মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকে মিছিলটা আরেকটু লম্বা

জিম্বাবুয়ে সফর মানেই চোট-দুর্ঘটনা-বিতর্ক

উৎপল শুভ্র

১৫ জুলাই ২০২১

মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকে মিছিলটা আরেকটু লম্বা

জিম্বাবুয়ে ট্যুরে বিতর্ক আর নাটকীয় সব ঘটনায় আরেকটি সংযোজন মাহমুদউল্লাহর হঠাৎ অবসর

টেস্ট ক্রিকেট থেকে মাহমুদউল্লাহর মহানাটকীয় অবসর নেওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই জিম্বাবুয়ে ট্যুর থেকে মুশফিকুর রহিমের ফিরে আসার খবর। যা শুনে মনে পড়ে যাচ্ছে জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশের আগের সব ট্যুরের ব্যতিক্রমী সব ঘটনা। বিতর্ক, নাটক, বিচিত্র সব ইনজুরি...বাংলাদেশের জন্য জিম্বাবুয়ে ট্যুর মানেই ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার।

মাহমুদউল্লাহর চমকে দেওয়া অবসরের ঘোষণাতেই এবারের জিম্বাবুয়ে ট্যুরের ‘কোটা’ পূরণ হয়ে গেছে বলে ভেবেছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে, না, এতেই শেষ নয়। বাবা-মায়ের অসুস্থতার কারণে ট্যুরের মাঝপথেই দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে মুশফিকুর রহিমকে। হারারে থেকে ঢাকা পর্যন্ত তাঁর নিঃসঙ্গ এই দীর্ঘ বিমানযাত্রার কথা ভেবেই খারাপ লাগছে। ক্রিকেটারদের তো একা ট্রাভেল করার অভ্যাস নেই বললেই চলে। তার ওপর এমন একটা খবর পেয়ে যখন ফিরতে হয়, সেই একাকীত্ব আরও দুঃসহ হয়ে উঠতে বাধ্য।

জিম্বাবুয়ে ট্যুরের যে ‘কোটা’র কথা বলেছি, তা নিয়ে নিশ্চয়ই কৌতূহল হচ্ছে আপনার। চোট-দুর্ঘটনা-বিতর্ক...এসবের কোটা। সেই শুরু থেকেই যা বাংলাদেশ দলের জিম্বাবুয়ে ট্যুরের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। মাহমুদউল্লাহর অবসর আর মুশফিকের ফেরা যাতে নবতম সংযোজন। ভিন্ন ভিন্ন কারণে অতীতে এভাবেই জিম্বাবুয়ে থেকে একা ফিরতে হয়েছে খালেদ মাসুদ, মোহাম্মদ রফিক, রুবেল হোসেনের মতো এমন অনেককে। মাহমুদউল্লাহর অবসর নিয়ে যে বিতর্ক, এমন বিতর্কও হয়েছে অতীতে। আর এর সঙ্গে বিচিত্র সব ইনজুরির কথা জানলেই আপনি বুঝতে পারবেন, কেন ২০০৭ বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে জিম্বাবুয়ে ট্যুরে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বলেছিলেন, ‘ভাবছি, এরপর জিম্বাবুয়েতে আসার আগে মিলাদ পড়িয়ে আসব।’

খেলোয়াড় হিসেবে সেটাই হাবিবুলের শেষ জিম্বাবুয়ে সফর। চার বছর পর নির্বাচক হিসেবে দলের সঙ্গে জিম্বাবুয়ে গেছেন। এক টেস্ট আর তিন ওয়ানডের সেই ট্যুরে নানা কিছু নিয়ে ছোটখাট বিতর্ক লেগেই ছিল। যেটির চূড়ান্ত বিস্ফোরণটা হয়েছে বাংলাদেশ দল দেশে ফিরে আসার পর। এক বছরের জন্য অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের কাছ থেকে আট মাসের মাথায়ই কেড়ে নেওয়া হয়েছে সেই দায়িত্ব। 

