জন্মেছিলেন ১৫১ বছর আগের এক ১৪ এপ্রিলে। তার মানে তা অনেক অনেক দিন আগের কথা।  জন্মের কথা বাদ দিন, তাঁর মৃত্যুও তো তা-ই। অনেক অনেক দিন যদি না-ও বলি, অনেক দিন আগের কথা তো বটেই। পৃথিবী ছেড়ে গেছেন, তা-ও তো প্রায় ৯২ বছর হতে চলল। 

তা এত আগের একজন মানুষকে নিয়ে কেন টানাটানি করছি? কারণ তাঁর নাম সিড গ্রেগরি। সিড গ্রেগরি তো কী? আচ্ছা, আচ্ছা, আগে পরিচয়টা করিয়ে দিই। সিড গ্রেগরি অস্ট্রেলিয়ার একজন টেস্ট ক্রিকেটার। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার এই ব্যাটসম্যান অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে খর্বকায় টেস্ট ক্রিকেটারও। তবে এটিও তো আর জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার একমাত্র কারণ হতে পারে না, আরও কিছু নিশ্চয়ই আছে।

হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ৫৮টি টেস্ট খেলেছেন, এর ৫২টিরই প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। সেই যুগে (১৮৯০ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত ক্যারিয়ার) এত টেস্ট খেলাই বিরাট ব্যাপার। ৫০ টেস্ট খেলার প্রথম কীর্তি সিড গ্রেগরির, যদিও এটি অনেক দিনই আর কোনো ব্যাপার নয়। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫২ টেস্ট এখনো ব্যাপার হয়ে আছে। অ্যাশেজে এত টেস্ট খেলেননি আর কেউ। সব দেশ মিলিয়েই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড এটি।

কাভারে অসাধারণ ফিল্ডিং করতেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরিটিও সিড গ্রেগরির। সেটিও আবার হোমগ্রাউন্ড সিডনিতে তাঁর প্রথম টেস্ট ম্যাচে। সেই ম্যাচটা অবশ্য বিখ্যাত হয়ে আছে অন্য কারণে। ফলো অন করতে হওয়ার পরও এটিতে জিতেছিল ইংল্যান্ড। পরে আরও দুবার প্রতিপক্ষকে ফলো অন করিয়ে হেরেছে অস্ট্রেলিয়া, তবে টেস্ট ক্রিকেটেই এই ঘটনা প্রথম ঘটেছিল সিড গ্রেগরির ওই ডাবল সেঞ্চুরির ম্যাচে। যে মাঠে ওই কাণ্ড, সিড গ্রেগরিকে স্মরণের বড় একটা কারণও ওই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এসসিজি)। এটি শুধু সিড গ্রেগরির হোমগ্রাউন্ডই ছিল না, তাঁর জন্মস্থানও!

ক্রিকেট মাঠ আবার কারও জন্মস্থান হয় কীভাবে! সিড গ্রেগরির হয়েছিল, কারণ তাঁর বাবা নেড গ্রেগরি ছিলেন এসএসসির কিউরেটর। মাঠের পাশে যে কটেজটিতে থাকতেন, সেখানেই জন্ম সিড গ্রেগরির। নামেও ছিল ‘সিডনি’—পুরো নাম সিডনি এডওয়ার্ড গ্রেগরি। বাবার পরিচয় শুধু কিউরেটরে শেষ হয় না, সিডনি মাঠের বিখ্যাত স্কোরবোর্ডটিও নেড গ্রেগরির সৃষ্টি। ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্কোরকার্ড, যাতে ১০০-রও বেশি খোপ। শুধুই রান-উইকেট নয়, যেটিতে ফুটে ওঠে ব্যাটসম্যান-বোলারদের যাবতীয় খুঁটিনাটি।

সিড গ্রেগরি: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তি তাঁর । ছবি: ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি

সিডের বাবা নেড গ্রেগরির আসল পরিচয়টা এবার বলি। এই ভদ্রলোকও ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটার। টেস্ট খেলেছেন একটিই, যেটি আবার ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচ। সেই ম্যাচে এমন একটা কীর্তি গড়েন, যা আর কোনো দিন কেউ করতে পারবেন না। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো শূন্য রানে আউট হওয়ার কীর্তি!

আরেকটা কীর্তিতে বাবা-ছেলের যৌথ অধিকার। নেড গ্রেগরি ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার বাবা, যাঁর ছেলেও টেস্ট ক্রিকেট খেলেছে। বাবার সঙ্গে ছেলের আরেকটা মিল—সিড গ্রেগরিরও প্রথম টেস্ট ইনিংসে শূন্য!

ক্রিকেট ইতিহাসের একটু মনোযোগী পাঠককে অবশ্য ‘গ্রেগরি’ পদবিটাই আরও অনেক কিছু মনে করিয়ে দেবে। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে গ্রেস পরিবার যা, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে গ্রেগরিরাও তা-ই। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট অধিনায়কও এক গ্রেগরি। ইতিহাসের প্রথম যে টেস্টে খেলেছিলেন সিডের বাবা নেড গ্রেগরি, সেটির অধিনায়ক ছিলেন তাঁর ছয় বছরের ছোট ভাই ডেভ গ্রেগরি। নেড-ডেভের আরও তিন ভাই খেলেছেন নিউ সাউথ ওয়েলসের পক্ষে।

১৯১২ সালে জীবনের শেষ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কত্ব করেছেন সিড গ্রেগরিও। এটি ইংল্যান্ডে টেস্ট ইতিহাসের একমাত্র সেই ট্রায়াঙ্গুলার সিরিজ, যাতে তৃতীয় দল ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রেগরি পরিবারের ক্রিকেটীয় শাখাপ্রশাখা শুধু নিজেদের পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সিড গ্রেগরির এক বোনের বিয়ে হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেটার হ্যারি ডোনানের সঙ্গে। চাচাতো ভাই জ্যাক গ্রেগরি ১৯২০-এর দশকের সাড়া জাগানো অলরাউন্ডার। দুর্দান্ত স্লিপ ফিল্ডার ছিলেন, ব্যাটে-বলে ছিলেন একই রকম বিধ্বংসী, তাঁর ৭০ মিনিটে সেঞ্চুরি সময়ের হিসাবে এখনো টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম।

এগুলো সব বাড়তি তথ্য। গ্রেগরি পদবী মানেই যে ক্রিকেটের বড় একটা অধ্যায়, তা মনে করিয়ে দিতে। নইলে জ্যাক গ্রেগরি বোনজামাই না হলে বা বাবা নেড গ্রেগরি নিজেও টেস্ট ক্রিকেটার না হলেও সিড গ্রেগরির কিছু আসত-যেত না। তিনি একই রকম বিখ্যাত থাকতেন। কারণটা তো আগেই বলেছি। অ্যাশেজে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড কেউ কোনোদিন ভেঙে দিলেও দিতে পারে (সেই সম্ভাবনা যদিও খুবই কম), কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি তো আর কেউ করতে পারবে না।