ব্রায়ান লারার সঙ্গে এরপর অনেকবার দেখা হয়েছে। মাঠে, মাঠের বাইরে। ২০০৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে তো দুটি টেস্ট ম্যাচে ওর সঙ্গে টস করতেও নেমেছি। গত কিছুদিন মাঝেমধ্যে যখন ভারতে কমেন্ট্রি করতে যাই, নিয়মিতই দেখা হয়। ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ওই ম্যাচটা লারার মনে আছে কি না, লারাকে কখনো তা জিজ্ঞেস করা হয়নি। আমার তো মনে আছেই। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে আমার একমাত্র উইকেটটা কি আমি ভুলতে পারি! সেই উইকেটটা ব্রায়ান লারাকে বোল্ড করেই।

লারার উইকেট বড় বড় বোলাররাই মনে রাখে, আর আমি তো মনে রাখবই। আরও বেশি মনে আছে আমার একমাত্র উইকেট বলে, তার চেয়েও বেশি ম্যাচের অবস্থার কারণে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই সিরিজে লারা আগের দুই ম্যাচে রান পায়নি। আমার মনে আছে, এই ম্যাচে ওপেন করতে নামার সময় দর্শকরা আজেবাজে কিছু কথা বলেছিল ওকে। লারা শুধু একবার মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল ওদের দিকে। এরপর ও যা শুরু করল, তাতে মনে হয়, ওই রাগটাই আমাদের বোলারদের ওপর ঝেড়েছিল ও। দ্বিতীয় ওভারে স্লিপে মনে হয় একটা লাইফ পেয়েছিল, এরপর রীতিমতো তাণ্ডব শুরু করে দিল। বাঁহাতি পেসার মঞ্জু আগের দুই ম্যাচে লারাকে আউট করেছিল, শুরুর ঝড়টা গেল ওর ওপর দিয়েই। প্রথম তিন ওভারে মঞ্জু মনে হয় ৩০ রান দিয়েছিল। বাকিদের অবস্থা আরও খারাপ। যার বলে লাইফ পেয়েছিল, সেই সফিউদ্দিন বাবুর প্রথম ৩ ওভারে ৩২ রান, চাচার (খালেদ মাহমুদ সুজন) প্রথম ২ ওভারে ৩৮...আসলে বোলার কে, সে কী বল করছে, এতে সেদিন কিছুই আসে যাচ্ছিল না। লারা ইচ্ছামতো মারছিল। এর আগে আমি কাউকে দেখিনি পেস বোলারদের এভাবে সুইপ করতে। ২৬ বলে ৫০ করেছিল, ৪৫ বলে সেঞ্চুরি। ফিল্ডিং করতে করতে অসহায় চোখে তা দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।

১৯ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান যখন ২ উইকেটে ১৮২, হঠাৎই বুলবুল ভাই (অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল) আমাকে বললেন, ‘বল করতে পারবি?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই পারব।‘ আমার চিন্তাটা ছিল পরিষ্কার। রেগুলার বোলাররাই যে মার খাচ্ছে, আমি আর এর চেয়ে বেশি কী খাব? বরং লারাকে বোলিং করব, এই রোমাঞ্চটাই আমার মধ্যে বেশি কাজ করছিল। মার খেলে খাব। ওভারের চতুর্থ বলটা অফ স্টাম্পের বাইরে পড়েছিল। সেটিকে কাভারের ওপর দিয়ে মারতে গিয়ে লারার ইনসাইড এজ হয়ে গেল। বল এসে লাগল স্টাম্পে। আউট হওয়ার পর লারা যতটা অবাক হয়েছিল, আমি আরও বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। লারা ছাপার অযোগ্য কিছু গালি দিয়েছিল, তা আমার গায়েই লাগেনি। আমি তো তখন আনন্দে আত্মহারা।

লারার হতাশার কারণটা বুঝতে পারি। ও যেভাবে খেলছিল, তাতে আর কিছুক্ষণ থাকলে ওয়ানডেতে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটা সেদিনই হয়ে যেত। লারাকে আউট করার পর যা হলো, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা আমাকে খুব সমীহ করে খেলতে লাগল। ওরা হয়তো ভেবেছে, লারাকে আউট করে দিয়েছে, এ নিশ্চয়ই খুব ভালো বোলার। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে আমি বলই করেছি মোট ২৯.১ ওভার, পুরো ১০ ওভার করেছি ওই একটা ম্যাচেই। ১০ ওভারে ৩১ রান দিয়ে ১ উইকেট---আমি নিজেই তো অবাক হয়ে যাই, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৬ উইকেটে ৩১৪ রানের ইনিংসে এত কম রান দিয়েছিলাম কীভাবে!

এর পরে অনেকবারই দেখা হয়েছে দুজনের, ২০০৭ বিশ্বকাপের সুপার এইটের ম্যাচে যেমন টস করতে দেখা যাচ্ছে ব্রায়ান লারা ও হাবিবুল বাশারকে। ছবি: গেটি ইমেজেস

নিজের তো মনে আছেই, সাংবাদিকেরাও প্রায়ই আমাকে লারার উইকেটটির কথা মনে করিয়ে দেন। অফ স্পিনার হিসাবে খেলা শুরু করলেও ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে ঢোকার আগেই আমার ব্যাটসম্যান পরিচয়টা মুখ্য হয়ে যায়। আরও কয়েকটা ম্যাচে টুকটাক বোলিং করলেও আর কোনো উইকেট পাইনি। বোলিং করার সময় অবশ্যই উইকেট পেতে চেয়েছি। তবে এখন মনে হয়, আর কোনো উইকেট না পেয়ে ভালোই হয়েছে। হেঁজিপেজি কোনো ব্যাটসম্যানের উইকেট পেয়ে গেলে তো আর বলতে পারতাম না যে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে আমার একটাই উইকেট আর সেটি গ্রেট ব্রায়ান লারার।

একবার অবশ্য তা বলতে গিয়ে একটু অপ্রস্তুতই হতে হয়েছিল। ওই ম্যাচের কিছুদিন পর বাংলাদেশ বিমানের নেটে আমি আর পাকিস্তানের মনজুর আখতার বোলিং করছি। বোলিং নিয়েই খুনসুটি করে করতে ওকে বললাম, ‘তুমি কি জানো, আমি ব্রায়ান লারার উইকেট পেয়েছি?’

আমি ভাবলাম, ও নিশ্চয়ই প্রশংসাসূচক কিছু বলবে, অন্তত একটু সমীহজাগানো দৃষ্টি তো পাবই। আসলে কী হয়েছিল, জানেন? মনজুর আখতার বোলিং মার্কের দিকে যেতে যেতে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘উসকা ইতনা বুড়া ওয়াক্ত আ গিয়া?’