‘আমার অনেক লক্ষ্যই মার্টিন ঠিক করে দিয়েছেন’

উৎপল শুভ্র

৮ জানুয়ারি ২০২২

‘আমার অনেক লক্ষ্যই মার্টিন ঠিক করে দিয়েছেন’

মাত্র দুটি ওয়ানডে খেলার পর মার্টিন ক্রোকে ফোন করে তাঁর মেন্টর হতে বলেছিলেন রস টেলর। ওই ফোন কলেই শুরু অবিস্মরণীয় এক পার্টনারশিপের। ক্যান্সার অকালে তুলে নেওয়ার আগে রস টেলরের ক্যারিয়ারের অচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ছিলেন মার্টিন ক্রো। ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে নেওয়া রস টেলরের এই সাক্ষাৎকারের একমাত্র বিষয়ও ছিলেন তিনি।

উৎপল শুভ্র: প্রথম প্রশ্ন। কোন দিকটি আপনাকে মার্টিন ক্রোর কাছে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আপনাকে বলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল যে ‘আপনি কি আমার মেন্টর হবেন?’ 

রস টেলর: বেশ কয়েকটা দিকই ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তখন মাত্রই আমার শুরু। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে ওয়ানডেতে আমার রেকর্ড সবসময়ই ভালো ছিল। কিন্তু আমি শুধুই ওয়ানডের খেলোয়াড় হতে চাইনি। ভালো টেস্ট ব্যাটসম্যানও হতে চেয়েছি। আমার ম্যানেজারও তা জানত। মার্টিনের সঙ্গে ওর ভালো বন্ধুত্ব ছিল। ও-ই আমাকে বলল, ‘মার্টিন তোমাকে অনেক সাহায্য করতে পারবে, একবার কল করে দেখবে? এই নাও তাঁর নাম্বার।‘ আমি মার্টিনকে ফোন করলাম। ধারাভাষ্যকার ছিলেন বলে তাঁকে আগেই চিনতাম, আর আমার বেড়ে ওঠার সময়ে তো চিনতাম দারুণ একজন ক্রিকেটার হিসেবেও। তবে খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল না, বার দুয়েক হয়তো কথা হয়েছে। ফোন করতেই তিনি খুব আগ্রহ দেখালেন। আমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে এলেন, কয়েকটা সেশন হলো। আমরা কয়েকটা লক্ষ্য ঠিক করে লিখে রাখলাম। এর মধ্যে একটি ছিল টেস্টে ১৭টি সেঞ্চুরি করা (তখন টেস্টে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ড, যেটি ছিল মার্টিন ক্রোর)। 

উৎপল শুভ্র: প্রথম সাক্ষাৎটা কেমন ছিল...তখনই কি আপনার মনে হয়েছিল, এটা দারুণ একটা পার্টনারশিপ হতে যাচ্ছে? 

রস টেলর: খেলাটাকে দেখার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের দুজনের খুব মিল ছিল। রেড ওয়াইন পছন্দ করার দিক থেকেও (হাসি)। মনে আছে, ট্রেনিংয়ে নামার আগে আমরা জিমে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলাম। এরপর তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দুজনই রেড ওয়াইনে চুমুক দিলাম। তিনি চুমুক দিতে দিতে রান্না করলেন। এরপর দুজন মিলে কিছু লক্ষ্যের কথা লিখে রাখলাম। আমি অর্জন করতে চেয়েছি, বা অর্জন করেছি,  এমন অনেক লক্ষ্য মার্টিনই আমার জন্য ঠিক করে দিয়েছেন (হাসি)। 

উৎপল শুভ্র: ২০১৩ সালে আপনি অধিনায়কত্ব হারানোর পর মার্টিন ক্রো আপনাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন। যেখানে তিনি লিখেছেন, আপনি তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন যে, ‘আমি একদিন আপনার ১৭ টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙতে চাই'। 

রস টেলর: হ্যাঁ, ঠিক।  এটা তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখার সময়ই। তিনিই চাইছিলেন, আমি যেন তাঁর রেকর্ডটা ভেঙে দিই। এটা ২০০৬ সালের কথা। 

উৎপল শুভ্র: হ্যাঁ, আপনি ততদিনে দুটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলে ফেলেছেন...

রস টেলর: তা-ই মনে হয়। যদিও খুব বেশি একটা রান করিনি সেগুলোতে (হাসি)। ওই ১৭ সেঞ্চুরির লক্ষ্যটা ছুঁতে আমার অনেক সময় লেগেছে। তবে তাঁর সঙ্গে দেখা না হলে মনে হয় না কখনোই তা পারতাম। 

গুরু-শিষ্য: মার্টিন ক্রোর সঙ্গে রস টেলরউৎপল শুভ্র: ক্রিকেটারদের প্রায় সবারই এমন মেন্টর, গাইড বা কোচ থাকে। কিন্তু মার্টিন ক্রোর আপনার মেন্টর হওয়ার ব্যাপারটা অনেক বেশি আলোচিত। একেবারে ঘোষণা দিয়ে কাউকে মেন্টর বানানোটাও ব্যতিক্রমী। এটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন...

রস টেলর: আমার জন্য মার্টিন দারুণ একটা ব্যাপার ছিলেন। ক্যারিয়ারজুড়ে একজন খেলোয়াড়কে আবেগ, ফর্ম, এমন অনেক কিছুর ওঠানামার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব সামলে নিতে তিনি আমাকে যেভাবে সাহায্য করেছেন, এক কথায় তা অসাধারণ। তিনি নিজে কিভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতি সামলেছেন, সেসব অভিজ্ঞতা জানিয়ে পরামর্শ দিতেন। সব সময় যে শুধু ভালো ভালো কথাই বলতেন, মোটেই তা নয়। খুব স্পষ্টভাষী একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর এই দিকটি আমার ভালো লাগত, সেটি হচ্ছে, ফিডব্যাক দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সব সময় সৎ থাকতেন। কখনো কখনো তা দিতেন কড়া ভাষাতে।

উৎপল শুভ্র: এমন কিছু আছে...কোনো কথা বা পরামর্শ, যেটা এখনো আপনার মনে গেঁথে আছে? 

রস টেলর: এমন অনেকই আছে। ম্যাচের আগে আমাকে এসএমএস পাঠাতেন। সব ম্যাচের আগে না। প্রথম যেবার  তাঁর এসএমএস পড়েছি, সেবার আমি ২৯০ করলাম। ইন্টারেস্টিংলি এর পরের বার করলাম ২০০। উনি আরও বেশি এসএমএস পাঠালে মনে হয় আরও ভালো হতো (হাসি)।

উৎপল শুভ্র: আপনার সঙ্গে মার্টিন ক্রোর কাজটা তো টেকনিক্যাল দিকের চেয়ে মানসিক দিক নিয়েই বোধ হয় বেশি ছিল, তাই না? বিশেষ কিছু মনে পড়ে? 

রস টেলর: মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, তোমার সবকিছুই আছে, অভিজ্ঞতাও। যদি কখনো সময় খুব একটা ভালো না যায়, তুমি নিজেই সমস্যাটা বুঝে সমাধান বের করে নিতে পারবে। আরেকটা জিনিস খুব বলতেন, ক্রিকেট খুব কঠিন একটা খেলা, বিশেষ করে একজন ব্যাটসম্যানের জন্য। কিছু নির্দিষ্ট ব্যাপারই শুধু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে তুমি মাঠের বাইরে কেমন, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই তুমি মাঠে কেমন করবে, সেটা ঠিক করে দিতে পারে। ঘুম, ফোন, মিডিয়া...অনেক কিছুই থাকে, যেগুলো তুমি ড্রেসিংরুমে কেমন থাকবে, ব্যাটিংয়ে কেমন করবে, সে সবে প্রভাব ফেলতে পারে। সেগুলো যদি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারো, তাহলে সবকিছু অনেক সহজ হয়ে যাবে। 

রস টেলর ভেঙে দেওয়ার আগে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল মার্টিন ক্রোর। ছবি: গেটি ইমেজেসউৎপল শুভ্র: মার্টিন ক্রোকে কি ব্যাট করতে দেখেছেন? নাকি সে সময় অনেক ছোট ছিলেন? 

রস টেলর: খুব বেশি না। তবে পরে টিভিতে অনেক দেখেছি। তিনি স্কাই টিভিতে কাজ করতেন, সেখানে আমরা পুরোনো ফুটেজ দেখতাম। যখন আমি ১৮-১৯ বছরের ছিলাম, তখনকার ফুটেজ। তাঁর টেস্ট ব্যাটিংয়ের ফুটেজ। (১৯৯৪ সালে) লর্ডস আর ম্যানচেস্টারের দুটি সেঞ্চুরিকে তিনি তাঁর সেঞ্চুরিগুলোর মধ্যে সেরা মনে করতেন। আমার ফুটেজগুলো ছিল শুধুই সাদা বলের ক্রিকেটের। কারণ টিভিতে শুধু সাদা বলের ক্রিকেটই দেখানো হতো। কিন্তু আমি তো তাঁর কাছে যেতাম টেস্ট ব্যাটিং শিখতে। তখনই তাঁর সেঞ্চুরির ইনিংসগুলো দেখার সুযোগ হতো। 

উৎপল শুভ্র: লর্ডসের ওই সেঞ্চুরি তো এক পায়ে ব্যাটিংয়ের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে...

