ক্রিকেটের লম্বা দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক বলতে এতদিন সবাই একজনকেই চিনত। ডব্লিউ জি গ্রেসের সেই একাধিপত্যে ভাগ বসিয়েছেন সাঈদ আনোয়ার।

আম্পায়ার তাঁকে আউট ঘোষণা করেছেন, তিনি কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আবার স্টান্স নিতে নিতে আম্পায়ারকে বলছেন, ‌‘ওহে ছোকড়া, এই দর্শকেরা তোমার আম্পায়ারিং দেখতে আসেনি, এসেছে আমার ব্যাটিং দেখতে।’ বোলিং করতে এসে হঠাৎ থেমে ব্যাটসম্যানকে বলছেন, ‌‘দেখো, দেখো সূর্যটার কী অবস্থা।’ সূর্যের দিকে তাকিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যান পরের বলেই বোল্ড! এমন সব অমর গল্প আছে ডব্লিউ জি গ্রেসকে নিয়ে।

শুধু দুষ্টবুদ্ধির গল্পই নয়, আধুনিক ব্যাটিং ব্যাকরণের ভিতটা গড়ে দেওয়ার কৃতিত্বও দেওয়া হয় এই ইংরেজ ভদ্রলোককে। ডব্লিউ জি গ্রেসের সঙ্গে তুলনায় যে কোনো ব্যাটসম্যানের তাই খুশিই হওয়ার কথা। তারপরও সাঈদ আনোয়ারকে এই মিলের কথা বলতে একটু ইতস্তত করছিলাম। তিনি রাগ করতে পারেন ভেবে।

ডব্লিউ জি গ্রেসের দাড়ি ছিল শখের দাড়ি। কিন্তু সাঈদ আনোয়ার দাড়ি রেখেছেন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে। করাচিতে সাঈদ আনোয়ারের সঙ্গে এক সঙ্গে বড় হয়েছেন, তিন-চার বছর পাকিস্তান দলে নিয়মিত ছিলেন, এমন এক ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে শুনেছি, পাকিস্তান দলে ‌‘প্র্যাকটিক্যাল জোক’ করায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক নম্বর এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। বাক্যের শেষাংশে ‌‘ছিলেন’ শব্দটা লেখা উচিত ছিল। কারণ সেসব দিন এখন ধূসর অতীত। সাঈদ আনোয়ার নিজেই বলছেন, ‌‘আগে আমি নিয়মিত সিনেমা দেখতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মিউজিক শুনতাম। কিন্তু এখন খেলার বাইরে আমি সবাইকে ধর্মের পথে আসতে বলি।’

আগের ছটফটে ভাবের বদলে চোখেমুখে আশ্চর্য এক প্রশান্তি। ,দাড়ি প্রসঙ্গে ডব্লিউ জি গ্রেসের কথা তোলাতেও রাগ দূরে থাক, উল্টো হাসলেন। শিক্ষিত মানুষ, ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে জানাশোনাও আছে। ডব্লিউজির কথা শুনেই তাই বললেন, 'হি ওয়াজ আ লেজেন্ড। সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক মানুষ।' 

সাঈদ আনোয়ার: 'সব ধর্মই শান্তির কথা বলে'

তাবলিগ শব্দটা বাংলাদেশে খুবই পরিচিত। সাঈদ আনোয়ার এখন তাবলিগে নিবেদিত প্রাণ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, চলেন কোরআন-নির্দেশিত পথে। তবে ধর্ম নিয়ে তাঁর গোঁড়ামি নেই। বরং তিনি মনে করেন 'যার যার ধর্ম তার তার কাছে'। এ কারণেই বলেন, ‌‘সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। কোনো ধর্মই কাউকে হত্যা করার কথা বলে না।’ বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের কোনো বিরোধও দেখেন না। কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রিধারী কেউ এমন বললে তা বিশ্বাস করতেই হয়।

