স্যার আইজ্যাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডসের ওপর দিয়ে বড় ঝড়-ঝাপটা যাচ্ছে এ বছর! ঠিক রিচার্ডসের ওপর দিয়ে নয়, যত দূর জানি, অ্যান্টিগায় নিজের বাড়িতে ভালোই আছেন তিনি। ঝড়-ঝাপটা যাচ্ছে রিচার্ডসের রেকর্ডের ওপর দিয়ে। রিচার্ডস ভালো আছেন বলছি, তবে নিজের রেকর্ডের ওপর এমন ক্রমাগত আক্রমণে তিনি ভালো থাকেনই বা কীভাবে?

এ বছরই রেকর্ড বইয়ের একটা পাতা থেকে তাঁর নাম মুছে দিয়েছেন মোহাম্মদ ইউসুফ। টেস্ট ক্রিকেটে এক পঞ্জিকাবর্ষে সবচেয়ে বেশি রানের যে রেকর্ডটি তিন দশক ধরে সঙ্গী হয়ে ছিল, সেটি হারিয়ে রিচার্ডসের কি একটু খালি-খালি লাগেনি? না লাগাটাই অস্বাভাবিক। সেই খালি-খালি অনুভূতিটা গত ১৬ ডিসেম্বর আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। রিচার্ডসকে বাঁচালেন ম্যাথু হগার্ড!

পার্থ টেস্টের তৃতীয় দিনে গিলক্রিস্ট ৫৪ বলে ৯৭ রান করে ফেলার পর রিচার্ডসের ৫৬ বলে সেঞ্চুরির রেকর্ডটিরও অতীত হয়ে যাওয়া একরকম নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। রেকর্ডটির কথা গিলক্রিস্টের জানা থাকলে হয়তো তা-ই হতো। গিলক্রিস্ট না জানলেও হগার্ড জানতেন। এ কারণেই বলটি করলেন অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে। রেকর্ড-টেকর্ড মাথায় ছিল না বলেই সেটিকে আর তাড়া করলেন না গিলক্রিস্ট। অ্যান্টিগার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল ভিভ রিচার্ডসের স্বস্তির নিঃশ্বাস।

বোলারদের কাছে যতই অন্য রকম মনে হোক, বরাবরই খেলোয়াড়ি ভদ্রতার প্রতিমূর্তি সর্বকালের সেরা উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান সেরা স্ট্রোকটি খেললেন ১০২ রানে অপরাজিত থেকে ফেরার পর—‘রেকর্ডটা রিচার্ডসের থেকে যাওয়াটাই ভালো হয়েছে। এই রেকর্ড তাঁকেই সবচেয়ে ভালো মানায়।’

কথাটা শুধুই গিলক্রিস্টের বিনয় নয়। রিচার্ডসকে যাঁরা দেখেছেন, অনুমান করি, তাঁদের সবাই সেদিন হগার্ডকে ধন্যবাদই দিয়েছেন। রিচার্ডসের ব্যাটিং মানে শুধু রান ছিল না, তা থেকে ফুটে বেরোত প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা। টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটা তো এটিরই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

‘লজ্জা’ কাকে বলে—১৯৮৬ সালের ১৫ এপ্রিল তা সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন সেই অ্যান্টিগা টেস্টে ইংল্যান্ডের বোলার চতুষ্টয়—ইয়ান বোথাম, নিল ফস্টার, রিচার্ড এলিসন ও জন এম্বুরি।

গিলক্রিস্টের ব্যাটিং-তাণ্ডব যখন ক্রমশ উচ্চগ্রামে উঠছে, ডেভিড গাওয়ার সহ-ধারাভাষ্যকারকে মনে করিয়ে দিলেন, রিচার্ডসের রেকর্ড কিন্তু হুমকির মুখে। তারপর লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বললেন, ‘রিচার্ডসের রেকর্ড গড়ার ম্যাচে আমিই ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলাম কি না!’

ক্রিকেটে সবকিছু অধিনায়কের ওপরই বর্তায়, গাওয়ারের লজ্জা-লজ্জা ভাবটা সে কারণেই। নইলে তাঁর তো লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তিনি তো বোলার ছিলেন না। ‘লজ্জা’ কাকে বলে—১৯৮৬ সালের ১৫ এপ্রিল তা সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন সেই অ্যান্টিগা টেস্টে ইংল্যান্ডের বোলার চতুষ্টয়—ইয়ান বোথাম, নিল ফস্টার, রিচার্ড এলিসন ও জন এম্বুরি।

সেই টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪৭৪ রানের প্রথম ইনিংসের জবাবে ইংল্যান্ড করেছিল ৩১০। দুদলের একটি করে ইনিংস শেষ হতেই চলে গেছে প্রায় সোয়া চার দিন। টানা দ্বিতীয় সিরিজে ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ (অনেকে অবশ্য বলেন, ব্ল্যাকওয়াশ) করতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তাই দ্রুত রান করে ডিক্লেয়ার করার তাড়া ছিল। রিচার্ডসের আরেকটি কর্তব্যও ছিল। ঘরের মাঠ অ্যান্টিগার সেন্ট জনসে খেলা—এটাই বড় একটা উপলক্ষ। তার ওপর বাবা ম্যালকম রিচার্ডস গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁকে চাঙা করে তোলার একটা দায়িত্ব আছে না! সব মিলিয়ে উপলক্ষটা হয়ে উঠেছিল আরও বড়। আর রিচার্ডসের ক্যারিয়ার তো সব সময়ই মেনে চলেছে একটা নিয়ম—যত বড় মঞ্চ, ততই চওড়া তাঁর ব্যাট। উপলক্ষ যত বড়, তাঁর ব্যাটও ততই বিধ্বংসী।

স্কোরবোর্ডে ১০০ রান উঠে যাওয়ার পর ভাঙল ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্বোধনী জুটি। রিচি রিচার্ডসন আউট হয়ে যাওয়ার পর নামলেন রিচার্ডস। চা-বিরতির ২৮ মিনিট আগে। প্রথম দুটি বল রক্ষণাত্মকভাবে খেলার পর তৃতীয় বলে ৩ রান। পরের চার বলের মধ্যে এলিসন ও এম্বুরিকে বিশাল দুটি ছক্কা দিয়েছিল আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। চা-বিরতির সময় রিচার্ডস ১৫ বলে ২৮ করে অপরাজিত। বিরতির পর মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই চার, এরপর কিছুক্ষণ খুবই শান্তশিষ্ট মনে হলো তাঁকে, পরের ১৮ বলে ১৫ রান, চার-ছয়ের কোনো ব্যাপার নেই। ইংলিশ বোলারদের নাকের জল-চোখের জল এক করে দেওয়া ঝড়টা শুরু হলো এর পরই। এম্বুরির বলে বিশাল এক ছক্কা মেরে উন্মাতাল দর্শকদের উদ্দেশে ব্যাট তুললেন রিচার্ডস। হাফ সেঞ্চুরি! ৩৫ বলে ৫৩!

সেদিনের ভিভ রিচার্ডস মানে এমন সব ছবির কোলাজ। ছবি: গেটি ইমেজেস

এম্বুরির বলে ওই ছক্কাটা ক্রিকেট সাংবাদিক জ্যাক ব্যানিস্টার পরে মেপে দেখেছিলেন। ‘মাত্র’ ১২৫ গজ! রিচার্ডসের প্রমত্ত রূপ দেখে তাঁর দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুই বোলার বোথাম ও এম্বুরির শরণাপন্ন হয়েছিলেন গাওয়ার। এর মধ্যে এম্বুরি আক্ষরিক অর্থেই ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ বলে পালিয়ে বাঁচেন। একবার একটু বেশি ফ্লাইট দিয়ে বল আস্তে ছেড়েছিলেন, ভিভ এগিয়ে এসে বলের নাগাল পাননি, মুহূর্তের জন্য এম্বুরির মনে হয়েছিল ভিভকে তিনি বাগে পেয়েছেন। আসলে কী হলো?

এম্বুরির মুখেই শুনুন, ‘ভিভ নাগালের বাইরের ওই বলেই স্ট্রোক খেলল, ব্যাট থেকে সরে গেল তাঁর ডান হাত, এক হাতেই সেই বলকে লং অনের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দিল ও! এর পরই আমি আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিই। ডেভিডকে (গাওয়ার) গিয়ে বলি, আমাকে মাফ করো। অন্য কাউকে দিয়ে বল করাও।’ রিচার্ডস নামার সময় এম্বুরির বোলিং বিশ্লেষণ ছিল ৯-০-১৪-০, ততক্ষণে সেটি হয়ে গেছে ১৪-০-৮৩-০!

বোথামের বলে একটি ছক্কা গ্যালারিতে এক দর্শকের রামের বোতল ভেঙে আবার ফিরে আসে মাঠে। সেটিতে তখন একটা কাচের টুকরো গাঁথা! আরেকটি ছক্কায় রিচার্ডস বল পাঠান মাঠের পাশের জেলখানায়। অসুস্থ বাবার কথা ভেবেই কি? ভিভের বাবা যে এই জেলেরই দ্বাররক্ষী ছিলেন।

সমারসেটে অনেক দিন একসঙ্গে খেলার সুবাদে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ইয়ান বোথামও রিচার্ডসের কাছ থেকে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পাননি। বোথামের বলে একটি ছক্কা গ্যালারিতে এক দর্শকের রামের বোতল ভেঙে আবার ফিরে আসে মাঠে। সেটিতে তখন একটা কাচের টুকরো গাঁথা! আরেকটি ছক্কায় রিচার্ডস বল পাঠান মাঠের পাশের জেলখানায়। অসুস্থ বাবার কথা ভেবেই কি? ভিভের বাবা যে এই জেলেরই দ্বাররক্ষী ছিলেন।

৪৮ বলে ৯৩ রান করার পর সেঞ্চুরিটা নিশ্চিত করার ব্যাপারে একটু মনোযোগী হয়েছিলেন রিচার্ডস। এ কারণেই পরের সাত বলে এল মাত্র ৬ রান। ৫৫ বলে ৯৯, ততক্ষণে এম্বুরি আবার আক্রমণে ফিরেছেন। হগার্ড গিলক্রিস্টকে যা করেছিলেন, ততটা না হলেও এম্বুরির বলটিও অফ স্টাম্পের বেশ বাইরেই ছিল। সেটিতে কাট করে বাউন্ডারি, ভেঙে গেল অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডার জ্যাক গ্রেগরির ৬৭ বলে সেঞ্চুরির রেকর্ড। রিক্রিয়েশন গ্রাউন্ডে তখন কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো গর্জন।

এম্বুরির বলে আরেকটি ছক্কা ও একটি সিঙ্গেল নেওয়ার পর ইনিংস ঘোষণা করে ফিরে এলেন রিচার্ডস। সিঙ্গেলটির জন্য কেন অপেক্ষা করেছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখনো পাইনি।