মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার যখন ফুটবল

গৌরবময় সেই দিনের সুবর্ণজয়ন্তী

দুলাল মাহমুদ

২৫ জুলাই ২০২১

মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার যখন ফুটবল

ফুটবল খেলার মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য অবদান রাখা যায়, এমনটা কে ভাবতে পেরেছিলেন? শুধু ভাবনা নয়, নানান প্রতিকূলতার মধ্যে সেই ভাবনাকে রূপায়িত করে নতুন এক ইতিহাস গড়েছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। খেলার মাঠে স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় সংগীত বেজেছিল, উত্তোলন করা হয়েছিল জাতীয় পতাকা। দেখতে দেখতে সেই দিনটির আজ ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে গৌরবময় সেই দিনটাকে নতুন করে দেখা।

বুকের মধ্যে যখন যদি স্বাধীনতার বোধ জেগে উঠে, তখন কোনো প্রতিবন্ধকতাই বোধ করি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জাগৃত হয় অদম্য ইচ্ছেশক্তি। আসলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই যে কোনো অবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অন্তরের তাগিদ অনুভব করেন। যে যে অবস্থায় থাকুন না কেন, যার যতটুকু শক্তি আছে, তা নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান। আর দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জীবন বাজি রাখার ক্ষেত্রে কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করার বেপরোয়া মনোভাব গড়ে উঠাটা অস্বাভাবিক নয়। পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে জীবন যাপন করার মতো মর্মপীড়া আর কিছুতেই হতে পারে না। তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যুগে যুগে কত কত সংগ্রাম করতে হয়েছে। লাঞ্ছনা সইতে হয়েছে। জীবন দিতে হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাস তো যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস। তার কত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে পাওয়া যায় ইতিহাসের নতুন নতুন পাঠ। যা গবেষকদের কাছে পরম এক বিস্ময়।

ফুটবল খেলা নিয়ে অনেক কাণ্ডকীর্তি ঘটেছে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছে। এমনকি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র লড়াই হয়েছে। ১৯৬৯ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে হন্ডুরাস-এল সালভাদর ম্যাচ যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে পাওয়া গেছে স্বাধীনতার অমলিন আনন্দ, এমন দৃষ্টান্ত তো অগণিত। কিন্তু ফুটবল খেলা যে মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, এমনটা কেই-বা ভাবতে পেরেছিলেন? একটি দেশের মুক্তির জন্য ফুটবল দল গঠন করার আখ্যান পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।

আর নজিরবিহীন এই ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ফুটবল দল গড়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ম্যাচ খেলেছে স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের ফুটবলাররা। অবশ্য এই দল গঠন মোটেও সহজ ছিল না। এমন একটা পরিকল্পনা ছিল বেশ অভিনব। মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ে কতটা জুড়ে ছিল, এই সিদ্ধান্ত তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন। নানাভাবে তার প্রতিফলন ঘটে। ফুটবল দল গড়ার বিষয়টি সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। তাছাড়া ভিন্ন একটা দেশে শরণার্থী হিসেবে ঠাঁই নিয়ে ফুটবলের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াটা সহজ সমীকরণ ছিল না। সাইদুর রহমান প্যাটেল, আলী ইমামদের উদ্যোগে গড়া ফুটবল দলটি পৃথিবীর বুকে স্থাপন করে অভূতপূর্ব নজির। যুগান্তকারী এই ঘটনা ইতিহাসে যোগ করে নতুন মাত্রা।

স্বপ্নের দোলায় দুলতে থাকলেও একটা জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন পর্যন্ত ছিল অনিশ্চিত। তাঁদের ভূখণ্ড শত্রু অধিকৃত। সরকার গঠনের গণতান্ত্রিক রায় পেলেও দেশ হিসেবে কোনও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নেই। উদ্বাস্তু জীবনে সাহায্য-সহযোগিতা-সহানুভূতি মিললেও আইনগতভাবে কোনও অধিকার পাওয়ার সুযোগ ছিল না। জীবন বাঁচাতে অনেক ক্রীড়াবিদও ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছেন। কলকাতার স্বীকৃত কোনও ক্লাব বা প্রতিষ্ঠানের চাওয়া সত্ত্বেও তাদের হয়ে খেলতে পারেননি। অন্য একটি দেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে আইনগত অনেক মারপ্যাঁচ রয়ে যায়। 

এমন অবস্থায় বাংলাদেশ নামে আলাদাভাবে কোনও খেলায় অংশ নেওয়াটা ছিল আরও বেশি জটিলতাপূর্ণ। সেই জটিলতার জট খুলতে আশ্রয় নিতে হয়েছে নানান কৌশলের। এ বিষয়ে ভারত সরকার এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংস্থা বাড়িয়ে দেয় সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতার হাত। পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে ফুটবলাররা মাঠে নামতে পেরেছেন। 'সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না'- এই নীতি অবলম্বন করে খেলতে হয়েছে। তাতে আসল কাজটি ঠিকই হয়েছে। 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত ও তহবিল গঠন করা সম্ভব হয়েছে৷ খেলার মাঠকে অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার অভূতপূর্ব এই দৃষ্টান্ত সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে।   

ফুটবল দলের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই। ভারতের নদীয়ার কৃষ্ণনগরে স্বাগতিক দলের সঙ্গে খেলতে নামে 'বাংলাদেশ একাদশ', পরবর্তীকালে যা মুখে মুখে জনপ্রিয় হয়ে উঠে 'স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল' নামে। খেলা শুরুর আগে আইনগত বিষয়টি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ দল চাইছিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন আর জাতীয় সংগীত বাজানো হোক। কিন্তু সরকারিভাবে সেটা সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশ তখন স্বীকৃত দেশ নয়। তাদের পতাকা ও জাতীয় সংগীতও অনুমোদিত নয়। সঙ্গত কারণেই সরকারের প্রতিনিধি নদীয়ার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট দীপক কুমার ঘোষ তাঁর অপারগতা প্রকাশ করেন। 

বাংলাদেশ দলও তাদের আর্জি থেকে পিছপা হতে রাজি নয়। জাতীয় পতাকাই যদি উত্তোলন করা না যায়, জাতীয় সংগীত যদি বাজানো না যায়, তাহলে আর খেলে কী লাভ? মোটামুটি একটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে যুক্তি আর পাল্টা যুক্তির পর অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই সম্মতি জ্ঞাপন করেন মুন্সিগঞ্জের সন্তান জেলা শাসক। তাঁর বুকেও তো আবেগের কমতি ছিল না। উড়ানো হয় জাতীয় পতাকা। বাজানো হয় জাতীয় সংগীত। কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার এম. হোসেন আলী ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ এবং বহির্বিশ্বে প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর ব্যাপক পরিসরে এই গৌরব অর্জন করেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম। মো. জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই ম্যাচটি ২-২ গোলে অমীমাংসিত থাকে। 

পরের দিন ২৬ জুলাই কলকাতার দৈনিক 'যুগান্তর' পত্রিকায় কৃষ্ণনগর থেকে নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টটি ছিল এমন, 'বাংলাদেশের সাহায্যার্থে বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির উদ্যোগে এখানকার স্টেডিয়ামে যে প্রদর্শনী ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয় তাতে বাংলাদেশ ফুটবল একাদশ ও নদীয়া জেলা একাদশ প্রত্যেকে দুটি করে গোল করায় খেলাটি (২-২ গোলে) অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছে। 

বাংলাদেশের মুক্তি ফৌজের সাহায্যার্থে আয়োজিত এই খেলায় নদীয়া জেলা চতুর্থ মিনিটে তুষার গুণের সহযোগিতায় গোল করে এগিয়ে যায় (১-০)। বিশ্রামান্তের পাঁচ মিনিট পরে একটি গোল পরিশোধ করেন (১-১)। দু মিনিট পরে তুষার গুণ হেড করে দ্বিতীয় গোল করেন (২-১)। কিছু পরে বাংলাদেশের এনায়েৎ দ্বিতীয় গোল শোধ দেন (২-২)। এর পর বাংলাদেশ আর একটি গোল দিয়েছিল কিন্তু অফ সাইডের জন্যে গোলটি নাকচ হয়ে যায়। 

এই খেলা দেখার জন্যে ন্যূনপক্ষে দশ সহস্র দর্শকের সমাবেশ হয়েছিল। দর্শকরা দু দলের সমর্থকদের সমানভাবেই সমর্থন করেছেন। এ দিনের খেলা দেখার জন্যে মাঠে তিল ধারণের স্থান না থাকায় খেলা সুরু হবার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই কাছাকাছি গাছের চূড়ায় বিভিন্ন পাঁচিলে এবং বিভিন্ন বাড়ীর ছাদের ওপর বিশেষ দর্শক সমাবেশ হয়। খেলা সুরু হবার সময় আকাশ এ দিন মেঘমলিন ছিল। 

এই খেলা উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ তাজুদ্দীন (তাজউদ্দীন আহমদ) ও সেনানায়ক মেজর ওসমানি (মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী) ও মহম্মদ হোসেন আলি (পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশকারী কূটনীতিক) শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী পাঠিয়েছেন।

বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে গোলরক্ষক নরুল নবী (খোন্দকার মো নূরুন্নবী) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। তিনি ইরাণ ও তুর্কীতে অধিনায়ক পিন্টু রাশিয়াতে এবং আগর (সাগর) নেপাল ও অন্যান্য রাজ্যের বিরুদ্ধে খেলে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। 

সেক্রেটারী-জেনারেল লুৎফর রহমন (রহমান) এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা এতদিন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং তাদের ন্যায্য দাবী থেকে বঞ্চিত ছিল। এখন তাঁরা সকলেই সমবেত। খেলাধূলার ক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক কর্তব্য পালনে ইতঃস্তত করবে না। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতির সঙ্গে শুভেচ্ছা ও পারস্পরিক বুঝাপড়ার বিনিময়ে তাঁরা সব সময়ে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত থাকবেন। 

বাংলাদেশ ফুটবল একাদশঃ নরুল নবী; মোমিন, হাবুল, বিমল ও পিন্টু; আইনুল ও খোকন; কেকোবাদ, আলি ইমাম, আমিনুল ইসলাম ও প্রতাপ হাজরা।

নদীয়া একাদশঃ গোবিন্দ গুহ ঠাকুরতা; বিভূতি কুণ্ডু, শিবেন রুদ্র, শান্তনা রায় ও সুশান্ত সরকার; অসিত ঘোষ ও অজিত সাহা; অমল সরকার; তুষার গুণ, কৃষ্ণ মিত্র ও রমেশ মণ্ডল।' 

'যুগান্তর' পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় তালিকা নিয়ে একাধিক অসঙ্গতি আছে। বাংলাদেশ দলে 'হাবুল' নামে কেউ ছিলেন না। কায়কোবাদের নাম 'কেকোবাদ' ছাপা হয়। দ্বিতীয়ার্ধে প্রতাপের পরিবর্তে খেলতে নেমে বাংলাদেশের প্রথম গোল করেন শাহজাহান। নিরাপত্তার কারণে তিনি খেলেন 'সাগর' নামে। গোলরক্ষক নূরুন্নবীর পরিবর্তে দ্বিতীয়ার্ধে খেলেন মোমিন। সালাউদ্দিন খেলেছেন 'তূর্য হাজরা' নামে। এছাড়া প্রকাশিত খেলোয়াড় তালিকা থেকে এনায়েত, লালু, তসলিম, নওশেরের নাম বাদ পড়েছে। আমিনুল ইসলাম পরিচিত ছিলেন 'সুরুজ' নামে।

