বিশ্বকাপের হাওয়া এখন জোরেশোরেই লাগছে গায়ে। আর সবার মতো দিন গুনছি আমিও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যতই ডালভাত হয়ে যাক, বিশ্বকাপ হলো বিশ্বকাপ। এর আলাদা একটা রোমাঞ্চ আছেই। তার ওপর সেই বিশ্বকাপ এবার বাড়ির উঠোনে!

সেই রোমাঞ্চের অনুভূতির মধ্যেও কখনো কখনো আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে বিষাদ। বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই মনে পড়ছে বব উলমারের কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠছে উলমারের হাসিমুখ আর আমার মন থেকে হাসি হারিয়ে যাচ্ছে। আমার জন্য এটাই প্রথম বিশ্বকাপ, যেটিতে উলমারের সঙ্গে দেখা হবে না। আগের চার বিশ্বকাপেই উলমারকে জড়িয়ে কিছু না কিছু স্মৃতি আছে। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর বিষম ডামাডোলে হয়তো সেসব চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু এখন যে বড় জ্বালাতন করছে স্মৃতি!

উলমারের সঙ্গে কবে-কোথায় প্রথম দেখা? যতদূর মনে পড়ে, করাচির ডিফেন্স স্টেডিয়ামে। সেটি ১৯৯৬ বিশ্বকাপ। উলমার তখন দক্ষিণ আফ্রিকা দলের কোচ। জীবনে প্রথম পাকিস্তানে গেছি। শহর থেকে অনেক দূরের ওই ডিফেন্স স্টেডিয়াম খুঁজে পেতে জীবন বেরিয়ে যাওয়ার দশা। উদ্দেশ্য, সেই বিশ্বকাপের হট ফেবারিট দক্ষিণ আফ্রিকার প্র্যাকটিস দেখা। গিয়ে দেখি, প্র্যাকটিসের চেয়ে মজাই বেশি হচ্ছে। সেটির বিচিত্র সব উপায়ও বের করে নিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটাররা। ফাস্ট বোলাররা অগ্রণী ভূমিকায়। নেটে বোলিং করছেন আর পেছন থেকে টান দিয়ে একে অন্যের শর্টস নামিয়ে দিচ্ছেন। বোলিংয়ের মতো এ কাজেও নেতা অ্যালান ডোনাল্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা তখনো আমার কাছে দূর আকাশের তারা। সেই ‘তারা’দের এমন ছেলেমানুষিতে বড় মজা পেয়েছিলাম। বব উলমার মজা পাচ্ছিলেন আমার চেয়েও বেশি। তাঁর আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনিও এই খেলায় নেমে পড়তে চান। নেহাত কোচ বলে পারছেন না!

কোচিংয়ের নতুন সব দিগন্ত আবিষ্কারের নেশায় আবিষ্ট ছিলেন তিনি। ছবি: গেটি ইমেজেস

প্র্যাকটিস শেষ হয় হয়, এমন সময়ে ভীরু পায়ে তাঁর কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। তাঁর হাস্যমুখ আর অনেক দিনের পরিচিতের মতো ব্যবহার মুহূর্তেই ঘুচিয়ে দিল জড়তা। সেদিন টুকটাক কথাবার্তাই হয়েছিল। ইন্টারভিউ করতে চেয়েছিলাম। হোটেলে ফেরার সময় হয়ে গেছে বলে পরে কোনো একসময় তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। সেই বিশ্বকাপে আর সময়-সুযোগ মেলেনি।

কাঙ্ক্ষিত সেই ইন্টারভিউটা হলো পরের বিশ্বকাপে। লিডসের হেডিংলিতে পরদিন অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। আমি যখন মাঠে পৌঁছেছি, দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রেনিং প্রায় শেষ। মাঠে আছেন শুধু চারজন। এক কোণে জন্টি রোডস আর হার্শেল গিবস ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করছেন। আর মাঠের মাঝখানে সেই বিশ্বকাপের সেনসেশন ল্যান্স ক্লুজনারকে নিয়ে আলাদা ব্যাটিং প্র্যাকটিস করাচ্ছেন বব উলমার। অভিনব প্র্যাকটিস। উলমার কোমর-উচ্চতায় বল ছুড়ছেন আর ক্লুজনার ব্যাটটাকে গদা বানিয়ে সেগুলোকে উড়িয়ে ফেলছেন মাঠের বাইরে। সেই বিশ্বকাপে ক্লুজনারের ১২২-এর বেশি স্ট্রাইক রেট তো এমনি এমনি হয়নি।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ক্লুজনারের ঝড় তোলার পেছনে উলমারের ভূমিকা স্বচক্ষেই দেখা