দুই বছর পর আরেকটি জিম্বাবুয়ে ট্যুরে বিতর্কের জন্য বাংলাদেশ দলের দেশে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। বাংলাদেশ তখনো এক অধিনায়কেরই দল। তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। ওয়ানডে সিরিজ হারার পর প্রেস কনফারেন্সে এসে যিনি ঘোষণা করে দিলেন, ‘ক্যাপ্টেন হিসেবে এটাই আমার শেষ সিরিজ।’

২০১৩ জিম্বাবুয়ে ট্যুরে হঠাৎই ক্যাপ্টেনসি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। ছবি: মো. মানিক

যে সিদ্ধান্তে যুক্তির চেয়ে বেশি ছিল আবেগ। নইলে পরে সিদ্ধান্ত থেকে কেন সরে আসবেন মুশফিক! পরের বছর বাংলাদেশ দুই অধিনায়কের যুগে পা রাখায় ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে দায়িত্ব পান মাশরাফি বিন মুর্তজা। তবে টেস্ট ক্রিকেটে ২০১৭ পর্যন্ত মুশফিকই তো ছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। 

এবারের আগে জিম্বাবুয়েতে সর্বশেষ দুটি ট্যুরের ঘটনা-দুর্ঘটনা-বিতর্কের কথা বলা হয়ে গেল। এবার আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেলে অদ্ভুত সব ঘটনার দেখা মিলবে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ শুধুই ওয়ানডে সিরিজ খেলতে গিয়েছিল জিম্বাবুয়েতে। ওই ট্যুরটাই ছিল একটু অদ্ভুত। ওয়েস্ট ইন্ডিজে দুই টেস্ট, তিন ওয়ানডে ও এক টি-টোয়েন্টির সিরিজ খেলে সেখান থেকে দেশে না ফিরে বাংলাদেশ দল সরাসরিই চলে গিয়েছিল জিম্বাবুয়েতে। সেবার বিতর্ক ছিল না, ছিল ইনজুরির বন্যা।

বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তা শুধরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরেই বাংলাদেশ দলে ফিরেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। জিম্বাবুয়েতেও তাঁর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তৃতীয় ওয়ানডেতে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে উল্টো দুবাই থেকে আলাদা হয়ে যায় তাঁর পথ। বাংলাদেশ দল বারবাডোজ-লন্ডন-দুবাই হয়ে জিম্বাবুয়েতে চলে যায়, আর রাজ্জাক উঠেন দেশে ফেরার বিমানে। রাজ্জাকের বদলি হিসেবে অনেকদিন পর ওয়ানডে দলে সুযোগ পেয়েছিলেন এনামুল হক জুনিয়র। সেই ট্যুরেই প্রথম ও শেষবারের মতো টানা চারটি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পান। কিন্তু চতুর্থ ওয়ানডেতে নিজের বলেই ফিল্ডিং করতে গিয়ে তাঁর হাত ফেটে যায়। তাতে তিনটা সেলাই লাগায় সিরিজের শেষ ম্যাচে তিনি পরিণত হন দর্শকে।

এনামুল হক জুনিয়র সেই ট্যুরে দীর্ঘ ইনজুরি তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন। এর আগেই ছিটকে পড়েছেন নাজমুল হোসেন। রুবেল হোসেন আরও আগে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুর শেষ হয়েছিল যে টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা দিয়ে, তাতে পাঁজরে চোট পেয়েছিলেন রুবেল। ঠিক হয়ে যাবে ভেবে তারপরও তাঁকে রাখা হয়েছিল দলের সঙ্গে। ঠিক তো হয়ইনি, খুব তাড়াতাড়ি তা হওয়ার সম্ভাবনাও না দেখে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যদি প্রয়োজন হয়...এটা  ভেবে দেশ থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ডলার মাহমুদকে। ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা প্রায় নেই-ই জেনে জিম্বাবুয়েতে গিয়েছিলেন ডলার। রুবেল-নাজমুল নেই বলে স্কোয়াডে থাকা আরেক পেসার মাহবুবুল আলম রবিনেরই খেলার কথা ছিল পঞ্চম ও শেষ ওয়ানডেতে। ওই ম্যাচের আগে রবিনও অ্যাংকেলে চোট পেয়ে বসেন। যাঁর খেলারই কথা ছিল না, সেই ডলার মাহমুদ ২৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে হয়ে যান ম্যান অব দ্য ম্যাচ।

