ঢাকার মাঠে সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব

দুলাল মাহমুদ

১৯ এপ্রিল ২০২১

ঢাকার মাঠে সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব

স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে ক্রীড়ানুরাগীদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন অনেক খেলোয়াড়, অনেক অতিথি, মনে ছাপ রেখে গেছে খেলার অনেক আয়োজন। এ সব থেকে সেরা ৫০ বাছাই করতে গেলে হিমশিম খেতে হবেই। হয়তো বিতর্কও হবে। তারপরও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একটা চেষ্টা করে দেখা তো যেতেই পারে। কী বলেন?

রাজনৈতিক ভাঙা-গড়া আর উথাল-পাথালের মধ্যেও সত্তর দশকে ফুটবলের জোয়ারে সামান্যতম ভাটা পড়েনি। বরং চারপাশে ছিল ফুটবলের কুলপ্লাবী উচ্ছ্বাসের প্রাচুর্য। ঘরোয়া ফুটবলের তীব্র আর্কষণে ঢাকা স্টেডিয়ামে পঙ্গপালের মতো ছুটে যেতেন দর্শকেরা। অন্য দিকে মনোযোগ দেওয়ার খুব একটা প্রয়োজন পড়ত না। তবে অস্বীকার করা যাবে না, অনেকটাই মাদকতা ছড়িয়ে দিত আগা খান গোল্ড কাপ। অবশ্য বিদেশি দলের পাশাপাশি দেশীয় ক্লাবগুলো অংশ নেওয়ার কারণে এই টুর্নামেন্টও বেশ আকর্ষক হয়ে ওঠে। সে কারণে এই টুর্নামেন্টও ঘরোয়া ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। 

কিন্তু ১৯৭৮ সালে জনজীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এশীয় যুব ফুটবল। রঙধনু হয়ে রাঙিয়ে দেয় বাংলাদেশের ফুটবলের আকাশ। আন্তর্জাতিক ফুটবল বলতে এর আগে ঢাকার দর্শকেরা পরিচিত ছিলেন কোয়াড্রাঙ্গুলার টুর্নামেন্ট, আরসিডি কাপ এবং বাৎসরিক টুর্নামেন্ট আগা খান গোল্ডকাপ ফুটবলের সঙ্গে। এছাড়া প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে এসেছে কিছু বিদেশি ফুটবল দল। ১৯৫৫ সালে কোয়াড্রাঙ্গুলার টুর্নামেন্টে চারটি এবং ১৯৬৭ সালে আরসিডি কাপে তিনটি দেশের জাতীয় দল অংশ নেয়। আর ১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া আগা খান গোল্ডকাপে সাধারণত জাতীয় দল অংশ নিত না। তাতেও একবার একটি আসরে সর্বাধিক ১০টি বিদেশি দল অংশ নিয়েছে। 

সেদিক থেকেও নতুন এক ইতিহাস গড়ে এশীয় যুব ফুটবল। ১৯৭৮ সালের ৫ থেকে ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বসে এশিয়ান যুব ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ২০তম আসর এবং তৃতীয় বিশ্ব যুব ফুটবলের এশীয় জোনের বাছাইপর্বের খেলা। অনূর্ধ্ব-১৯ দল হলেও অংশ নেয় এশিয়ার সেরা ১৮টি দেশ- আফগানিস্তান, বাহরাইন, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, জাপান, জর্ডান, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত, মালয়েশিয়া, উত্তর ইয়েমেন, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ।

২০তম যুব এশিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের লোগো

১৯৫৯ সালে শুরু হওয়া এই যুব চ্যাম্পিয়নশিপ ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর আয়োজিত হয়েছে। এরপর এটি হয়ে যায় দ্বিবার্ষিক চ্যাম্পিয়নশিপ। ফুটবলের অন্যতম পাদপীঠ উপমহাদেশে এমন আয়োজন এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ১৯৭৫ সালে কুয়েতে এই চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে সর্বাধিক ১৯টি দেশ অংশ নিয়েছিল। ফরম্যাট বদলে যাওয়ায় এরপর এক চ্যাম্পিয়নশিপে একই ভেন্যুতে এতগুলো দেশ বাংলাদেশের পর আর কখনো একসঙ্গে অংশ নিতে পারেনি।  

ঢাকার মাঠের সর্ববৃহৎ এই ফুটবল ফিয়েস্তা আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ফিফা, এএফসি, কোকাকোলাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা বাজেটের এই চ্যাম্পিয়নশিপকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো দেশ। এর আগে বাংলাদেশে আর কোনো উপলক্ষে এতগুলো দেশ একত্রিত হয়নি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই আসর রোমাঞ্চিত করে সব বয়সের মানুষকে। 

এ টুর্নামেন্ট উপলক্ষে সংস্কার করা হয় ঢাকা স্টেডিয়াম। নির্মাণ করা হয় পূর্ব গ্যালারি। প্রথমবারের মতো ব্যবস্থা করা হয় মহিলা গ্যালারির। ঢেলে সাজানো হয় ভিআইপি গ্যালারিও। রাজধানীকে সাজানো হয় নতুন রূপে। ফেস্টুন, পোস্টার, কাট-আউট দৃষ্টি কেড়ে নেয়। প্রচারের ঢক্কানিনাদ পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত এলাকায়। বাংলাদেশ টেলিভিশন খেলাগুলো সম্প্রচার করে। রেডিও তো ছিলই। ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা হতো বিকেল ও সন্ধ্যায়। কিছুদিন আগেই স্থাপিত ফ্লাডলাইটের আলোয় অনুষ্ঠিত হয় আর্কষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ খেলাগুলো। 

টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই মৌসুমী টিকিট কেনার হিড়িক পড়ে যায়। মহিলাদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বলতে গেলে সেবারই প্রথম ফুটবলের প্রতি দুর্বার আকর্ষণে স্টেডিয়ামে ছুটে আসেন রমণীরা। টিকিটও সহজলভ্য ছিল না। ছিল কালোবাজারিদের রমরমা।

গ্যালারিতে নারী দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো

এই চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য বাংলাদেশ দলও বেশ ভালোই প্রস্তুতি নেয়। তিন মাস আগে থেকেই দলকে গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোচ আবদুর রহিম আর আবদুস সাদেককে। পরে ফিফার উদ্যোগে দলের প্রধান কোচ হিসেবে আসেন পশ্চিম জার্মানির ওয়ার্নার বেকেলহফট। বাংলাদেশের যে কোনো পর্যায়ের জাতীয় দলের প্রথম বিদেশি ফুটবল কোচ বেকেলহফট পরে বাংলাদেশের জাতীয় দলের কোচেরও দায়িত্ব পালন করেন। 

অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর বেকেলহফটের নির্বাচিত বাংলাদেশ দলটি ছিল এমন: সুহাস, মঈন, টুটুল, আবুল, স্বপন দাস, মুকুল, কাওসার আলী, আব্দুস সালাম, মো. বাদল, আশীষ ভদ্র, আসলাম, বাবলু, আনোয়ার, হাসান, হেলাল, সালাম মুর্শেদী, মহসিন (অধিনায়ক)। স্টান্ডবাই: হালিম, মজিদ, গাফ্ফার, মনি, পিন্টু। দলনেতা ছিলেন জিল্লুর রহমান, যুগ্ম ম্যানেজার নবী চৌধুরী ও এ কিউ জেড ইসলাম কিসলু এবং সহকারী প্রশিক্ষক আবদুর রহিম। 

খেলা হয়েছিল চারটি গ্রুপে। ‘এ’ গ্রুপ- ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, জর্ডান; ‘বি’ গ্রুপ- উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, জাপান, ভারত, শ্রীলঙ্কা; ‘সি’ গ্রুপ- কুয়েত, বাহরাইন, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সিঙ্গাপুর; ‘ডি’ গ্রুপ- দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, চীন, আফগানিস্তান।

বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ছিল সিঙ্গাপুরের সঙ্গে। স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের সামনে শুরুতে একটু খেই হারিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশের তরুণরা। গোলরক্ষক সুহাস বড়ুয়া ছিলেন বেশ নার্ভাস। রক্ষণভাগও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে পারেনি। আর এ সুযোগে দুই গোল দিয়ে দেন সিঙ্গাপুরের চতুর স্ট্রাইকার ডোনাং। তবে এরপরই বাংলাদেশ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে। আশীষ ভদ্র ও মহসিনের গোলে খেলায় সমতাও ফেরে। গোল করার সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে এই ম্যাচে বাংলাদেশ জিততেও পারত।