ক্লুজনার-পর্ব শেষ করে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, ইন্টারভিউয়ের কথা বলতেই রাজি। মাঠে দাঁড়িয়েই অনেকক্ষণ কথা বললেন। ক্রিকেটের সঙ্গে এত দিন জড়িয়ে থাকার পরও খেলাটা নিয়ে এমন আবেগভরে কথা বলতে আমি খুব কম লোককেই দেখেছি। আরেকটা জিনিসও মনে খুব দাগ কেটেছিল। ক্রিকেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীর বোধ। আবার যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে দখিন দুয়ারও খোলা। সেই বিশ্বকাপেই তো হানসি ক্রনিয়েকে ইয়ারপিস কানে নামিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথাও। একটা একাডেমি করতে চান, যেখানে নিজের সব আইডিয়ার মেলবন্ধন ঘটানো যাবে। নতুন নতুন চিন্তার খেলোয়াড়েরা সব আসবেন ওখানে। রিভার্স সুইপ, ওভার দ্য টপ মারার নতুন কৌশল, ইন সুইং-আউট সুইং নিয়ে নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট হবে।

২০০৩ বিশ্বকাপে উলমারের সঙ্গে এক দিনই দেখা হয়েছিল। ডারবানে কানাডার বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচ। কিংসমিডের কাছাকাছি যেতেই দেখি উলমার। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আজ কিন্তু আমি কানাডার পক্ষে।’ সেটিই স্বাভাবিক। সহযোগী সদস্য তিন দেশকে ওই বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্ব ছিল উলমারের ওপর। সেই দায়িত্ব যে খুব ভালোভাবে পালন করেছেন, সেটির প্রমাণ তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পেয়েছিলাম!

২০০৭ বিশ্বকাপে উলমারের সঙ্গে এক ঝলকই দেখা হয়েছিল। মন্টিগো বেতে বিশ্বকাপ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগের দিন। জ্যামাইকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ম্যাচ কাভার করে বাংলাদেশ দলের পিছু পিছু আমি চলে গেলাম ত্রিনিদাদে। সেখানে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওই হৃদয় উথালপাথাল করে দেওয়া জয়ের পরই জানলাম, এ দিন আপসেট এই একটাই হয়নি। জ্যামাইকাতে পাকিস্তানকে হারিয়ে দিয়েছে আয়ারল্যান্ড।

উলমারের জন্য নীরবতা। ছবি: গেটি ইমেজেস

পোর্ট অব স্পেনে ছিলাম পাহাড়ের ওপর এক হোটেলে। হোটেলের লাগোয়া একটা খোলা চাতালমতো। চেয়ার-টেবিল ছিল। বেশির ভাগ সময় ওখানে বসেই লিখতাম। পরদিন সকালেও বাংলাদেশের বীরত্বগাথা লিখছি। গায়ে ফুরফুরে হাওয়া লাগছে। বইছে মনেও। হঠাৎই বাংলাদেশের এক সাংবাদিক এসে ভয়াবহ দুঃসংবাদটা দিল। বব উলমার নাকি মারা গেছেন!

প্রথমে একটু বিরক্তই হয়েছিলাম, এটা আবার কেমন ফাজলামি! ফাজলামি যে নয়, তা তো ইন্টারনেটে ঢুকতেই পরিষ্কার হয়ে গেল। দুদিন আগে যেখানে বসে মানজারুল ইসলাম রানার মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলাম, উলমারের চলে যাওয়ার খবরটাও পেলাম সেখানে বসেই। রানার চিরবিদায় কাঁদিয়েছিল আর হতভম্ব করে দিয়েছিল উলমারেরটা।

আরেকটি বিশ্বকাপ আসছে। উলমার থাকবেন না লিখেছি। আবার কেন যেন মনে হয়, এই বিশ্বকাপেও উলমার থাকবেন। এমন ক্রিকেটপাগল লোক যেখানেই থাকুন না কেন, বিশ্বকাপ ঠিকই দেখবেন। আমরা তাঁকে দেখব না, এই যা! 

আরও পড়ুন: মৃত্যুতেও ক্রিকেটে রইলেন উলমার
                    বব উলমারের একান্ত সাক্ষাৎকার