আনচেলোত্তি পেরেছিলেন, বেনিতেজ পারেননি

দ্য অ্যাথলেটিক

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

আনচেলোত্তি পেরেছিলেন, বেনিতেজ পারেননি

ওলে গানার সোলশার এখন সম্ভবত সপ্তম আসমানেরই বাসিন্দা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে দলে পেয়েছেন আচমকাই, প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করে রোনালদোও বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর মূল্য। তবে পুরো মৌসুমটাই এই স্বপ্নযাত্রা টেনে নিতে চাইলে কিছু চ্যালেঞ্জ জিততে হবে সোলশারকে। যাতে কোনো কোনো ম্যানেজার জিতেছেন, হেরেছেনও অনেকে। কী সেই চ্যালেঞ্জ? পড়ুন `দ্য অ্যাথলেটিক` থেকে অনূদিত এই ধারাবাহিকে। আজ প্রথম পর্ব।

'সে রাতে আমরা চ্যাম্পিয়নস লিগের একটা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলে ফিরছিলাম। ডোপ পরীক্ষা শেষে মাঠ ছাড়তে ছাড়তে এমনিতেই অনেকটা দেরি হয়ে যায়। পরে এয়ারপোর্টে এসে জার্সি-বুট প্লেনে তুলতে তুলতে যে সময়টা লাগছিল, মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল অপেক্ষা করছি। তাই, মাদ্রিদে আমাদের অনুশীলন মাঠে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন রাত্রি তিনটা কী চারটা বাজে।'

কথাগুলো পল ক্লেমেন্তের। ভদ্রলোকের পরিচয়, প্রথম দফায় কার্লো আনচেলোত্তি যখন রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে বসার দায়িত্ব নেন, তিনি তখন আনচেলোত্তির সহকারী। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও তখন বার্নাব্যুর প্রাণ, সিআরসেভেনের রুটিন জানতে চাইলে তিনি তাই বেশ নির্ভরযোগ্য এক সূত্রই।

ক্লেমেন্ত যোগ করছেন, 'দু'দিন বাদেই আমাদের আরেকটা ম্যাচ ছিল। পরদিন বিকালেও তাই অনুশীলন ছিল। বাস থেকে নেমেই তাই ফুটবলাররা গাড়ি হাঁকিয়ে দে ছুট। ভোর চারটা বাজে, বিছানায় গা এলিয়ে অনুশীলনের আগে কিছুটা জিরিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ফুটবলার মাঝে থাকাটাই তো স্বাভাবিক।'

সব ফুটবলারের অবশ্য সে আকাঙ্ক্ষা থাকে না। ক্লেমেন্তে জানাচ্ছেন, 'আমি সবাইকে বিদায় নিতে দেখে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি ক্রিস্টিয়ানো পেপে আর ফ্যাবিও কোয়েন্ত্রাওকে মূল ভবনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বলল, "আইস বাথ নিতে যাচ্ছি।" বুঝতে পারছেন? ভোর চারটা বাজে, নিজে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, সঙ্গে বাকিদেরও অংশগ্রহণে আহ্বান জানাচ্ছে। রীতিমতো পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত!'

আর শুধু একদিন-দু'দিন তো নয়, ক্লেমেন্তে বলছেন, 'সে এই কাজগুলোই প্রতিনিয়ত করত। এবং এই ছোট্ট ছোট্ট কাজগুলো খুব ভালোভাবে করার কারণেই ও এখন অতিমানবের পর্যায়ে পৌঁছেছে।'ক্লেমেন্ত যখন রোনালদোর গুরু

ফুটবলের ম্যানেজারের আসনে আপনার এক দিনের জন্যে বসার আগ্রহও হলে, আপনি এমন একজন খেলোয়াড় পাওয়ার স্বপ্নই দেখবেন। তাঁর সৃষ্ট অবিশ্বাস্য সব সংখ্যা, গোলগুলো, তাঁর ভাঙা রেকর্ডগুলো, এনে দেওয়া শিরোপাগুলো, দিনে ২৪ ঘণ্টা আর সপ্তাহে সাত দিন নিজেকে সেরা হিসেবে দেখাতে চাওয়ার চেষ্টাগুলো সম্পর্কে জানার পর তাঁকে পাওয়ার স্বপ্ন না দেখে উপায় কী!

কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, তাঁর এই চেষ্টা, এই রেকর্ডগুলোই কি একজন ম্যানেজারের জন্যে কাজটা কঠিন করেও দেয় না? ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শুরুটা দুর্দান্তই হয়েছে। কিন্তু এই রথ টেনে নিতে চাইলে ওলে গানার সোলশারকে কিছু চ্যালেঞ্জও তো জিততে হবে।

যে চ্যালেঞ্জগুলো স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন জিতেছিলেন, জিতেছিলেন আনচেলোত্তি। লুই ফেলিপে স্কলারিটা চ্যালেঞ্জটা এত ভালোভাবে জিতেছিলেন যে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁকে 'বাবা' বলেই ডেকেছেন। এই যে যাঁদের কথা বলা হলো, অর্থাৎ যেসব ম্যানেজাররা রোনালদোর কাছে থেকে সেরাটা আদায় করে নিতে পেরেছেন, তাঁদের মধ্যে একটা জিনিস কিন্তু কমন: তাঁরা প্রত্যেকেই জানতেন রোনালদো 'স্পেশাল', এবং তাঁকে ঠিক সেভাবেই যত্ন-আত্তি করতেন।

বিপরীতে আমরা এমন কিছু ম্যানেজারকে দেখতে পেয়েছি-- নাম শুনতে চাইলে বলতে হবে জোসে মরিনহো, রাফা বেনিতেজ, কার্লোস কুইরোজ, মরিজিও সারির কথা-- যাঁদের সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্ককে ঠিক সুসম্পর্ক বলা যাবে না, ক্ষেত্রবিশেষে তো বিচ্ছিন্নই বলতে হবে। এর কারণটা হচ্ছে, রোনালদোর 'ইগো'-র পরিচর্যাটা তাঁরা ঠিকভাবে করতে পারেননি। রোনালদোকে ক্ষেত্রে যেটা হওয়া উচিত 'অবশ্য পালনীয় কর্তব্য', সেই 'রোনালদোকে খুশি রাখা' প্রকল্পেই তাঁরা ডাহা ফেল করেছিলেন।

সোলশারের জন্য প্রথম কাজটা তাই হবে, রোনালদোর অহমের প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ দেওয়া, রোনালদোর চাওয়ামতো কথা বলা। রোনালদো যে এখনই 'আমার মুখটা তো ব্যাংক নোটে থাকা উচিত' ধরনের একটা মুখ করে ঘুরে বেড়ান, সেটা তো প্রকাশ্য দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। তাঁকে তাই রাজার মতো দুলকি চালে চলার সুযোগটাই দিতে হবে। তাঁকে ভালোবাসা হচ্ছে অনুভূতিটা তাঁর ভেতরে গেঁথে দিতে হবে।ফার্গুসন-রোনালদোর সঙ্গে বোলোনি, রোনালদো নামের রত্ন প্রথম তিনিই চিনেছিলেন

আর এই অনুভূতি পেলে রোনালদো কী করতে পারেন, তা বোঝাতে লাজিও বোলানির গল্পটা দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক হবে বলেই মনে হচ্ছে। স্পোর্টিং লিসবনে কিশোর রোনালদোর অভিষেক হয়েছিল তাঁর ম্যানেজারিতেই। তিনি বলছেন, 'একবার রেডিওতে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ওকে (রোনালদো) কতটা ভালো মনে করছেন। আমি বলেছিলাম, "আশা করছি, রোনালদো আমাদের ইউসেবিও আর লুইস ফিগোকে ভুলিয়ে দেবে"।'

'বলার পরে এক ঘণ্টা হয়েছে কী হয়নি, আমার উকিল ফোন করলেন আমাকে। উনি নিজে বেনফিকার সমর্থক ছিলেন, বেনফিকা বোর্ডেও কী যেন দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বললেন, আমি পাগল হয়ে গেছি। বেনফিকা সমর্থকেরা রীতিমতো ক্ষোভে ফুটছে। তাদের কাছে ইউসেবিও মানে 'কুইন অব ফ্যাদো'খ্যাত অভিনেত্রী অ্যামেলিয়া রদ্রিগেজের চেয়ে কম কিছু না, দুজনই পর্তুগালের সম্পত্তি। তাদের একজনের বিরুদ্ধে কিছু বলা মানে পুরো দেশকে বিরুদ্ধ পক্ষে নামিয়ে দেওয়া।'

'শুনে আমি বলেছিলাম, চোটে না পড়লে রোনালদো এমন কিছু করবে বলেই মনে করি। আমাকে বলা হলো, আমি বড়সড় একটা ধরা খাচ্ছি। আমরা তাই বাজি লাগালাম: যদি রোনালদো বড় কিছু করেই ফেলে, তাহলে তিনি আমাকে এক বোতল দামি শ্যাম্পেন কিনে দেবেন। আর যদি তেমন কিছু না হয়, তবে তা আমার গচ্চা যাবে।'

