মাহমুদউল্লাহর অভিষেক টেস্ট

বিকেলের আলোয় ভোর জাগানিয়া জয়

উৎপল শুভ্র

১১ জুলাই ২০২১

বিকেলের আলোয় ভোর জাগানিয়া জয়

দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের পর মাহমুদউল্লাহ শরীরে জড়িয়ে নিলেন লাল-সবুজ, হাতে স্মারক স্টাম্প

প্রথম ইনিংসে ১২৮ রানের ইনিংসের জন্য ম্যান অব দ্য ম্যাচ তামিম ইকবাল। তবে পুরস্কারটা পেতে পারতেন মাহমুদউল্লাহও। ৫ উইকেট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংস ধসিয়ে দিয়েছেন তো তিনিই। প্রথম ইনিংসেও ৩ উইকেট মিলে ম্যাচে ৮ উইকেট। ২০০৯ সালে সেন্ট ভিনসেন্টে দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ে বড় ভূমিকা ছিল অভিষিক্ত মাহমুদউল্লাহর।

প্রথম প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০০৯। প্রথম আলো।

টিনো বেস্টের প্যাডে লাগল বল। শুধু কি সাকিবরাই আবেদন করলেন নাকি সমস্বরে পুরো বাংলাদেশ? অশোকা ডি সিলভার আঙুল উঠল। ঘড়িতে তখন ৪.৪০, সেন্ট ভিনসেন্টে রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেল। আর বাংলাদেশে ভোর হচ্ছে। একটু পরে শুরু হবে আরেকটা দিন।

শুধুই আরেকটা দিন! বললেই হলো, এই দিনটা কি আর দশটা দিনের মতো নাকি! টেস্ট জয়ের রং মাখা সকালের রোদটা কি একটু বেশি মিষ্টি নয়! এই দিনটার জন্য কত দিনের অপেক্ষা! সেই কবে একটা টেস্ট জিতেছিল বাংলাদেশ, প্রায় সাড়ে চার বছর সেই জয়ের স্মৃতি রোমন্থন করেই কেটেছে দিন। অবশেষে চট্টগ্রাম একটা সঙ্গী পেল, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে সেন্ট ভিনসেন্ট!

মাঠে উৎসবে মেতেছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। আমরা টেস্ট জিতেছি! আমরা টেস্ট জিতেছি! টেস্ট ম্যাচ যে জেতা যায়, এই দলের প্রায় সবার কাছে এটিই তো এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। মুশফিকুর রহিমকে শাহাদাত জিজ্ঞেস করছেন, ‘কিরে, আমরা সত্যিই কি টেস্ট জিতে ফেলেছি!’

এই অনির্বচনীয় অনুভূতির একটা স্মারক রাখতে হবে না! হায়, ক্রিকেট ম্যাচে যে মাত্র ছয়টাই স্টাম্প থাকে! চোখের পলকে সেসব উধাও। জুনায়েদ ইমরোজ ক্যামেরা বসানো স্টাম্পটা তুলে দৌড় শুরু করতেই ছুটে এল টিভি কোম্পানির লোকজন। ভাই রে, এটা যে নেওয়া যাবে না। তা হলে? জুনায়েদের যে একটা স্টাম্প চাই-ই চাই। ত্যাগী স্বভাবের কারও কাছ থেকে পেয়েও গেলেন একটা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে ম্যাচ-পরবর্তী পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শুধু দুই অধিনায়ক আর ম্যান অব দ্য ম্যাচেরই থাকার নিয়ম। ড্রেসিংরুমের বারান্দা থেকে জেমি সিডন্স চিৎকার করে বলছেন, ‘আমরা কি পুরো দল নিয়ে আসব নাকি?’ ম্যানেজার শফিকুল হক প্রশ্নটাতে যেন বিস্মিত, ‘আরে, পুরো দল আসবে না মানে! আমরা টেস্ট জিতেছি, সবাই থাকবে।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে চতুর্থ উইকেট পাওয়ার পর মাহমুদউল্লাহর ভোঁ দৌড়। পরে আরেকটি উইকেট নিয়ে অভিষেকেই বড় ভূমিকা রেখেছিলেন দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ে

পরাজয়ে পরাজয়ে বিপর্যস্ত, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিপর্যয়ের পর সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের হাসিতে হাজার ওয়াটের আলো। রুবেল হোসেনকে মুশফিকুর বলছেন, ‘কিরে, তোর ডেব্যু হলেই দেখি বাংলাদেশ জেতে!’ রুবেলের ওয়ানডে অভিষেকেই শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, টেস্ট অভিষেকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। কিন্তু রুবেলের আর তো অভিষেক হবে না! ছয় মাসের মধ্যে আমূল বদলে যাওয়া জীবনের আনন্দে ঝলমল রুবেল শুধু হাসেন। পাশ থেকে সাকিব আল হাসান বলেন, ‘ডেব্যু না হলেই কি! আমরা আরও টেস্ট জিতব। টেস্ট কীভাবে জিততে হয়, সেটা তো শিখলাম।’

সকালে ২৪ রানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কমপক্ষে তিন শ, পারলে সাড়ে তিন শ রানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল, দেওয়া গেল মাত্র ২৭৭। সকালটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ম্যাচটা? ৮০ ওভারে ২৭৭ একেবারে অসম্ভব তো নয়। টেস্ট শুরুর আগেই বাংলাদেশের জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে দেওয়া টনি কোজিয়ার বললেন, ‘তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হলো। আরও ব্যাট করলে জিততে পারত না।’

ক্রিকেটকে খাওয়া-ঘুমের মতো সহজাত প্রবৃত্তি বানিয়ে ফেলা কোজিয়ারই ঠিক বলে প্রমাণিত। লাঞ্চ পর্যন্ত ব্যাট করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ, তা করতে পারলে আর এই টেস্ট জেতা হয় না। শেষ উইকেটটা যখন পড়ল, ম্যাচের তখন মাত্র ৯.৫ ওভার বাকি।

প্রায় উপমহাদেশীয় উইকেট, শেষ দিনে সাকিবের বাঁ হাতের দিকেই তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশ। শেষ উইকেটটি তাঁর, এর আগে আরও দুটি। তবে বাংলাদেশকে তো জেতাল মাহমুদউল্লাহর ডান হাতের আঙুল। একটু ব্যাটিং পারেন, একটু বোলিং। ব্যাটিংটাই বোধ হয় বেশি ভালো পারেন। ‘মিনি অলরাউন্ডার’-এর এই পরিচিতি নিয়ে টেস্ট অভিষেক। আর তাতেই মাহমুদউল্লাহ বিশেষজ্ঞ স্পিনারের ভূমিকায় অবতীর্ণ। প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৫। বাংলাদেশের ৬০ টেস্টের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো কোনো বোলারের অভিষেকে ইনিংসে ৫ উইকেট। সেই প্রথম দুই টেস্টে নাঈমুর রহমান আর মঞ্জুরুল ইসলামের পর মাঝখানে ৫৭টি টেস্ট বাংলাদেশের কোনো বোলারের এমন অভিষেক দেখেনি।

মাহমুদউল্লাহর আরেকটি উইকেট। উদযাপনের সঙ্গী সাকিব আল হাসান। সেন্ট ভিনসেন্ট, ২০০৯

ম্যান অব দ্য ম্যাচ তিনিও হতে পারতেন। ১২৮ রানের ইনিংসটির জন্য হলেন তামিম ইকবাল। এ ম্যাচে কে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নিয়ে মাথা ঘামায়! একটা পদক আর স্পনসর ডিজিসেলের সৌজন্যে পাওয়া ব্ল্যাকবেরি মোবাইল হাতে তামিম ইকবাল বলেন, ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ বাংলাদেশ দলের সবাই। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা যেভাবে খেলেছি, এক কথায় তা অসাধারণ। এই জয় পুরো দলের চেষ্টার ফসল।’

দ্বিতীয় ইনিংস মানে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং নয়। প্রথম ইনিংসে ৬৯ রানে পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনা ব্যাটিংয়ের দ্বিতীয় ইনিংসও। এই ফিরে আসাতেই লুকিয়ে এই জয়ের আসল মাহাত্ম্য। সেই এক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটা সিরিজ বাদ দিলে সারা জীবন আন্ডারডগ হয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামা বাংলাদেশ যে এই ম্যাচের আগের দিন হঠাত্ই ফেবারিট হিসেবে আবিষ্কার করল নিজেদের! চাপ যা ছিল, তা বাংলাদেশের ওপরই। হারলে সর্বনাশ, জিতলে সবাই বলবে, ‘এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তো জেতারই কথা।’

জয়ের পর বাংলাদেশের উদযাপনের মধ্যমণি মাহমুদউল্লাহ

বললে তা হবে বাজে কথা। রেকর্ড বইয়ে লেখা থাকবে, বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট জিতেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে কারা খেলবে না-খেলবে এটা তো আর বাংলাদেশের হাতে নয়। কথাটা স্বদেশপ্রেমী কোনো বাংলাদেশির নয়, এক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানের। গর্বিত ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ নির্মাণেও যার সামান্য ভূমিকা আছে। কলিন ক্রফট অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে কারা খেলেছে তাতে কিচ্ছু আসে-যায় না। এটা টেস্ট ম্যাচ। ১৯৭৮ সালে প্যাকার সিরিজের সময় অবসর থেকে ফেরা ববি সিম্পসনের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়াও তো এমনই একটা দল এখানে এসেছিল। লয়েডের দল সেটিকে শুইয়ে দিয়েছে। কই, এখন কি আর কেউ তা মনে রেখেছে? বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট জিতেছে, এটাই শেষ কথা।’

হ্যাঁ, এটাই শেষ কথা।

আরও পড়ুন:
মাহমুদউল্লাহ শূন্য রানে আউট হলেও প্রশ্নগুলো থাকতই!
তাঁকে নিয়েই যেন ওই পঙ্‌ক্তিগুলো

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×