রস টেলর: আপনি মার্টিনের সম্পর্কে ভালোই জানেন দেখছি। হ্যাঁ, এক পায়েই তো খেলেছিলেন, তারপরও সেঞ্চুরি করার মতো এত লম্বা সময় (৩৬৪ মিনিট) ব্যাটিং করে যাওয়া তাঁর অসম্ভব মানসিক দৃঢ়তার কথাই বলে।  

উৎপল শুভ্র: এদিক থেকে তো আপনি গুরুর উপযুক্ত শিষ্যই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডানেডিনে আপনার ম্যাচ জেতানো অপরাজিত ১৮১-এর শেষ প্রায় ৮০ রান তো এক পায়েই...

রস টেলর: মার্টিনের শুধু পেশিতে সমস্যা হচ্ছিল, আমি চোট পেয়েছিলাম হাড়েও (সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে)। দুটিই স্পেশাল ইনিংস। তাঁর জন্য যেমন লর্ডস স্পেশাল, আমার জন্যও ওভাবে ১৮০ রান করা, জিততেই হবে... এমন একটা ম্যাচে দলকে জিততে সাহায্য করা দারুণ ব্যাপার ছিল (ইংল্যান্ডের ৩৩৫ রান তাড়া করে ৫ উইকেটে জিতেছিল নিউজিল্যান্ড)। 

মার্টিন ক্রোর শরীরে মারণব্যাধির অস্তিত্ব ধরা পড়ে গেছে ততদিনে...উৎপল শুভ্র: মার্টিন ক্রোর চলে যাওয়ার সেই ভয়ঙ্কর খবরটা যখন পেয়েছিলেন, সেই মুহূর্তটার কথা মনে আছে? 

রস টেলর: তখন তো বিশ্বকাপ (২০১৫) চলছে। আমরা বিমানে উঠতে যাচ্ছিলাম। সকাল দশটার মতো বাজছিল। খবর পেলাম, তিনি মারা গেছেন। 

উৎপল শুভ্র: প্রথম যখন তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ার খবরটা শুনেছিলেন, সেটাও তো...

রস টেলর: ওহ্, তখন আমি দক্ষিণ আফ্রিকা ট্যুরে। তিনিই ফোন করেছিলেন। আমি চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলছিলাম। আমি তো শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার পৃথিবীটাই যেন সেই মুহূর্তে হঠাৎ বদলে গেল! এমন কেউ একজন, যাঁর সঙ্গে আপনার অনেক মিল, আপনার জীবনে যাঁর অনেক বড় প্রভাব, অনেক সময় যাঁর সঙ্গে কাটিয়েছেন...শুধু ক্রিকেট নিয়েই নয়, জীবন নিয়ে আলোচনায়ও ...তাঁর এমন একটা কিছু শুনলে... 

উৎপল শুভ্র: তবে ক্রিকেটার হিসেবে যেমন চ্যাম্পিয়ন ছিলেন, ক্যান্সারের সঙ্গে্ও তো চ্যাম্পিয়নের মতোই লড়ে গেছেন, তাই না?

রস টেলর: হ্যাঁ। ২০১৫ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডে তাঁকে মাঠে করতালিতে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল। সবাই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৯২ বিশ্বকাপে যা কিছু, সব তো তাঁরই অবদান। এত অসুস্থ থাকার পরও তিনি কিছু ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন, এদিক-ওদিক ভ্রমণ করেছিলেন। কেমন মানুষ ছিলেন, সেটাও হয়তো বোঝা যায় এতে। 

শততম টেস্টে রস টেলর। মনে লুকিয়ে রাখা লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ১০০ টেস্ট খেলার কথাটা বলে দিয়েছিলেন। তিন ফরম্যাটেই কমপক্ষে ১০০ ম্যাচ খেলার প্রথম কীর্তি গড়েছেন রস টেলরউৎপল শুভ্র: এই ঘটনার পর কি আপনার কখনো এমন মনে হয়েছে, ক্রিকেট খুব ঠুনকো একটা ব্যাপার।

রস টেলর: এখনো কিছু জিনিস আছে যেগুলো আমি অর্জন করতে চাই, মার্টিনের জন্য, আমার পরিবারের জন্য। সেটা করতে পারলে আমি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে গর্ব করতে পারব। 

উৎপল শুভ্র: ওই লক্ষ্যগুলো কী?

রস টেলর: আহ...আমি সেগুলো গোপন রাখতে চাই। এর মধ্যে একটা অবশ্যই ১০০ টেস্ট খেলা। তবে শুধু খেলার জন্য খেলা নয়, ১০০ টেস্ট জুড়ে ভালো খেলাও। 

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×