পরে কী হয়েছিল, তা তো আপনি জানেনই। বোলোনি বলছেন, 'রোনালদো ব্যালন ডি'অর জয়ের পর উকিলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমি। শ্যাম্পেনের স্বাদটা ভালোই ছিল।'

                                                           ***

আনচেলোত্তি যখন প্রথমবারের মতো রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নিলেন, তখন দলের সবচেয়ে বড় তারকার সঙ্গে তাঁর বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা বৈঠক হয়েছিল।

আনচেলোত্তি চেয়েছিলেন সহাবস্থান। ছবি: গেটি ইমেজেসআনচেলোত্তি সব সময়ই বিশ্বাস করতেন, একটা সেরা দলের জন্য ৪-৩-২-১ ছকটাই সবচেয়ে ভালো। যে চিন্তা থেকে 'মাই ক্রিসমাস ট্রি' বলে একটা বই পর্যন্ত লিখে ফেলেছিলেন।

কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে এই ফর্মেশনটা প্রয়োগ করতে পারেননি তিনি। তিনি যতই তিনবার ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব জেতা কোচ হন না কেন, রোনালদো পছন্দ না করলে তো আর এই ফর্মেশনের মূল্য থাকে না!

ক্লেমেন্ত বলছেন, 'প্রাক-মৌসুম শুরু হওয়ার আগে থেকেই আনচেলোত্তি দলের আদল কেমন হবে, সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রাথমিক ভাবনায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো স্ট্রাইকার হিসেবে ছিলেন। কিন্তু রোনালদো কার্লোর কাছে এসে বলল, ও বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে পাস-ক্রস করে কিংবা শট নিয়ে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। শুনে কার্লো কেবল বলল, "আচ্ছা, তোমাকে তো স্বচ্ছন্দে খেলাতে হবে। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।" রোনালদোকে সাবলীলভাবে খেলার সুযোগ করে দিতে সে তাই অন্য একটা সিস্টেম দাঁড় করাল।'

আনচেলোত্তির জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো রোনালদোর ওপরেই কৌশলটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন, প্রথম দিন থেকেই বুঝিয়ে দিতে চাইতেন, কে এখানে বস। কিন্তু আনচেলোত্তির ওই বুদ্ধিটুকু ছিল, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রোনালদোর ইচ্ছেটা পূরণ করলে তিনি নিজেও উপকৃত হবেন।ইউনাইটেডে রোনালদোর শুরুটা হয়েছে দারুণ

রোনালদোর চাওয়াটাই যখন সব, তাহলে কি একে 'রোনালদোই দলের সর্বেসর্বা' বলে অনুবাদ করে নেওয়া যাবে? 'কোনো সুযোগই নাই। কার্লোই সব। ক্রিস্টিয়ানোর সঙ্গে কথা বলে কার্লো কেবল ভিন্ন একটা আইডিয়া নিয়ে এসেছিল। নয়তো পুরোটা জুড়ে কেবল কার্লোই ছিল।'

আর এই সাড়ে ছত্রিশের রোনালদোর সেরা পজিশন কী হবে, সেটা ভেবে  সোলশারকে এক রাতও নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে বলে মনে হয়। এখনো রোনালদো মাঠজুড়ে দাপিয়ে খেলার স্বাধীনতা নেন, তবে নিজের খেলাটাকে এখন একজন সেন্ট্রাল স্ট্রাইকারের মতো করেই গড়ে নিয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন: দ্বিতীয় পর্ব: বেনিতেজ-মরিনহোর ভুল আর ফার্গুসন যেখানে অসাধারণ

'সবচেয়ে বড় ভুলটা হবে, যদি রোনালদোর চেয়ে সিস্টেমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়; অন্য কথায় বললে, রোনালদোকে সিস্টেমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চালানোর চেষ্টা করা হয়। বরং আপনাকে এর উল্টোটা করতে হবে। রোনালদোকে কেন্দ্র করে দল সাজাতে হবে। অনেক সময় কোচেরা আশা করেন, ও (রোনালদো) একটা আম খেলোয়াড়ের মতো আচরণ করবে। এটা আশা করা মানেই মস্ত বড় ভুল করে ফেলা।'

যেই ভুলটা রাফা বেনিতেজ আনচেলোত্তির উত্তরসূরি হয়ে করেছিলেন। রোনালদোর আবদারকে পাত্তা না দেওযার ভুল।

চলবে...

*'দ্য অ্যাথলেটিক' থেকে ভাষান্তর: রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×