হারারে টেস্টের শেষ দিনে মাহমুদউল্লাহকে গার্ড অব অনার। এটাকেই ধরে নিতে হচ্ছে মাহমুদউল্লাহর অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ছবি: টিভি থেকে

২০০৯ সালে জিম্বাবুয়েতে সংক্ষিপ্ত ওই ট্যুরেই ইনজুরির এত সব ফিরিস্তি আর নাটকীয় সব ঘটনা মনে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে তো? সেটাই স্বাভাবিক। যদিও এনামুলের হাত ফেটে যাওয়াটা বাদ দিলে বাকি ইনজুরিগুলো ক্রিকেটের স্বাভাবিক চোট-আঘাতের মধ্যেই পড়ে। তবে দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের ট্যুরে মোহাম্মদ রফিকের ইনজুরিটা মোটেই স্বাভাবিক কিছু ছিল না। রান নিতে দৌড়ানো জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যান ভুসিমুজি সিবান্দার হেলমেট বোলার রফিকের নাকে এসে এমনভাবেই ধাক্কা দিয়েছিল যে, সে এক রক্তারক্তি কাণ্ড। রফিকের নাক থেকে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করে। নাকের হাড় ভেঙে গিয়েছে বলেই আশঙ্কা করেছিলেন সবাই। কিছুদিন পরই ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপ, বাংলাদেশ দলে তাই রীতিমতো আতঙ্কের স্রোত। এক্স রে রিপোর্ট অবশ্য সবাইকে একটু স্বস্তি দেয়। রফিকের নাকের হাড় ভাঙেনি, তবে নাকের ভেতরে রক্তক্ষরণ থামছিলই না। নাকের দুই ফুটো দিয়ে তাই গজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ওই ম্যাচের পরদিন হোটেলে রফিকের রুমে গিয়ে তাঁর নাকের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। রফিকের ওই ইনজুরির পরই হাবিবুল বাশারের ওই স্মরণীয় উক্তি, ‘ভাবছি, এরপর জিম্বাবুয়েতে আসার আগে মিলাদ পড়িয়ে আসব।’

বলার কারণ ছিল। জিম্বাবুয়েতে ঠিক আগের ট্যুরে ভুতুড়ে ইনজুরির শিকার হয়েছিলেন যে তিনি নিজেই। হাবিবুলের ভেঙেছিল হাতের আঙুল। মিলাদ পড়ানোর কথা বলেছিলেন তো শুধু এ কারণে নয়। জিম্বাবুয়েতে আগের দুটি ট্যুরে কী হয়েছিল, সেসবেরও তো তিনি প্রত্যক্ষদর্শী। এর একটি আবার বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের এক এবং অনন্য ঘটনা, হাবিবুলই যেটির কেন্দ্রবিন্দুতে। ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ও নির্ধারক ম্যাচের আগের দিন প্র্যাকটিসে পর তুচ্ছ এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে হারারে স্পোর্টস ক্লাবের ড্রেসিংরুমে তাঁর ওপর চড়াও হয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক। অকথ্য গালাগালি তো ছিলই, প্রায় মারতে উদ্যত হয়েছিলেন অধিনায়ককে। যা দেখে কোচ ডেভ হোয়াটমোর রীতিমতো তাজ্জব বনে যান। হাবিবুলের অপরাধ ছিল, দলের আরেক বাঁহাতি স্পিনার অকালপ্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানাকে তিনি জিম্বাবুইয়ান বাঁহাতি স্পিনার রেমন্ড প্রাইসের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রাইস কিছুদিন আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খুব ভালো করেছেন, বাংলাদেশ আবার কিছুদিন পরই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে। হাবিবুলের তাই মনে হয়েছিল, রেমন্ড প্রাইসের কাছ থেকে মানজারুল কিছু টিপস্ পেলে তো ভালোই হয়। এতেই রফিকের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। তিনি থাকতে রেমন্ড প্রাইসের কাছে পরামর্শ নেওয়ার কী আছে?

মোহাম্মদ রফিক ও হাবিবুল বাশার দুজনেরই তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে জিম্বাবুয়ে ট্যুরে

ওই সিরিজের প্রথম ম্যাচ জিতেই বাংলাদেশ প্রায় পাঁচ বছর ও ৪৭ ম্যাচের জয়-খরা কাটিয়েছে। জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে সমতা আনায় তৃতীয় ও শেষ ম্যাচটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সিরিজ-নির্ধারক। তারপরও কোচ ডেভ হোয়াটমোর এবং ম্যানেজার কর্নেল লতিফ সেই ম্যাচের দিন সকালে রফিককে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে দুবার ভাবেননি। রফিকের অমন অবিশ্বাস্য আচরণ কি তাহলে জিম্বাবুয়ে ট্যুরে বিচিত্র কিছু, ভুতুড়ে কিছু ঘটবে বলেই?

ওয়ার্ম আপের সময় চোট পেয়ে ২০০১ জিম্বাবুয়ে ট্যুর থেকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল খালেদ মাসুদ পাইলটকেপ্রথম ট্যুর থেকেই যেটির শুরু। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশের প্রথম ট্যুর জিম্বাবুয়েতেই। ২০০১ সালের এপ্রিলে সেই ট্যুরের মাঝপথে খালেদ মাসুদ পাইলটকেও দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। এতে অবশ্য রফিকের মতো শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো ব্যাপার ছিল না। পাইলট ইনজুরির কারণেই ফিরেছিলেন, তবে সেই ইনজুরিও স্বাভাবিক ছিল না। বুলাওয়েতে প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিন সকালে ওয়ার্ম আপের সময় তাঁর অ্যাঙ্কেল মচকে যায়। ক্রাচে ভর দিয়ে তাঁকে দেশে ফেরার বিমানে উঠতে হয়।

পাইলটের বদলে সেই টেস্টে কিপিং করেন মেহরাব হোসেন অপি। হারারেতে পরের টেস্টের আগে বিরতিটা এত কম ছিল যে, বাংলাদেশ থেকে বিকল্প উইকেটকিপার উড়িয়ে এনে খেলানোর জন্য সময়টা যথেষ্ট ছিল না। পরের টেস্টেও তাই অপিকেই কিপিং করতে হয়।

জিম্বাবুয়েতে যতগুলো ট্যুরের কথা বললাম, এর মাত্র দুটিতেই আমি যাইনি। বেশির ভাগ বিতর্ক-ভুতুড়ে ইনজুরি তাই নিজের চোখেই দেখা। জিম্বাবুয়ে ট্যুর এলেই আমার মনে তাই 'কু' ডাকতে শুরু করে: এবার না জানি কী হয়!

এবারের 'কোটা' মাহমুদউল্লাহ-মুশফিককে দিয়ে শেষ হলেই ভালো! 

আরও পড়ুন:
যে কারণে দেশে ফেরত পাঠানো হলো রফিককে
মাহমুদউল্লাহ শূন্য রানে আউট হলেও প্রশ্নগুলো থাকতই!
মাহমুদউল্লাহকে নিয়েই যেন ওই পঙ্‌ক্তিগুলো

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×