বাংলাদেশের একটি ম্যাচের দৃশ্য

পরের ম্যাচে উত্তর ইয়েমেনের সঙ্গে সুহাসের পরিবর্তে গোলকিপার হিসেবে নামানো হয় মঈনকে। তিনি হয়ে ওঠেন আস্থার প্রতীক। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধের ২৮ মিনিটে হাসানের গোলে জিতে যায় বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের যে কোনো পর্যায়েই এটি বাংলাদেশের প্রথম জয়। তবে সত্যিকার আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশ জাতীয় দল প্রথম জয় পায় পরের বছর। এশিয়ান কাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে চুন্নু, হালিম ও সালাহউদ্দিনের গোলে আফগানিস্তানকে হারায় ৩-২ গোলে।

কুয়েতের সঙ্গে পরের ম্যাচে বাংলাদেশের পুরো দলকেই কেমন যেন ছন্দহীন মনে হয়। বাংলাদেশ ২-০ গোলে হেরেও যায়। এই হার দর্শকদের ভীষণভাবে আশাহত করে। গুজব ছড়িয়ে পড়ে, এ হারের পেছনে কাজ করেছে কুয়েতের তেলের টাকা।

গ্রুপে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ ছিল বাহরাইনের সঙ্গে। এ ম্যাচটি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ফিফা রেফারি কিম জো ওনের খেলা পরিচালনা বেশ সমালোচিত হয়। প্রথমার্ধে বিতর্কিত পেনাল্টিতে বাহরাইন এগিয়ে গেলে গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। মাঠেও দুই দলের মধ্যে বেশ কবার ঝামেলা বেঁধে যায়। হয়তো প্রথম ভুলটি পুষিয়ে দিতেই রেফারি বাংলাদেশের অনুকূলেও একটি পেনাল্টি দেন। অধিনায়ক মহসিন তিনবারের চেষ্টায় খেলায় সমতা আনেন। বাহরাইনি গোলকিপার প্রথম দুবার মহসিনের শট ঠেকিয়ে দিলেও তিনি আগেই নড়ে গেছেন, এই অজুহাতে আবার শট নিতে বলেন রেফারি। এটা হাস্যকর এক ঘটনা হয়ে আছে। কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে বাংলাদেশকে এই ম্যাচে জিততেই হতো। ড্র করে বাহরাইন (৫ পয়েন্ট) কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায়। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠে কুয়েত (৭ পয়েন্ট)। ৪ পয়েন্ট নিয়ে বাদ পড়ে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ বিদায় নেওয়ার পরও এই টুর্নামেন্ট নিয়ে উন্মাদনা কমেনি। সব ম্যাচেই স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। খেলা দেখার জন্য ঢাকার বাইরে থেকেও ছুটে আসেন অসংখ্য দর্শক। স্টেডিয়ামে মহিলা দর্শকদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো।

কানায় কানায় পূর্ণ গ্যালারি বলতে যা বোঝায়, সেবারের যুব টুর্নামেন্টে ঢাকা স্টেডিয়াম ছিল ঠিক তা-ই

টুর্নামেন্টের কিছু ঘটনা এখনো অনেকের স্মৃতিপটে অম্লান হয়ে আছে। ভারতের বিপক্ষে ১-২ গোলে পিছিয়ে থাকার পর একদম শেষ মুহূর্তে খেলায় সমতা নিয়ে আসেন জাপানের অধিনায়ক মিরো হিগুটি। অমীমাংসিতভাবে খেলা শেষ হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন ভারতের গোলরক্ষক। তবে সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায় দলের কোচ মেওয়ালালের কান্না। এক সময়ের দুর্ধর্ষ এই সেন্টার ফরোয়ার্ড পঞ্চাশের দশকে ঢাকার মাঠে ভারতের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। 

ভালো খেলার পরও ইরানের বিদায় অনেককেই মর্মাহত করে। কুয়েতকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পরও বয়স-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কুয়েতের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানকে বিদায় করে দেওয়া হয়। 

টুর্নামেন্টের সেরা ম্যাচ বলতে হবে ইরাক-সৌদি আরব কোয়ার্টার ফাইনালটিকে। দুই আরব দেশের এ ম্যাচটি ছিল ছন্দময় ফুটবলের এক প্রদর্শনী। নির্ধারিত ৮০ মিনিট ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১০০ মিনিটের নাটকীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ইরাক ২-১ গোলে জয়ী হলেও এ ম্যাচে প্রকৃত অর্থে জিতেছে ফুটবল। সৌদি আরবের অধিনায়ক ডিফেন্ডার ইশা গাওয়ারি দারুণ খেলে দর্শকদের মন কেড়ে নেন।  

দুটি সেমিফাইনালই গড়ায় টাইব্রেকারে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দুই দেশের খেলায় ইরাক ৬-৫ গোলে কুয়েতকে এবং কোরীয় উপদ্বীপের দুই দেশের খেলায় দক্ষিণ কোরিয়া ৬-৫ গোলে উত্তর কোরিয়াকে হারায়। দুই কোরিয়ার ম্যাচে একটু বেশিই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ ছিল। রাজনৈতিক কারণে দুই দেশের মধ্যে যে রেষারেষি, তার প্রভাবে হার না মানার লড়াকু মনোভাব ফুটে ওঠে খেলোয়াড়দের শরীরী ভঙ্গিমায়। এটা যেন হয়ে ওঠে বিরোধপূর্ণ সীমান্ত 'পানমুনজম' দখলের অনমনীয় এক লড়াই। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় হেরে যায় উত্তর কোরিয়া। 

তৃতীয় নির্ধারণী ম্যাচে উত্তর কোরিয়া ও কুয়েত ১-১ গোলে ড্র করলে দুই দলকে যুগ্মভাবে তৃতীয় ঘোষণা করা হয়। 

ফাইনালে আগের বছরের চ্যাম্পিয়ন ইরাকের মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে খেলাটি বেশ উপভোগ্য হয়। খেলার নির্ধারিত ৮০ মিনিট ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকার পর অতিরিক্ত ২০ মিনিটেও কোনো গোল না হলে দুই দলকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। টসে জয়ী হয়ে প্রথম ছয় মাস 'আবদুর রহমান ট্রফি' নিজেদের দখলে রাখার সুযোগ পায় ইরাক।

যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ইরাক দল

এই চ্যাম্পিয়নশিপের তারকা ফুটবলার বলতে হবে ইরাকের হারিস মোহাম্মদকে। ক্ষিপ্র গতি, এবং শুটিং ও হেডিংয়ে সমান পারদর্শিতা দেখিয়ে  তিনি পরিণত হন টুর্নামেন্টের পোস্টার বয়ে। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার এই ইনসাইড ফরোয়ার্ড টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৭টি গোল করেন। মিডফিল্ড জেনারেল ছিলেন উত্তর কোরিয়ার অ্যান গিল ডং। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টুর্নামেন্টের একমাত্র হ্যাটট্রিকটিও করেন তিনি, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬ গোলও তাঁর। সৌদি আরবের স্টপার ব্যাক ইশা গাওয়ারি ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার খেলোয়াড়। ‘দ্য অ্যারাবিয়ান হর্স’ নামে পরিচিতি পাওয়া এ ফুটবলার যেভাবে রক্ষণভাগ আগলে রাখার পাশাপাশি আক্রমণ গড়ে তুলতেন, তা ছিল দেখার মতো। ইরাকের অধিনায়ক আদনান দারজুল ছিলেন রক্ষণভাগের অতন্দ্রপ্রহরী। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার ‘দ্য রক অব জিব্রাল্টার’ হেডে ছিলেন অসাধারণ। এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ার অধিনায়ক পার্ক হ্যাঙ সু, সৌদি আরবের দায়িশ মোহাম্মদ, কুয়েতের মিডফিল্ডার আবদুল্লাহ ব্লুসির খেলা নজর কাড়তে সক্ষম হয়। 

এশীয় যুব ফুটবলকে কেন্দ্র করে উন্মাদনা কত দূর পৌঁছেছিল, তার উদাহরণ হয়ে আছে ইরাকের সুদর্শন স্ট্রাইকার হারিস মোহাম্মদকে নিয়ে ব্যাপক ক্রেজ। তাঁকে জড়িয়ে ধরে গভীর আশ্লেষে চুমু খাচ্ছেন স্মার্ট এক তরুণী, এমন একটা ছবি ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক 'বিচিত্রা'য়। তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন দৃশ্যপটের কথা ভাবাই যায় না। এখনও কি যায়? 

