা এই কিশোরের ব্যাটিংই হয়তো অনুপ্রাণিত করে থাকবে আমিনুল ইসলাম ও নাঈমুর রহমানকে। এ কারণেই অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসের (৪০০) পর প্রথমবারের মতো তিন শ পেরুল বাংলাদেশের স্কোর (৩২৮)। ১৩৪, ১৪৮ ও ৯০ রানের ৩টি ইনিংসের পর এটিকেই মানতে হবে দারুণ এক উন্নতি বলে। কাল দিনের প্রথম তিন ঘণ্টায় এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো মনে হলো, এটি একটি টেস্ট দলের সঙ্গে কোনো ক্লাব দলের খেলা নয়, এখানে লড়াইটা হচ্ছে সমানে সমানে।

সমানে-সমানই বা বলবেন কেন, কলম্বো টেস্টের তৃতীয় দিনের প্রথম তিন ঘণ্টায় শ্রীলঙ্কার বোলারদের তো রীতিমতো শাসনই করেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। হতাশ সনাৎ জয়সুরিয়া তাঁর খেলোয়াড়দের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আনছেন, নিজেও বল হাতে ছুটে যাচ্ছেন দুই প্রান্তে, শ্রীলঙ্কান ফিল্ডাররা ওভার থ্রো করে বাউন্ডারি দিয়ে দিচ্ছে...বিরল সব দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল এই সময়টায়। ৫ উইকেট ৩০৩ রান তুলে বাংলাদেশ তখন চতুর্থ দিনেও তাদেরকে মাঠে আনা প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছে—এই উপলব্ধিটা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল শ্রীলঙ্কা দলের বিস্ময়ের সীমা।

ইতিহাস গড়া  সেঞ্চুরির পর মোহাম্মদ আশরাফুলশেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। ৫ উইকেটে ৩০৩ থেকে মাত্র ৭.২ ওভারের মধ্যে ৫ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয়ে গেছে ৩২৮ রানেই। ৮ মিনিট পিছিয়ে নেওয়া চা-বিরতির মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে খেলা। কিন্ত এই অংশটুকুই হয়ে দাঁড়িয়েছে 'হরিষে বিষাদ'। নইলে আগের দিনের অপরাজিত দুই ব্যাটসম্যান আমিনুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আশরাফুল ১৪৩ মিনিটে ১২৩ রান তুলে গড়েছেন যেকোনো উইকেটে বাংলাদেশের নতুন রেকর্ড পার্টনারশিপ (আগের সেরা: চতুর্থ উইকেটে মেহরাব ও হাবিবুলের ১১৪, বিপক্ষ জিম্বাবুয়ে, হারারে)। অনেক দিন পর প্রত্যাশিত রূপে ফেরা অধিনায়কের ব্যাট ৯৬ রানের আরেকটি পার্টনারশিপে আশরাফুলের সঙ্গী হয়েছে এরপরই। কিন্ত ৪৮ রানে দাঁড়িয়ে নাঈমুর যে ভুলটি করলেন, সেটিই হয়ে দাঁড়াল এমন আকস্মিক পতনের কারণ। রুচিরা পেরেরাকে কেন যে তুলে মারতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে আতাপাত্তুকে ক্যাচ দিলেন— অধিনায়ক নিজেই নিজেকে এ প্রশ্ন করেছেন বারবার। 'কী যে একটা শট খেলে ফেললাম! ফিফটিটা হয়ে গেলেই আবার নতুন করে শুরু করতে পারতাম অন্য কিছু' — দলের ঘুরে দাঁড়ানোর আনন্দের মধ্যেও বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন নাঈমুরের কণ্ঠ।

সেটিই স্বাভাবিক। কারণ এর আগে সব কিছুই মনে করাচ্ছিল এই দিনটি অন্যরকম। সেই অভিষেক টেস্টের দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের উইকেট না হারানো একমাত্র সেশন। আগের দিনের অপরাজিত দুই ব্যাটসম্যান আমিনুল ও খালেদ মাসুদ অপরাজিত থেকেই ফিরেছিলেন লাঞ্চ সারতে। গতকালের সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি আজ হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর ১৪৫ রানের প্রথম ইনিংসটির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতোই আত্মবিশ্বাসের প্রতিমূর্তি হয়ে খেলতে থাকা আমিনুল লাঞ্চের আগে শেষ বলটাতে করে ফেললেন বিরাট এক ভুল। জয়াসুরিয়ার স্টাম্পের বলে প্যাডল সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে গেলেন, ৫৬ রানে অপমৃত্যু ঘটল আমিনুলের ৩ ঘণ্টা ৪ মিনিটের ইনিংসটির। প্রথম সেশনের ৩৩ ওভারেই বাংলাদেশ তুলে ফেলেছে ১০৭ রান, বোলার আর ফিল্ডারদের হতাশাটা বাড়ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। পরে আমিনুলও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, ওই সময় এই ঝুঁকি নেওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