কৃষ্ণনগর থেকে শুরু হয় যে নতুন অভিযাত্রা, তা অপ্রতিহতভাবে এগিয়ে যায়। পরের ম্যাচ পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী কলকাতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু আর প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কার্যালয় যেখানে অবস্থিত ছিল। প্রতিপক্ষ মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব। কিন্তু বিধিবিধানের কারণে তাদেরকে খেলতে হয় বিখ্যাত ফুটবলার ফরিদপুরের সন্তান গোষ্ঠ পালের নামে, 'গোষ্ঠ পাল একাদশ' হয়ে। এই ম্যাচটিকে ঘিরে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা হয়। 'গোষ্ঠ পাল একাদশ'-এর নেতৃত্ব দেন ১৯৬২ সালে এশিয়ান গেমসে স্বর্ণজয়ী ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক কিশোরগঞ্জের সন্তান চুনী গোস্বামী। বছর তিনেক আগে ফুটবল খেলা থেকে অবসর নিলেও তখনও তাঁর জনপ্রিয়তার কোনও কমতি ছিল না। 'বাংলা' দলের হয়ে তিনি পুরোদমে ক্রিকেট খেলতেন। মাঠে উপস্থিত ছিলেন গোষ্ঠ পালসহ দুই বাংলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। মোহনবাগান ক্লাবের কর্দমাক্ত মাঠে অনুষ্ঠিত খেলায় 'গোষ্ঠ পাল একাদশ' ৪-২ গোলে জয়ী হয়। পত্র-পত্রিকায় এ ম্যাচের ভালো কভারেজ দেওয়া হয়। মূলত এই ম্যাচের মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশ ফুটবল দলের কথা জানতে পারেন সবাই। 

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দল ভারতের মাটিতে ১৭টি ম্যাচ খেলেছে। খেলায় হারজিত মুখ্য বিষয় ছিল না। খেলা হয়েছে সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির পরিবেশে। তবে বিভিন্ন রাজ্যে ম্যাচ খেলার সময় মধুর অভিজ্ঞতা যেমন হয়েছে, তেমনিভাবে হয়েছে তিক্ততাও। ফিল্ম সিটি হিসেবে খ্যাত বোম্বাইয়ে (মুম্বাই) স্বাগতিকদের সঙ্গে ম্যাচে বলিউড তারকাদের রীতিমতো ঢল নামে। সুপারস্টার দীলিপ কুমার, রাজেশ খান্না, রাজকুমার, বিশ্বজিৎ, শর্মিলী ঠাকুর, সায়রা বানু, মমতাজ, লীনা চন্দ্রভারকর থেকে শুরু করে কমেডিয়ান আগাসহ অনেকেই উপস্থিত হন। এ ম্যাচে সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলেছেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মনসুর আলী খান পতৌদি। অন্যদিকে, বিহারে বাংলাদেশ ফুটবল দলকে পাকিস্তান সমর্থক মারমুখী জনতার আক্রোশের মধ্যে পড়তে হয়। এমনকি ধর্ম পরিচয় নিয়েও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এছাড়া নিজেদের দলের মধ্যেও যথেষ্ট দলাদলি ছিল। এ কারণে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে। যাহোক, বিভিন্ন ম্যাচ খেলে অর্জিত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা দেওয়া হয়। অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এই দলটির নেপাল, জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরেরও পরিকল্পনা ছিল। 

বাংলাদেশ ফুটবল দল পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন এক নজির স্থাপন করে। ফুটবল খেলার মাধ্যমেও যে স্বাধীনতার সপক্ষে কার্যকর ও সদর্থক ভূমিকা রাখা যায়, এর আগে এমনটা কখনও দৃশ্যমান হয়নি। অভূতপূর্ব এক দৃষ্টান্ত গড়লেও এই ফুটবল দলটি কোনও স্বীকৃতি পায়নি। ইতিহাস সৃষ্টিকারী ২৫ জুলাই তারিখেরও যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তারপরও স্বাধীনতা এবং 'স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল'-এর প্রথম ম্যাচ খেলার সুবর্ণজয়ন্তীতে ঠিকই ফিরে আসছে গৌরবোজ্জ্বল সেই দিনের স্মৃতি। যা বাংলাদেশ নামের দেশটিকে চিরকাল গর্বিত করবে।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×