এ ঘটনার রেশ সুদূর ইরাক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার প্রমাণ, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপ ফুটবলে অংশ নিতে আসে ইরাকের একটি ফুটবল দল। সে দলের ম্যানেজার মারুফ আহমেদ বড় আশা নিয়ে ঢাকা এসেছিলেন। ভেবেছিলেন, হারিস মোহাম্মদকে ঘিরে তরুণীরা যেভাবে খুল্লামখুল্লা হয়েছেন, তাঁদেরকে অনুরূপ সমাদর না করার তো কারণ নেই। কিন্তু সেই আবেগ-উচ্ছ্বাস কিছুই না দেখতে পেয়ে ভীষণভাবে হতাশ হন। চলে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর এ মর্মবেদনার কথা ব্যক্ত করে যান।

লক্ষ তরুণীর মনে ঝড় তোলা হারিস মোহাম্মদ

এশিয়ান যুব ফুটবল শুধু একটি প্রতিযোগিতা ছিল না। এটি ছিল একটি মিলনমেলা। তাছাড়া তখনও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানা-শোনার পরিধি ছিল খুবই সীমিত। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে সেই পরিসরটা অনেকটাই বিস্তৃত হয়। প্রসারিত করে দেয় মনের দিগন্তকে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মাঠের খেলা দেখে একটা দেশ সম্পর্কে কতটুকই আর জানা যায়? এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, খেলোয়াড়েরা একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। সঙ্গত কারণেই তাঁদের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় সেই ভূখণ্ডটি। আর কিছু না হোক, খেলোয়াড়দের দৈহিক অবয়ব, গড়ন, ত্বক, চোয়াল, নাক, কান, চুল, চোখের রং, উচ্চতা, ধর্ম, বর্ণ, বুদ্ধিমত্তা, ভাষা, ভঙ্গি, পোশাক, স্টাইল, আবেগ-উচ্ছ্বাস, রাগ-অনুরাগ, আচার-আচরণসহ জাতিগত কিছু বৈশিষ্ট্য তো খেলার মাঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠেই। দেখতে পাওয়া যায় দলগুলোর ভিন্ন মেজাজের ক্রীড়াশৈলী। এর বাইরেও তাঁদের নানাভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ হয়। পূর্ণাঙ্গ না হলেও তাঁদের এই বৈশিষ্ট্যসমূহ একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতিপটে আঁকা হয়ে যায়। সর্বোপরি একটি ফুটবল আসরকে কেন্দ্র করে এতগুলো দেশের উপস্থিতিতে যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়, তার অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক ও সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলা যায়, 

কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে
কত মানুষের ধারা
দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা। 
হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় 
দ্রাবিড় চীন শক-হুন-দল পাঠান মোগল 
এক দেহে হল লীন। 
পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে 
আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, 
যাবে না ফিরে...

নিঃসন্দেহে ঢাকার মাঠের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব এশীয় যুব ফুটবল আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। মিলিয়েছে৷ শিখিয়েছেও। এর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বহু দূর বিস্তৃত। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে ফুটবল দুনিয়াও চিনেছিল বাংলাদেশ নামের নবীন একটি দেশকে। মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশে আবার কি কখনো এমন ফুটবল উৎসবের আয়োজন করা সম্ভব হবে?

আরও পড়ুন.........
মোহাম্মদ আলী যখন বাংলাদেশের 
আকাশি-নীলের উত্থান
বক্সাররাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের পথ-প্রদর্শক!
কাজী সালাউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার
অশ্রু আর বেদনা নিয়ে শুরু ক্রীড়াঙ্গনের যাত্রা

 
শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×