একটা কারণে নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশ এগিয়ে

সাইফুল বারী টিটু

৮ অক্টোবর ২০২১

একটা কারণে নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশ এগিয়ে

সাফে ছয় দিনের মধ্যে তৃতীয় ম্যাচ খেলতে হয়েছে বাংলাদেশকে। মালদ্বীপের বিপক্ষে পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে এই টানা খেলার ধকলকেই দায়ী করছেন ফুটবল কোচ সাইফুল বারী টিটু। নেপালের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের আগে আবার পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ দিনের বিরতি, বাংলাদেশকে টিটু এগিয়ে রাখছেন সে কারণেই।

মালদ্বীপের কাছে হেরে যাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলাটা একটু কঠিন হয়ে গেল বৈকি। রাউন্ড রবিন লিগে এরপর বাংলাদেশের আর একটি মাত্র ম্যাচ আছে, সেটি নেপালের বিপক্ষে। তবে ওই ম্যাচে একটি কারণে লাল-সবুজরা এগিয়ে থাকবে।

১০ তারিখে ভারতের বিপক্ষে খেলবে নেপাল। এরপরই ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা। তিনদিনের মধ্যে নেপালকে দু’টি ম্যাচ খেলতে হবে। বাংলাদেশের জন্য হিসাবটা হলো, নেপালকে হারাতেই হবে। ড্র করলে ফাইনালে খেলার সুযোগ ওইভাবে হয়তো থাকবে না। বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি যে এতটা কঠিন হবে, তা অবশ্য টুর্নামেন্টের আগে থেকেই অনুমিত ছিল।

ফরম্যাটটা রাউন্ড রবিন লিগের। আর এখানে সেমিফাইনাল খেলার কোনো প্রয়োজন নেই। সেদিক দিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা ভালো। সেরা দুই দলের মধ্যে থাকলেই ফাইনাল খেলা যায়। এই আসরে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে একটা টিম কেবল আমাদের নিচে, আর সবাই তো ওপরে। ওদের বিট করে গ্রুপের প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া অবশ্যই কঠিন। এখন মালদ্বীপের কাছে না হেরে অন্তত ড্র করতে পারলে সবকিছু এতটা কঠিন হয়ে উঠত না।

মালদ্বীপের বিপক্ষে খেলায় বাংলাদেশকে ক্লান্ত লেগেছে আমার কাছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি ম্যাচ খেলা বড় এক ধকল। তারপরও আমি বলব, প্রথমার্ধটা পরিকল্পনা অনুযায়ী ভালোভাবে চলছিল। মালদ্বীপও ওইভাবে চাপ তৈরি করতে পারেনি। পজেশন তাদের বেশি ছিল, কিন্তু সেটা ল্যাটারাল, সাইড টু সাইড। একটা সুযোগ ছিল, যেটাতে পেনাল্টির মতো ছিল, ডাইভ দিয়েছিল। এর পর জিকো আলী আশফাকের একটা চেষ্টায় ভালো সেভ করে।

এই ম্যাচে কেন যেন বাংলাদেশ ২৭/২৮টা ফাউল করেছে। হলুদ কার্ডও দেখেছে গোটা পাঁচেক। তো প্রথমার্ধে দেখা যাচ্ছিল, কিছু কিছু সময় আবেগকে তারা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। বড় ডি-এর আশেপাশে অহেতুক কিছু ফাউল করছিল বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। এসবের মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের সুযোগগুলো তৈরি হচ্ছিল। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে আবার জিকো ভালো একটা সেভ করেছে।

তা প্রধমার্ধে আমরা সেভাবে সুযোগ তৈরি করতে পারিনি। দুই হলুদ কার্ডের জন্য এই ম্যাচ মিস করা রাকিবের অভাব ওপরে অনুভূত হয়েছে। ইব্রাহিম ওখানে খেললেও রাকিব কিন্তু আরও বেশি ডায়নামিক খেলোয়াড়। সেটা শারীরিকভাবে এগিয়ে থাকায এবং প্রতিপক্ষকে বিট করার মতো দৌড় দিতে পারে বলে। আরেকটা জিনিস চোখে পড়েছে, বাংলাদেশ দল ওপরে বল ধরে রাখতে পারছিল না।

রহমত ও সাদ উদ্দিনকে ডান দিকে খেলানোর একটাই কারণ, সেটা হামজা ও আলী ফাসিরকে ঠেকানো। এরা দুজনই লেফট সাইড দিয়ে এগোয় বেশি। তাছাড়া ওদের লেফট-ব্যাকও ভালো। এজন্যই হয়তো ডাবল রাইট-ব্যাক খেলানো বলে মনে করি। তা প্রথমার্ধে ভালোই কাজে দিয়েছে।

প্রধমার্ধের পরিকল্পনাটা ভারতের সঙ্গে যে পরিকল্পনায় খেলেছি, সেটার মতোই ছিল। একটু বেশি ডিপে আমরা ডিফেন্ডিং করেছি, সঙ্গে কাউন্টার অ্যাটাক। কিন্তু প্রতি-আক্রমণে ব্যাপারগুলো গুছিয়ে ওঠেনি হয়তো দুটি কারণে। প্রথমত, রাকিবের না থাকা। দ্বিতীয়ত, টায়ার্ডনেস বা ক্লান্তি। আর কাউন্টার অ্যাটাকে ভারতীয়রা সবাই নিচে নামেনি। যেটা মালদ্বীপ খুব দ্রুত নেমে ডিফেন্সকে খুব সুরক্ষিত করেছে। প্রথমার্ধে বাংলাদেশের অহেতুক ফাউল করা ছাড়া ডিফেন্ডিং খুব ভালো ছিল।

বাংলাদেশ দ্বিতীয়ার্ধের গোড়ায় যে গোলটা খেয়ে গেল, সেখানে খুব শিক্ষণীয় একটা ব্যাপার আছে। কর্নার বা ফ্রি-কিকে প্রাইমারি ডিফেন্ডিং ও সেকেন্ডারি ডিফেন্ডিং থাকে। আমরা যখন প্রাইমারি ডিফেন্ডিং করলাম, তখন বলটা পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বাউন্স করল। ওখানে সেকেন্ডারি ডিফেন্ডিংয়ে যাওয়ার আগে ওদের খেলোয়াড় গেল। ওদের আনমার্কড খেলোয়াড় হামজা এখানে যে ভলিটা (বাইসাইকেল কিক) মারল, সেটা একেবারে ব্যতিক্রমী। কিন্তু আমাদের তো শুধু বল ওয়াচ করলে হবে না, সেকেন্ডারি ডিফেন্ডিংও করতে হবে। দেখতে হবে বলটা কোথায় যাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের অবস্থান কী।

গোল হওয়ার পর এক সঙ্গে তিনটি পরিবর্তন নিয়ে আসেন কোচ অস্কার ব্রুজোন। তারপর দ্বিতীয় গোলটা যে হলো, সে বিষয়ে আমি বলব, লেফট-ব্যাক ও লেফট উইঙ্গার হয়েতো আক্রমণে গিয়েছিল। কিন্তু মালদ্বীপ ওই ব্যাপারটিকে কাজে লাগিয়েছে। পেনাল্টি যে আদায় করল, সেই নায়াজ অসম্ভব বুদ্ধিমত্তার কাজ করেছে। সোহেল রানা মাঝমাঠ থেকে নেমে গিয়ে ওকে আটকাচ্ছিল। ও যখন বেরিয়ে যায়, তখন সোহেলের হাত ওর পায়ে বা কোথাও লাগে। তখন সে ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে যায় এবং পেনাল্টিটা আদায় করে নেয়।

মোট কথা হলো, বাংলাদেশের মধ্যে ক্লান্তি ভর করেছিল। যেটা খুব স্বাভাবিক। এত কম সময়ে টানা তিন ম্যাচ খেলা সোজা কথা না। ওদিকে প্রতিপক্ষ প্রায় ছয় দিনের মতো বিশ্রাম নিয়ে তারপর খেলতে পেরেছে। মালদ্বীপের খেলায় তাই এনার্জি বেশি ছিল। আবহাওয়া-আর্দ্রতা কিভাবে ম্যানেজ করতে হয়, স্বাগতিক বলে তা ওরাই ভালো জানে। ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ওরা আরও ঠাণ্ডা মাথায় খেলেছে। কখন, কিভাবে খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে ভালোভাবে। প্রথম গোলটা হওয়ার পর আরও সময় নিয়ে তারা খেলার চেষ্টা করেছে। তাদের পারফরম্যান্সকে খুব পেশাদার বলব। সেখানে আগেই বলেছি, রাকিবের অভাব ও ক্লান্তির কাছে হার মানতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

এই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট যদি ধরতে হয়, তাহলে সবার আগে আসে প্রথম গোলটা। আমার বিশ্বাস, ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়লে আপনাকে অবশ্যই যখন ০-০ ছিল, তখনকার মতো ডিফেন্ড করতে হবে। কারণ, পিছিয়ে গিয়ে বেশি আক্রমণ করতে গিয়ে ২-০ গোলের ব্যবধানে হয়ে গেলে সেই ম্যাচে ফেরা খুব কঠিন হয়। তাই ১-০ হওয়ার পর বাংলাদেশের ডিফেন্ডিংটা আগের মতো হওয়া উচিত ছিল। যাতে আমাদের সুযোগ থাকে যে, একটা গোল দিয়ে দিতে পারলে আমরা ম্যাচটা ড্র করতে পারব। এখানে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ায় ম্যাচটা মালদ্বীপের জন্য আরও সহজ হয়ে গিয়েছে এবং খেলাটা আমাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। তাই আমার কাছে কাছাকাছি সময়ে পেয়ে যাওয়া মালদ্বীপের দুটি গোলই ম্যাচটার টার্নিং পয়েন্ট।

যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন নেপালের ম্যাচটার দিকে তাকিয়ে ছাড়া আর তো কিছু করার নেই।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন