বক্সাররাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের পথ-প্রদর্শক!

দুলাল মাহমুদ

৫ এপ্রিল ২০২১

বক্সাররাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের পথ-প্রদর্শক!

স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে ক্রীড়ানুরাগীদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন অনেক খেলোয়াড়, অনেক অতিথি, মনে ছাপ রেখে গেছে খেলার অনেক আয়োজন। এ সব থেকে সেরা ৫০ বাছাই করতে গেলে হিমশিম খেতে হবেই। হয়তো বিতর্কও হবে। তারপরও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একটা চেষ্টা করে দেখা তো যেতেই পারে। কী বলেন?

সত্তর দশকটা তখনও রঙদার হয়ে ওঠেনি। ছিল সাদা-কালোর বিপুল আধিপত্য। তাতেও মনের মধ্যে লেগেছে রঙের ছোপ। সাদা-কালো টেলিভিশনে যা কিছু দেখানো হোক না কেন, তা হৃদয়ে এনে দিয়েছে ভালো লাগার অনুভূতি। বক্সিংয়ের মতো জান্তব একটি খেলাও গোগ্রাসে গিলতে সমস্যা হয়নি। রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত বক্সারের মুখাবয়ব দেখেও মায়া লাগেনি। বরং ভিতরটা উল্লসিত হয়েছে অদ্ভুত এক আনন্দে।

মোহাম্মদ আলী, জর্জ ফোরম্যান, জো ফ্রেজিয়ার, লিওন স্পিংকস, ল্যারি হোমসের মতো কৃষ্ণাঙ্গ বক্সাররা আমাদের সাদা মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে দেন। মূলত মোহাম্মদ আলীর প্রতি পক্ষপাত থাকায় বোধকরি কোনো হিংস্রতাকে অমার্জনীয় মনে হয়নি। নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে বক্সিংয়ের মতো বুনো ও পাশবিক খেলায় কী কারণে আকর্ষণ থাকতে পারে? অবশ্য প্রধান কারণ হতে পারে, পৃথিবীর ইতিহাসে তো হিংস্রতারই জয়জয়কার। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো টিকে থাকা কিংবা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিপক্ষকে আঘাত করা। সেক্ষেত্রে বক্সিং দুনিয়ার অনেক মানুষের প্রিয় হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সে সময় বিশ্বসেরা হিসেবে শ্বেতাঙ্গ বক্সারদের কদাচিৎ দেখা মিলত। তবে সামগ্রিকভাবে শ্বেতাঙ্গদের কাছে যুগের পর যুগ অপমানিত, লাঞ্চিত, শোষিত কৃষ্ণাঙ্গরা যখন বক্সিং রিংয়ে ঘুরে দাঁড়ান, সেটাও ভালো লাগার একটা কারণ হতে পারে।  

সে যা-ই হোক, তখন কেন যেন মনে হতো, বক্সারের শারীরিক গড়ন হবে কালো পাহাড়ের মতো দীর্ঘ, পেশিবহুল, বলবান। বক্সিং রিংয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলে বুল ফাইটারের মতো প্রতিপক্ষের দিকে বিক্রম বেগে তেড়ে যাবেন। সে সময় দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয় বক্সিংয়ের এক একটা লড়াই। সেখানে বাংলাদেশের স্থান পাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। আর যাই হোক, বক্সিংয়ে বাংলাদেশের কোনো কালেই সম্ভাবনা নেই, এমন একটা মনোভাব সহজাতভাবেই গড়ে ওঠে। দৈহিক কাঠামোর তুল্যমূল্য বিচার-বিবেচনা করেই হয়তো এমন ধারণা হয়। খর্বাকৃতি আর কৃশতনু নিয়ে কি আর বক্সার হওয়া যায়? এ ধারণা ভেঙে যেতে বেশি সময় লাগেনি।   

তখন তো আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পদক পাওয়ার রেওয়াজ ছিল না বললেই চলে। আর এশিয়ান পর্যায়ে পদক পেতে চাওয়াটা ছিল অনেক বড় স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের পথে বাংলাদেশের বক্সাররা এগিয়ে যাবেন, এটা শুধু অভাবিত নয়, অকল্পনীয়ও বটে। শারীরিক গড়ন ও সামর্থ্যের মাপকাঠিতে শক্তির খেলায় বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো প্রেক্ষাপট অন্তত সে সময় ছিল না। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বক্সাররা। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্য।

১৯৭৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এশিয়ান বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন আব্দুর রউফ খান

১৯৭৭ সালের ২০ থেকে ২৬ মার্চ থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কিংস কাপ বক্সিং টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ প্রথম পদক পেয়েছে। এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ১২টি দেশ। ২৫ মার্চ হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে ব্রোঞ্জ পদক পান হাবিলদার আব্দুর রউফ খান। বলা যায়, সেটাই ছিল আন্তর্জাতিক মানদন্ডে গুরুত্ব পাওয়ার মতো বাংলাদেশের প্রথম কোনো পদক। এ পদক বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বুনে দেয় নতুন স্বপ্নের বীজ। অবশ্য সেখানেই থেমে থাকেননি বক্সাররা। একটুখানি সচেষ্ট হলে পদক পাওয়া যে মোটেও অসম্ভব নয়, এই বোধটাই সম্ভবত তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

১৯৭৭ সালের ১৩ থেকে ২০ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ফের চমক দেখান বক্সাররা। ১৩ দেশের এ প্রতিযোগিতায় দুটি পদক অর্জন করেন বাংলাদেশের দুই বক্সার। ১২ অক্টোবর লাইট ফ্লাইওয়েট ৪৮ কেজিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল হালিম এবং ১৪ অক্টোবর লাইট হেভিওয়েট ৮১ কেজিতে হাবিলদার আব্দুর রউফ খান ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন। রউফের শারীরিক কাঠামো গড়ন মোটামুটি চলনসই হলেও হালিমকে বক্সার হিসেবে ভাবার কোনো কারণ ছিল না। অথচ পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতা আর হালকা-পাতলা শরীর নিয়েও বুদ্ধিমত্তা আর কৌশল দিয়ে যে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা যায়, তা প্রমাণ করে দেন হালিম।

১৯৭৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এশিয়ান বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে মালয়েশিয়ার প্রতিযোগীকে হারিয়ে পদক নিশ্চিত করেন আবদুল হালিম (ডানে)

এশিয়ান পর্যায়ে দুই বক্সার হালিম ও রউফ বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম পদক লাভ করেন। তবে চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম পদক হালিম পাওয়ায় তাঁর নামটি আলাদাভাবে আলোচিত হয়। অবশ্য রউফ অনেকটা ভাগ্যের জোরে পদক পেয়েছেন। তিনি ছিলেন হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে। কিন্তু লাইট হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগী ছিল চারজন। এ সুযোগ গ্রহণ করে বাংলাদেশ দলের টিম ম্যানেজমেন্ট। তারা সাংগঠনিক কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রউফকে লাইট হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগী হিসেবে নাম লেখান। এ ক্যাটাগরিতে তিনি বাই পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠেন। সেমিফাইনালে প্রথম রাউন্ডে হারার পর রেফারি খেলা থামিয়ে দিলে তিনি ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে যান। রউফের সঙ্গে যৌথভাবে পদক পান পাকিস্তানের ইকবাল মোহাম্ম। রেকর্ড বুকে তো আর নেপথ্যের কাহিনি লিপিবদ্ধ থাকে না, সেখানে থাকে সাফল্যের খতিয়ান। সেই হিসেবে রউফের পদক জয়কে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। 

পক্ষান্তরে লড়াই করে জিততে হয়েছে আবদুল হালিমকে। তিনি কোয়ার্টার ফাইনালে মালয়েশিয়ার আবে রহিম সালেহকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠেন। সেমিফাইনালে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগী হ্যারি মেইতিমুর কাছে সামান্য ব্যবধানে হেরে যান। নতুবা তাঁর রৌপ্যপদক জয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিল। সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেলেও তিনি হয়ে আছেন ইতিহাসের নায়ক। এশিয়ান পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রথম পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাঁর নাম খোদাই হয়ে আছে।

আবদুল হালিমের ব্রোঞ্জ জয় নিয়ে খেলার পত্রিকার প্রচ্ছদ

হালিমের বক্সিংয়ের চর্চা শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। তবে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় বক্সিং প্রতিযোগিতায় ফ্লাইওয়েটে স্বর্ণপদক জয় করার মাধ্যমে নজর কাড়েন। ১৯৭৪ সালে রৌপ্যপদকের পর ১৯৭৫, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯ সালে টানা চারবার স্বর্ণপদক জয় করে পরিচিতি পান ‘বাংলার মোহাম্মদ আলী’ হিসেবে। ১৯৮০ সালে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করার পর তিনি বুঝতে পারেন, এখন সময় নতুনদের। 
আব্দুর রউফ খান জাতীয় বক্সিং প্রতিযোগিতায় হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৭৫, ১৯৭৭ সালে টানা চারবার স্বর্ণপদক জয় করেন। ১৯৭৮ সালে লাভ করেন ব্রোঞ্জ পদক।  

রউফ ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা বক্সার হন। হালিম ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা বক্সার এবং ২০০৪ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন। 
স্বাধীনতার পাঁচ বছর পর বক্সাররা যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, তখনকার প্রেক্ষাপটে সেটা ছিল অনেক বড় সাফল্য। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় খুব বেশি কি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে?

আরও পড়ুন......
ঢাকার মাঠে সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব 
মোহাম্মদ আলী যখন বাংলাদেশের 
আকাশি-নীলের উত্থান
কাজী সালাউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার
অশ্রু আর বেদনা নিয়ে শুরু ক্রীড়াঙ্গনের যাত্রা

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
Add
Ispahani Mirzapore Tea
×