লম্বা দাড়ি রেখে সাঈদ আনোয়ারের ধর্মকর্মে এত মনোযোগী হয়ে পড়ার পেছনে অবশ্য ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস বড় মর্মান্তিক। ২০০১ সালে সাড়ে তিন বছরের মেয়ে বিসমার মৃত্যুই জীবনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শিখিয়েছে সাঈদ আনোয়ারকেও। ক্রিকেটকেও দেখছেন নতুনভাবে, ‌‘যত গ্রেট খেলোয়াড়ই হোক, খেলায় থাকা পর্যন্তই সে গ্রেট। খেলা ছাড়ার পর কেউ মনে রাখে না। আমার দেখা সেরা ভিভ রিচার্ডসের কথা এখন কজন বলে? পাকিস্তানেও কেউ ইমরান খানের কথা বলে না। টেলিভিশন যুগে নতুন খেলোয়াড়েরা খুব তাড়াতাড়িই ভুলিয়ে দিচ্ছে অতীতকে।’

এ কারণেই খেলোয়াড় হিসাবে গ্রেট হওয়ার চেয়ে ‌‘ভালো মানুষ’ হওয়াটা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সাঈদ আনোয়ারের কাছে। সেই চেষ্টাই করছেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের (১৯৪) রেকর্ডটি এখনও তাঁর অধিকারে, কিন্তু ওয়ানডেতে আট হাজারের বেশি রান করা ব্যাটসম্যানকে চেনা যাচ্ছে না ইদানীং। ধর্মকর্মে বেশি ঝুঁকে পড়াকেই অনেকে কারণ মনে করেন। যদিও সাঈদ আনোয়ার তা মানতে রাজি নন। কবজির ইনজুরির কারণে প্রায় এক বছর খেলার বাইরে থাকাটাকেই দায়ী করছেন এ জন্য, ‌‘ তরুণ খেলোয়াড়দেরই এত দিন বাইরে থাকলে সমস্যা হয়, আর আমার তো পঁয়ত্রিশ হয়ে গেছে!’

ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিসের সঙ্গে সাঈদ আনোয়ার

আগামী বিশ্বকাপটা (২০০৩) খেলেই শেষ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ফর্ম তাঁকেও এত ভাবাচ্ছে যে, কলম্বোতে নেমেই ঘোষণা করেছিলেন আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কেমন খেলেন, তার ওপরই নির্ভর করছে থাকবেন না বিদায় নেবেন। বললেন কারণটাও, ‌‘আমি অনেক বড় খেলোয়াড়কেও অসম্মানজনকভাবে ছুড়ে ফেলতে দেখেছি। আমার ক্ষেত্রে সেটা হোক, তা চাই না।’

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের ৫২ মোটেই সাঈদ আনোয়ারসুলভ ছিল না। তবে অনেক দিন পর পাওয়া হাফ সেঞ্চুরিটি হারানো আত্মবিশ্বাস কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছে। টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের দ্বিতীয় এবং অভাবিত কিছু না ঘটলে শেষ ম্যাচ হল্যান্ডের বিপক্ষে। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় মেনে নেওয়া পাকিস্তান দলের কাছে সেই ম্যাচটির হয়তো আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। সাঈদ আনোয়ারের কাছে আছে। আপাত গুরুত্বহীন সেই ম্যাচে ভালো কিছু করতে না পারলে ক্রিকেটকে বিদায় জানাবেন সাঈদ আনোয়ার। ক্রিকেট পরবর্তী জীবনের ছক তো তাঁর কাটাই আছে।

সংযোজন: হল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০২ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে পাকিস্তানের শেষ ম্যাচে অপরাজিত ২৮ করেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। খেলেছিলেন ২০০৩ বিশ্বকাপেও। টেন্ডুলকারের ৯৮ রানের ইনিংসে বিথ্যাত হয়ে থাকা সেই ম্যাচে সেঞ্চুরিও করেছিলেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও হয়তো করতে পারতেন। কিন্তু বৃষ্টি সেই সম্ভাবনায় জল ঢেলে দেয়। খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় সাঈদ আনোয়ার অপরাজিত ছিলেন ৪০ রানে। সেটাই তাঁর শেষ ম্যাচ। তার মানে অপরাজিত থেকেই ক্রিকেট ছেড়েছেন সাঈদ আনোয়ার।

আরও পড়ুন......
একসঙ্গে সাঈদ আনোয়ার-আমির সোহেল
সাঈদ আনোয়ার-আমির সোহেল: ইন্টারভিউয়ে যা লেখা হয়নি
রশিদ লতিফের জবানিতে ব্যাটসম্যান ও মানুষ সাঈদ আনোয়ার
সাঈদ আনোয়ার: অন্তত সেদিনের ‘বেস্ট’