বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার পর মাশরাফি

`ক্যাপ্টেনসি করায় আলাদা গর্ব খুঁজে পাইনি`

উৎপল শুভ্র

৫ অক্টোবর ২০২১

`ক্যাপ্টেনসি করায় আলাদা গর্ব খুঁজে পাইনি`

মাশরাফি বিন মুর্তজা

ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়ক তিনি আগে থেকেই। ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার রেকর্ডটাও হয়ে গেছে সেদিন। সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রেকর্ড গড়ার ম্যাচ জিতে সিরিজও জিতেছেন। টিম হোটেলে সেই রাতেই এই ইন্টারভিউ। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার ইন্টারভিউ।

প্রথম প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮। প্রথম আলো।

উৎপল শুভ্র: এই ম্যাচের টসটা তো ছিল অন্য রকম যেটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার রেকর্ডটা আপনার হয়ে গেল। টস করতে যাওয়ার সময় কেমন লাগছিল? 

মাশরাফি বিন মুর্তজা: টস করতে নামার সময় এটা খেয়ালই ছিল না। পুরো কনসেনট্রেশন ছিল ম্যাচটা জেতা নিয়ে, টসটা জেতা নিয়ে। কারণ এই ম্যাচে টস জেতাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। টস তো আর আপনি বলে-কয়ে জিততে পারবেন না আর টস এমনিতেই আমি একটু হারি বেশি। একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম বলেই হয়তো এটা খেয়াল ছিল না। ম্যাচের পরে খেয়াল হয়েছে, তখন ভালো লেগেছে। 

শুভ্র: এই ভালো লাগাটা কি একটু ব্যাখ্যা করা যায়...আপনার কাছে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করার রেকর্ডের অর্থ কী? 

মাশরাফি: অধিনায়কত্ব করায় আমি কখনো আলাদা করে গর্ব করার কিছু খুঁজে পাইনি। আমার কাছে বাংলাদেশ টিমে খেলার থেকে বেশি গর্বের আর কিছু নেই। ক্যাপ্টেনসি আসলে একটা এক্সট্রা জিনিস, বলতে পারেন আল্লাহর রহমত যে আপনি পেয়েছেন আরকি! তবে যে ম্যাচে রেকর্ডটা হলো, সেটি জিততে পেরেছি, সিরিজটা জিততে পেরেছি, এটাই বড় কথা।সেই সাক্ষাৎকারের রাতে, মাশরাফির সঙ্গে উৎপল শুভ্র

শুভ্র: ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচটার কথা মনে আছে? 

মাশরাফি: ফার্স্ট ম্যাচটা বোধ হয়...ইংল্যান্ডে, আমি কোনো উইকেট পাইনি। রকিবুল বোধ হয় ৭৬ করেছিল, ইনজুরড হয়ে গেল পরে, সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটা খেলতে পারল না। দ্বিতীয় ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম, আমি ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলাম। 

শুভ্র: ব্রিস্টলের সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারানোর কদিন পরই আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেটি কত বড় ধাক্কা ছিল? 

মাশরাফি: আয়ারল্যান্ডের কাছে ওদের কন্ডিশনে মানুষ তখন ফিফটি-ফিফটি চিন্তা করত। বাংলাদেশের ক্রিকেট এগোলেও আমরা তখন একটা জায়গায় আটকে ছিলাম। আর নেদারল্যান্ডসের সময় তখনো আমি অতটা পরিপক্ব হয়ে উঠিনি। এখনই ক্যাপ্টেনসি নিয়ে অনেক কিছু ভাবি না, তখন তো আরও কম ভাবতাম। জেতা ম্যাচই হেরেছিলাম। ফিল্ডিং মিস-ক্যাচ মিস অনেক কিছু হয়েছিল। 

শুভ্র: প্রশ্নটা এ কারণে করলাম, অধিনায়কত্ব শুরুর পাঁচ-ছয়টা ম্যাচের মধ্যেই অমন দুটি পরাজয়--এটা তো নাড়িয়ে দেওয়ার মতো, তাই না? 

মাশরাফি: না, তেমন কিছু হয়নি। এটা নিয়ে প্রশ্ন হবে, উত্তর দিতে হবে, সমালোচনা হতে পারে-হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এত কিছু ভাবিনি। 

শুভ্র: অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় কোনটা ছিল? 

মাশরাফি: ২০১৫ ওয়ার্ল্ড কাপ। কারণ, আমি জানতাম যে আমার খুব ভালো টিম এবং আমাদের (পরের রাউন্ডে) যাওয়ার খুব ভালো সুযোগ আছে। কেউ সেটা ভাবেনি, কিন্তু টিমের দিকে তাকিয়ে আমার সেটা মনে হয়েছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে হারার পরে অনেক চাপে ছিলাম। একটু সংশয়েও পড়ে গিয়েছিলাম। তারপরও আমার মনে হচ্ছিল, বাকি দুইটা বড় ম্যাচ হলেও একটা জিতলেই তো আমরা উঠে যাব। বিশ্বকাপ যেহেতু, এটিকেই সবকিছুর চেয়ে এগিয়ে রাখব। আর একটা বললে বলব যে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল খেলা। ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক!

শুভ্র: এটা তো ইতিবাচক অর্থে। আমার প্রশ্নটা ছিল, এমন কোনো সময় কি এসেছে, যখন বুঝে উঠতে পারছেন না কী করবেন...

মাশরাফি: নির্দিষ্ট কোনো ম্যাচে? 

শুভ্র: নির্দিষ্ট কোনো সময়কাল... 

মাশরাফি: সাউথ আফ্রিকায় লাস্ট ট্যুরটা (২০১৭)। কন্ডিশন তো বিপক্ষে ছিলই, টিমটাও আমার কাছে মনে হচ্ছিল একটু ভারসাম্যহীন। চেষ্টা করেও অনেক কিছু মেলাতে পারছিলাম না। কখনো কখনো অসহায় লাগছিল। 

শুভ্র: এমন কিছু কি আছে, অধিনায়ক মাশরাফি যেটিকে ‘মন্ত্র’ বলে মানেন? 

মাশরাফি: আমি সব সময় একটা জিনিসে আস্থা রাখতে চেয়েছি, এখনো পর্যন্ত রেখে যাচ্ছি, সেটা হলো গাট ফিলিং। মাঠের ভেতরে, যে যা-ই বলুক, আমি গাট ফিলিংয়ে থাকতে চাই। কারণ, কেন জানি মনে হয়, সব কাজেই এটা আমার শক্তির জায়গা। আমি আগেই সবকিছু ঠিক করে রাখি না। ওই সময় মন যা বলে, তা-ই করি। 

শুভ্র: এ রকম একটা-দুইটা উদাহরণ কি দেওয়া যায়, যা কাজে এসেছে? 

মাশরাফি: ২০১৫ সালে সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে তৃতীয় ওয়ানডে...রিয়াদকে বোলিং করানো, কোচ বাইরে থেকে বলছিল না করালে ভালো হয়। আমি জোর করে করালাম। রিয়াদ রুশোকে আউট করল সম্ভবত। এ রকম অনেক আছে, ওই বছরই ইন্ডিয়ার সঙ্গে ম্যাচেও আছে, ওয়ার্ল্ড কাপেও আছে। প্রায় সব ম্যাচেই আছে এগুলো। তাঁর চোখে সেরা অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের সঙ্গে মাশরাফি

শুভ্র: মন যা বলে তা শোনেন বলছেন, তবে ক্রিকেটিং যুক্তির ওপর কিছু তো নির্ভরতা থাকেই, তাই না? 

মাশরাফি: ক্রিকেটিং যুক্তি তো থাকতেই হবে। সেটা অবশ্যই থাকে, তবে কখনো কখনো সাধারণ যুক্তিতে যা আসে না, ওই টাইপের বোলার দিয়ে বল করিয়ে অনেকবারই আমি ম্যাচ চেঞ্জ করেছি। 

শুভ্র: টেস্ট যুগে বাংলাদেশের বাকি সব অধিনায়কের অধীনেই খেলেছেন আপনি। আপনার চোখে তাঁদের মধ্যে সেরা কে? 

মাশরাফি: সুমন ভাই (হাবিবুল বাশার)। আমার সব সময় মনে হয়, উনি খুব কঠিন সময়ে ক্যাপ্টেনসি করেছেন। সেই সময় আর এই সময় এক না। 

শুভ্র: তাহলে তো হাবিবুল বাশারের রেকর্ড ভাঙাটা আপনার কাছে স্পেশাল কিছু হওয়ার কথা? 

মাশরাফি: আমার কাছে সুমন ভাই সব সময় স্পেশাল। সব সময়ই এটা বলে আসছি। 

শুভ্র: সেই কারণেই বলছি, আপনার কাছে হাবিবুল বাশারের রেকর্ড ভাঙার বাড়তি তাৎপর্য আছে কি না...

মাশরাফি: না, আসলে তা না। যদি ওভাবে ক্যাপ্টেনসিকে আলাদাভাবে দেখেন তো একটা মাইলস্টোনে যাওয়া অবশ্যই গর্বের ব্যাপার। আমার ফ্যামিলির জন্য তো অবশ্যই। তবে নির্দিষ্ট কাউকে ছাড়িয়ে গেছি বলে এটা বিশেষ কিছু হয়ে থাকবে, আমার এমন মনে হয় না। ধোনিকে দেখে মাশরাফির মনে হয়েছিল, `এই না হলে ক্যাপ্টেন!`

শুভ্র: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার ১৭ বছরে বিশ্বের কত অধিনায়ককেই তো দেখেছেন। কাউকে দেখে কি মনে হয়েছে, না, এই হলো ক্যাপ্টেন! 

মাশরাফি: অনেক পরে হলেও ধোনিকে দেখে মনে হয়েছে...এর আগে সৌরভ গাঙ্গুলী, রিকি পন্টিং দেখেও। অনেকে বলে, পন্টিংয়ের দলটা ভালো ছিল বলে তাঁর কিছু করতে হতো না। এটা ভুল ধারণা। দলে এ ধরনের সব স্টার থাকলে ওদের সবাইকে ম্যানেজ করা সব থেকে কঠিন। এটা অনেকে না বুঝে বলে। 

শুভ্র: অধিনায়ক হিসেবে এটা কি সবচেয়ে কঠিন সিরিজ গেল? প্রশ্নটা কেন করছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন…

মাশরাফি: বুঝতে তো পারছিই। হ্যাঁ, হয়তোবা অনেকে তাকিয়ে ছিল, আমার কনসেনট্রেশন আগের মতো আছে কি না, সবকিছু আগের মতো মন দিয়ে করতে পারছি কি না, এগুলো কিন্তু বিবেচনা হতো। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমি বিন্দু পরিমাণ এগুলো ভাবিনি। কারণ, ভাবলেই আমি প্রেশার নিতে থাকব। প্রেশার যে ছিল না তা না, যেভাবেই হোক কন্ট্রোল করতে পেরেছি। খুব গভীরভাবে কিছু ভাবিনি। আর দশটা সিরিজের মতো আমার প্রিপারেশন ঠিক আছে কি না, মেন্টালি ঠিক আছি কি না, এটাই শুধু কনফার্ম করার চেষ্টা করেছি। 

শুভ্র: কাজটা অনেক কঠিন ছিল? 

মাশরাফি: নাহ্! একদমই না।
 

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন