আগস্ট, ২০০১: ওয়াকার ইউনিস নামটি আজ থেকে ১০-১৫ বছর পর হয়তো আরও ভয়ঙ্কর শোনাবে। তাঁর রেকর্ড, স্ট্রাইক রেট, ইয়র্কার, রিভার্স সুইং...সব কিছু মিলিয়ে এক সময় বিশ্বের দ্রুততম বোলার ‘বুরেওয়ালা বোম্বশেল’ খুঁতখুঁতে সমালোচকদেরও মাথা নোয়াতে বাধ্য করবেন। এখনো যে তা করছেন না, সেটিই বা কীভাবে বলা যায়! আগের সেই ঝোড়ো গতি এখন নেই, কিন্তু ওয়াকারের নিজের ভাষাতেই এখন তিনি অনেক ‘ওয়াইজ’ বোলার।

তবে আমি যে ওয়াকারের সঙ্গে কথা বললাম, বোলার পরিচয় প্রচ্ছন্ন রেখে তিনি আসলে অধিনায়ক ওয়াকার। দলে তাঁর জায়গা নিয়ে যখন লড়াই, তখন তিনি শুধু ফেরেনইনি, অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন নতুন যুগে। ম্যাচ পাতানো, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব–সব কিছুকে পেছনে ফেলে ওয়াকার ইউনিস এমন এক দলের নেতা হতে চান, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য লড়বে। এই উদ্দেশ্য সফল করাতেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনিই। এ কারণেই এই একান্ত সাক্ষাৎকারে বিতর্কিত বিষয়গুলোকে ‘ওসব অতীতের ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে তো গেলেনই, এক সময়কার ‘মহাশত্রু’ ওয়াসিম আকরাম সম্পর্কেও অন্য রকম একটি লাইন বের করা গেল না তাঁর মুখ থেকে। বরং দাবি করলেন, ‘ওয়াসিম আর আমি এখন বন্ধু, ওকে জিজ্ঞাসা করলেও আমার ধারণা, একই উত্তর পাবেন। সফল হতে চাইলে দলে শত্রু রেখে কীভাবে তা হবেন আপনি?’

উৎপল শুভ্র: প্রশ্নটা হয়তো একটু দেরিতেই হচ্ছে, তারপরও পাকিস্তানের অধিনায়কত্ব পাওয়ার অনুভূতিটা কী, বলবেন?

ওয়াকার ইউনিস: ভালোই তো লাগার কথা, তাই না? আমার তো দলে জায়গাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। আমার কঠোর পরিশ্রম আবার আমাকে দলে ফিরিয়েছে। এরপর পাকিস্তান বোর্ড মনে করেছে, দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমিই যোগ্যতম। আমি এখন ভালোই করছি। তবে আমি এখনো শিখছি, ভাবছি ক্যাপ্টেনসির নানা দিক নিয়ে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও ভালো করতে পারব।

শুভ্র: সেই ১৯৯৩ সালেই আপনি ছিলেন পাকিস্তানের সহ-অধিনায়ক। সহ-অধিনায়ক হওয়া মানেই তো ‘ভবিষ্যৎ অধিনায়ক’। অথচ সেই অধিনায়ক হলেন কিনা এত বছর পর, মাঝখানে তো অনেক নাটক...

ওয়াকার: হ্যাঁ, তখন আমাদের বোর্ডে, দলের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটেছে। এ কারণেই আমার তখন অধিনায়ক হওয়া হয়নি। তবে আমার কোনো অভিযোগ নেই। দেরিতে হলেও অধিনায়কত্ব তো পেয়েছি। ইটস্ বেটার লেট দ্যান নেভার।

শুভ্র: বেশি দিন আগের কথা নয়, ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়া সফরের পর আপনি অভিযোগ করেছিলেন, ওয়াসিম আকরাম আপনার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে আপনার...

ওয়াকার: (থামিয়ে দিয়ে) বাদ দিন তো, এগুলো সব অতীতের ব্যাপার। ইটস্ হিস্ট্রি নাও। আমি আর পেছনে তাকাতে চাই না। এসব নিয়ে অতীতে আমরা অনেক সমস্যায় ভুগেছি। আমি সেসব আর এখন ফিরিয়ে আনতে চাই না। আমরা এখন একটি দল হিসেবে খেলছি, আমি শুধু নিশ্চিত করতে চাই, সবাই তাঁর শতভাগ উজাড় করে দিয়ে খেলুক। ভালো খেলে, পাকিস্তানকে সাফল্য এনে দিয়ে জাতিকে গর্বিত করার চেষ্টা করুক।

শুভ্র: অধিনায়ক হয়েছেন বলেই কি আপনার এই পরিবর্তন? এ জন্যই কি আপনার সব উপেক্ষা, অমন তিক্ত সব অভিজ্ঞতাও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন? চাইলেই কি তা পারা যায়, মনের কোথাও কি তা থেকে যায় না?

ওয়াকার: কাউকে  না কাউকে তো এটা করতেই হবে। আমরা নিজেদের মধ্যে অনেক লড়াই করেছি। এখন সময় হয়েছে, কেউ একজন এসে বলবে যে, ‘ঠিক আছে, আমাদের কিছু সমস্যা ছিল। কিন্তু এখন আমাদের দলকে জেতানোর চেষ্টা করতে হবে, এসো আমরা সবাই সংঘবদ্ধ হই।’ আপনি অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে তাকান, মাঠে-মাঠের বাইরে ওদেরকে সব সময়ই একটা ইউনিট বলে মনে হয়। এ কারণেই ওরা আজ শীর্ষে। আমি আমার দলকেও সে রকম দেখতে চাই। ওদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই এবং তা করতে হলে আমাদেরও একটি ইউনিট হতে হবে।

শুভ্র: বোলার ওয়াকার ইউনিস নিয়ে কথা হোক। ১৯৯২ সালের ওয়াকারকে যদি ফর্মের তুঙ্গে থাকা এক বোলার ধরি, তার সঙ্গে ২০০১-য়ের এই ওয়াকারের বোলার হিসেবে মূল পার্থক্য কী?

ওয়াকার: আপনি তো প্রায় ১০ বছর আগে-পরের কথা বলছেন। এটা অনেক লম্বা সময়, অনেক কিছুই এই সময়ের বদলাতে বাধ্য। তাছাড়া দিনের পর দিন  ফাস্ট বোলিং করাটা অনেক কিছুই নিংড়ে নেয় শরীর থেকে। আমি হয়তো কিছুটা পেস হারিয়েছি, কিন্তু আবার এটাও তো সত্যি, বোলার হিসেবে আগের চেয়ে অনেক জ্ঞান বেড়েছে আমার। নিজের বোলিংটা এখন অনেক বেশি বুঝি। আগের মতো গায়ের জোরে দৌড়ে এসে ব্যাটসম্যানকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে আমি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তা করি। পরিস্থিতি অনুযায়ী বল করার ক্ষমতাটা অনেক বেড়েছে।

দুজনের মধ্যে যতই রেষারেষি থাকুক, সে রোষানলে পুড়েছে কেবল প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরাই। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: শুরুতে  আপনার যে স্ট্রাইক রেট ছিল, তাতে ৬০০ টেস্ট উইকেট পাওয়া কোনো সমস্যাই মনে হচ্ছিল না। ১৯৯৪ সালে কলম্বোতে আপনাকে যখন প্রথম ইন্টারভিউ করি, আমি এই প্রসঙ্গটা তোলায় আপনি অবশ্য বলেছিলেন, ‘স্টুপিড কোশ্চেন!’

ওয়াকার: আমি এখনো হয়তো সেটিই বলব। দেখুন, ফাস্ট বোলিং এমন একটা কাজ যে, আপনাকে ইনজুরিতে পড়তেই হবে। এই রকম গরমে দিনের পর দিন ফাস্ট বোলিং করে গেলে মানুষের শরীর বিদ্রোহ করতে বাধ্য। পুরোটাই নির্ভর করে আপনি নিজেকে কতটা ফিট রাখতে পারেন। যদি আমি নিজেকে ফিট রাখতে পারি, তাহলে কে জানে, কোথায় থামব (হাসি)। তবে ৬০০ উইকেট হচ্ছে না, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি এ পর্যন্ত যা করেছি, তাতে যথেষ্টই সন্তুষ্ট। ওয়ানডেতে আমার ৩৫০ উইকেট, টেস্টে ৩৩০-এরও বেশি। এখনো খেলে যাচ্ছি, হয়তো আরও বছর দুয়েক খেলব। তারপর কোথায় গিয়ে শেষ করব, কে জানে!

শুভ্র: অনেক দেরিতে হলে শেষ পর্যন্ত অধিনায়কত্ব পেয়েছেন। নিশ্চয়ই একটা ছাপ রেখে যেতে চান। নির্দিষ্ট কোনো টার্গেট কি আছে?

ওয়াকার: আমি নিশ্চিত করতে চাই, পাকিস্তান যেন আরও ধারাবাহিকভাবে জেতে। ধারাবাহিকতার অভাব আমাদের পুরোনো সমস্যা। ইদানীং আবার আমাদের একটা অভ্যাস হয়ে গেছে, আগের ম্যাচগুলোতে খুব ভালো খেলে ফাইনালে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়া। আমি এই ব্যাপারটার একটা সমাধান করে ফাইনালও জিততে শুরু করতে চাই।

শুভ্র: পাকিস্তান দলে আপনি তো ইমরান খান, জাভেদ মিয়াঁদাদ থেকে শুরু করে মঈন খান পর্যন্ত অনেক অধিনায়কের অধীনেই খেলেছেন। এদের মধ্যে কাউকে কি আদর্শ মানেন?

ওয়াকার: সেভাবে একজনের কথা বলা কঠিন। অনেকের নেতৃত্বেই খেলেছি আমি, ওরাও প্রায় সবাই খেলেছে আমার নেতৃত্বে, এমনকি জাভেদ মিয়াঁদাদও (১৯৯৩-৯৪ সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি টেস্টে)। আমি সব অধিনায়কের কাছ থেকেই কিছু না কিছু শিখেছি। তবে শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়, অধিনায়ক হিসেবে আপনার নিজের যা মনে হয়, সেটিই করা উচিত। আরেকজন একটা কিছু করে সফল হয়েছে মানেই এই নয় যে, আমিও তাতে সফল হব।

অধিনায়ক হিসাবেও ওয়াকার হতে চেয়েছিলেন নিজের মতো। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: আপনি যাঁদের বিপক্ষে বল করেছেন, তাঁদের মধ্যে সেরা পাঁচজন ব্যাটসম্যানের নাম বলতে পারবেন?

ওয়াকার: এটা বলা কঠিন। কী মুশকিল, আমার তো এখন কারও নামই মনে পড়ছে না। (একটু ভেবে) ইনজামাম দারুণ, যদিও ম্যাচে ওর বিপক্ষে আমি খুব বেশি বল করিনি, কিন্তু নেটে ওকে তো নিয়মিতই বল করি। ও দুর্দান্ত। ব্রায়ান লারা ফর্মে থাকলে ওকে থামানো কঠিন। স্টিভ ওয়াহও আরেকজন। আসলে এই মুহূর্তে হঠাৎ করে বলতে গেলে হয়তো কারও নাম বাদ পড়ে যাবে। আপনি বরং দু-তিনদিন পর আমাকে জিজ্ঞাসা করুন। আমি ভেবে রাখব।

শুভ্র: ঠিক আছে। উত্তরটা কিন্তু আমার চাই। এবার যে প্রশ্নটা করব, তা মনে হয় একটু সহজ। এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা ফাস্ট বোলার মনে করেন কাকে?

ওয়াকার: না, না, এটা বলাও কঠিন। আসলে ক্রিকেটে প্রত্যেক দশকেই ‘গ্রেট’ বোলাররা এসেছে। যেমন ইমরান খান, মাইকেল হোল্ডিং, ডেনিস লিলি, ম্যালকম মার্শাল... এখন গ্লেন ম্যাকগ্রা খুব ভালো বল করছে, ওয়াসিম আকরাম তো আছেই, এমনকি শ্রীনাথকেও আমি খুব ভালো মনে করি। আসলে একজনকে বেছে নিয়ে ‘ও-ই সেরা’ এমন বলা খুব কঠিন। কারণ ফাস্ট বোলিং এমন এক ব্যাপার যে, আপনাকে প্রতিনিয়তই শিখতে হবে, আপনি কখনই কমপ্লিট হতে পারবেন না। এমনকি আপনি যদি ডেনিস লিলি-ইমরান খানকে জিজ্ঞাসা করেন, যাঁরা ১০-১৫ বছর আগে খেলা ছেড়েছেন, তাঁরাও আপনাকে বলবেন, 'ফাস্ট বোলারের কখনোই শেখার শেষ নেই, প্রতিদিনই আপনি নতুন কিছু শিখবেন।'

শুভ্র: এটা তো শুধু ফাস্ট বোলার না, স্পিনার-ব্যাটসমান সবার ক্ষেত্রেই সত্যি। এক কথায় যেকােনো ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেই। আপনি কাকে এই মুহূর্তে সেরা ফাস্ট বোলার মনে করেন, এই প্রশ্নের সঙ্গে তো এর কোনাে সম্পর্ক নেই। আপনি আপনার মতটা জানতে চাইছি।

ওয়াকার: আমি আসলে নির্দিষ্ট কারও নাম বলতে চাইছি না।