অলিম্পিকে এভাবে আর কত দিন?

মেজর চাকলাদার (অব.)

২৭ জুলাই ২০২১

অলিম্পিকে এভাবে আর কত দিন?

সেই ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিক থেকে শুরু, এরপর ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ কেবল অংশ নেওয়ার জন্যই অংশ নিয়ে যাচ্ছে অলিম্পিকে। জাতীয় হকি দলের সাবেক অধিনায়ক মনে করছেন, যথেষ্ট হয়েছে, এভাবে আর চলতে পারে না। এই লেখায় অলিম্পিকে ব্যর্থতার কারণগুলো তো বলেছেনই, বাতলে দিয়েছেন তা সমাধানের উপায়ও।

এবারের টোকিও অলিম্পিক করেনার কারণে এক জেলবন্দি অবস্থাতে চলছে। তবুও ভালো, চলছে। উপমহাদেশের সাতটি দেশ-- ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ আর বাংলাদেশের মাঝে একমাত্র ভারতই পদক পাওয়ার কিছুটা আশা করছে। বিশ্বের প্রায় আট শ কোটি জনসংখ্যার ভেতর আমাদের উপমহাদেশে বসবাস প্রায় দুই শত কোটি মানুষের। টোকিও অলিম্পিকের ৩৩৯টি মেডেলের মধ্যে আমাদের উপমহাদেশের কপালে কোনো সোনার মেডেল পাবার সম্ভাবনা গৌণ।

জাপানের ১৩ বছরের মেয়ে স্কেট বোর্ডিং-এ সোনা জিতেছেন, আবার কুয়েতের ৫৮ বছর বয়সী শ্যুটার আবদুল্লাহ আল-রাশিদি পুরুষ স্কিট শ্যুটিংয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছেন। অর্থাৎ, বয়স ক্রীড়াক্ষেত্রে কোনো বাধা নয় ।

উপমহাদেশ থেকে নিজের দেশে তাকাই, ১৯৭১ থেকে ২০২১... পঞ্চাশ বছর ক্রীড়াঙ্গন ঘুরপাক খাচ্ছে একই বৃত্তে। কিছু চিহ্নিত ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অলিম্পিক দেখে অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরছেন। দেশে বড় পদে আসীন থাকাতে পরিবার-পরিজনসহ অলিম্পিকের শহরে যাচ্ছেন এবং খেলাতে মেডেলের গন্ধ না থাকলেও মার্কেটিংটা চোস্ত হচ্ছেন...এটাতে আমরা রীতিমতো রেকর্ডধারী ।

শুধু এবার কেন, আগামীতেও এই ছবিটাই জ্বলজ্বল করবে। বড় মাছ ধরতে যেমন অল্প একটু আধার লাগে, তেমনি কয়েকজন খেলোয়াড় পাঠিয়ে তাদের ভাড়িয়েই কর্মকর্তা সেজে দলকে দল বিদেশ ঘোরা-- এই চক্র চলছে আর চলবে।

বিদেশ গিয়ে কি জ্ঞান আনা হচ্ছে? কোনো খেলায় কোনো একাডেমি কি হয়েছে? সব রকম সুযোগ পাওয়া বিকেএসপিকে এবার হকি টুর্নামেন্টে ‘পা পিছলে আলুর দম’ হতে দেখেছি। মানে আমরা যেখানেই যাই, সেখানেই ‘গা-ছাড়া’ ভাব আর এটাতে আমরা অভ্যস্ত। পরিকল্পনা গ্রহণ করতে আমরা অক্ষম। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের জ্ঞানকে অবজ্ঞা করে চললে যা ফল পাবার কথা, দেশের ক্রীড়ারাজ্যে তা-ই হচ্ছে।

টোকিও অলিম্পিকে আশা জাগিয়েই গিয়েছিলেন রোমান সানা-দিয়া সিদ্দিকী। তবে হয়নি এবারও। ছবি: ওয়ার্ল্ড আর্চারি

যে দেশ যত সাবলীল, সে দেশ ক্রীড়া ক্ষেত্রেও সফল। আমাদের ক্রীড়া ব্যর্থতার অন্যতম কারণ, আমাদের ফেডারেশনগুলোতে চলছে নৈরাজ্য। কর্মকর্তাদের বেশির ভাগেরই খেলোয়াড়ি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ফেডারেশনগুলোতে 'উপদেষ্টা' পদ থাকলে সেখানে অভিজ্ঞদের নিয়ে সুষ্ঠুভাবে খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা বিদেশি কোচ এনে তার সব কথাকে ‘বাইবেল’ মনে করে টিম তার উপর ছেড়ে দিই। নতুন কোচ এলে তখন আবার তার ‘বাইবেল’ মানতে শুরু করি। হকিতে দেখেছি, নুরুল ইসলাম, কাওসার আলি , হারুন, রাজুসহ দেশীয় ভাল কোচ থাকার পরও বিদেশি কোচ আনা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যয় হওয়া ছাড়া বিদেশি কোচদের থেকে আহামরি কোনো ভাল ফল পাওয়া যায় নাই।

একটা পরামর্শই দেব। বিশ্বমানের হকি তারকা আব্দুস সাদেকের সাথে ৪/৫ জন দেশীয় কোচের প্যানেল তৈরি করে হকি দল তাঁদের হাতে ছেড়ে দিন, ভালো ফল আসবেই। প্রতিটি ফেডারেশনে এরকম উদ্যোগ নিন; এরপর শুধু দেখবেন, দেশ ক্রীড়াক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়ায় কি না।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও ক্রিকেট বাদে আর কোনো খেলা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে দম্ভ করে দাঁড়াতে পারেনি। আর গুরুত্ব সহকারে ক্রিকেট খেলেও তো মাত্র ১০/১২টা দেশ। এভাবে আর চলতে পারে না। চাওয়া থাকবে, সব খেলার একাডেমি গড়ে তুলে অল্প বয়স থেকে খেলোয়াড় গড়ে তোলা হোক। এরপর আমরাও সফল ক্রীড়া ভবিষ্যত গড়তে পারব।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×