প্রথম সেশনে ওঠা ১০৭ রানের ৬৪-ই আশরাফুলের ব্যাট থেকে। সব 'গ্রেট' ব্যাটসম্যানদের মধ্যেই যে ব্যাপারটি খুঁজে পাওয়া যায়, এই তরুণের ব্যাটিংয়েও সেটিই প্রথম চোখে পড়েছে কোচ ট্রেভর চ্যাপেলের, 'ওর চোখ দুর্দান্ত।' শ্রীলঙ্কান বোলাররাও পেয়েছেন এর প্রমাণ, সবচেয়ে বেশি চামিন্ডা ভাস। ৯৫ বলে পৌঁছা হাফ সেঞ্চুরিতে আশরাফুলের যে ৭টি চার, তাঁর ৪টিই এই বাঁহাতি পেসারের বলে। ভাসের বলে লেট কাট করেই প্রথম চার, পরের ৩টি পুল আর কাভার ড্রাইভে। এর মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থটি একই ওভারে। বাদ যাননি ক্যারিয়ারে ২৮তমবার (একমাত্র ৩৬ বার এই কীর্তি গড়া রিচার্ড হ্যাডলিই তাঁর সামনে) ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়া মুরালিধরনও। তাঁকে লেট কাট করে সপ্তম চারটি মেরেই প্রথম মাথার ওপর ব্যাট তুলেছেন আশরাফুল।

মুরালিধরনের সঙ্গে আশরাফুলের লড়াইয়ে সমতা ম্যাচ-সেরা বানিয়ে দিয়েছিল দুই জনকেইহাফ সেঞ্চুরি পাওয়ার পর যেন আরও চওড়া তাঁর ব্যাট, দিনের শুরুতে ১৫ রানে এগিয়ে থাকা আমিনুলকেও ছাড়িয়ে গেলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। লাঞ্চের পর মুরালির প্রথম বলেই অন ড্রাইভ করে ২ রান, পরের বলেই একই শটে বাউন্ডারি। নব্বইয়ের ঘরে গিয়ে একটু নার্ভাসনেসে আক্রান্ত হওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক। তারপরও নার্ভাস নাইনটিজে দাঁড়িয়ে দুটি বাউন্ডারি। ভাসের বলে থার্ডম্যানে ইনিংসের ১৪তম বাউন্ডারিটি মেরে আবার ব্যাট তুললেন আশরাফুল, খুললেন হেলমেট। ১০২ রান, ১৬৭ বল, ১৮৮ মিনিট...অসাধারণ এই ইনিংস এখন রেকর্ড বুকে নতুন এক অধ্যায়।

নাঈমুর আউট হওয়ার পর আর ৫ রান যোগ হতেই আশরাফুলও যখন বিদায় নিলেন, মাঠে শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড়রা তো তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়েছেনই, বাংলাদেশের ব্যালকনির মতো শ্রীলঙ্কার ব্যালকনিও উঠে দাঁড়িয়েছে তখন।

পরপর তিনটি ইনিংসে 'ব্যাটিং-লজ্জা' উপহার দেওয়ার পর কলম্বোর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ব্যাট করেছে বাংলাদেশ। 'জিম্বাবুয়েতে যতটুকু এগিয়েছিলাম, মুলতানের দুই ইনিংস আর এখানের প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে গিয়েছিলাম ততটাই। আজ আবার আমরা সামনে এগিয়েছি'-- কোচ ট্রেভর যে এ কথা বলতে পারছেন, তাতে আসল অবদান মাত্রই ১৭ ছোঁয়া ওই তরুণের। ৬ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট স্থায়ী বাংলাদেশের ইনিংসের ৪ ঘণ্টা ৮ মিনিটই যিনি মাঠে ছিলেন।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন