বাংলাদেশের কোচ হওয়ার পর জেমি সিডন্সের প্রথম সাক্ষাৎকার

‘আমাদের সেরা খেলোয়াড়ের অ্যাভারেজ ২০ আর আমরা ম্যাচ জেতার আশা করি!’

উৎপল শুভ্র

২৪ এপ্রিল ২০২১

‘আমাদের সেরা খেলোয়াড়ের অ্যাভারেজ ২০ আর আমরা ম্যাচ জেতার আশা করি!’

জেমি সিডন্স

মাত্রই বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নিয়েছেন জেমি সিডন্স। যাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হলো ২০০৭ সালে বাংলাদেশ দলের নিউজিল্যান্ড ট্যুরে। অকল্যান্ডের ক্রাউন প্লাজা হোটেলে প্রথম ইন্টারভিউ করতে গিয়েই চিনে ফেলেছিলাম মানুষটাকে। কূটনীতির কোনো ধারই না ধেরে মনে যা আছে বলে ফেলেন। পরের চার বছরেও যে চরিত্র একটুও বদলাতে দেখিনি।

প্রথম প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০০৭। প্রথম আলো।

উৎপল শুভ্র: আপনি নিজেই সেদিন বললেন, আপনার শেখার সময় চলছে। কোচিং নয়; বাংলাদেশ দল, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সম্পর্কে শেখা। সেটির কী অবস্থা?

জেমি সিডন্স: ভালো। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা কিসে ভালো আর কিসে ভালো নয়, এটি আমি মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। ওরা যাতে ভালো নয়, তা নিয়ে কাজ করাটাই এখন আসল ব্যাপার। যেন ওরা খেলোয়াড় হিসেবে আরও ভালো হতে পারে, যা বাংলাদেশকে আরও ভালো দলে পরিণত করবে।

শুভ্র: বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই দল বা খেলোয়াড়দের সম্পর্কে নিশ্চয়ই আপনার একটা ধারণা ছিল। হাতে-কলমে কাজ করতে গিয়ে সেই ধারণার কতটা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে? আগে ভাবেননি, এমন কিছুও কি দেখেছেন?

সিডন্স: না না, খেলোয়াড়দের সম্পর্কে আমি কোনো পূর্বধারণা নিয়ে আসিনি। দেশটা নিয়ে বেশ পড়াশোনা করেছি। তবে খেলোয়াড়দের সম্পর্কে অন্য কারও মতামত আমি শুনিইনি। ওটা আমি নিজে দেখেই বুঝতে চেয়েছি। ওরা কী পছন্দ করে, কী করে না... সেটি হাতে-কলমে জানাই ভালো। ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হতে গেলে কী লাগে, অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা জানি। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে ওদের আরও ভালো খেলোয়াড়ে পরিণত করতে কী করতে হবে, তা মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। তবে এতে কিছুটা সময় তো লাগবেই।

শুভ্র: বাংলাদেশের কোচ হওয়ার আগে বাংলাদেশের কোনো ম্যাচ কি পুরোটা দেখেছেন?

সিডন্স: না।

শুভ্র: কী বলেন, কার্ডিফের ম্যাচটাও দেখেননি! তখন তো আপনি অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গেই ছিলেন।

সিডন্স: হ্যাঁ, দেখেছি। তবে মনে রাখিনি। ওই ম্যাচের একটা স্মৃতিই আমার মনে আছে, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস মাতাল হয়ে মাঠে এসেছিল।

শুভ্র: বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়কে কি আলাদাভাবে চিনতেন? ওই ছেলেটা খুব ভালো... কারও সম্পর্কে এ জাতীয় কোনো ধারণা কি ছিল?

সিডন্স: আমি শুনেছি, আশরাফুল নাকি ভালো। কিন্তু মোহাম্মদের টেস্ট অ্যাভারেজ বিশের ঘরে, ওয়ানডে অ্যাভারেজও তা-ই। অস্ট্রেলিয়ার পুরো ব্যাটিং অর্ডারের অ্যাভারেজ চল্লিশ-পঞ্চাশের ঘরে। এটাই তো বলে দিচ্ছে দু দলের মধ্যে বিশাল পার্থক্যটা। আমাদের সেরা খেলোয়াড়ের অ্যাভারেজ হলো ২০! আর আমরা ম্যাচ জেতার আশা করি। আমাদের বোধ হয় একটু রিয়েলিটি চেক করা প্রয়োজন। তা করার পর কাজ হবে আশরাফুলের স্কিল নিয়ে কাজ করা, যাতে ওর অ্যাভারেজটা ৪৫ হয়। আরও তিন-চারজন ব্যাটসম্যানের অ্যাভারেজ ৪৫ হতে হবে। এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ এবং তা নিতেই আমি এসেছি।

`আমি শুনেছি, আশরাফুল নাকি ভালো। কিন্তু মোহাম্মদের টেস্ট অ্যাভারেজ বিশের ঘরে, ওয়ানডে অ্যাভারেজও তা-ই।`

শুভ্র: প্রত্যেক কোচেরই তো নিজস্ব কোচিং-দর্শন আছে। আপনার কোচিং-দর্শনটা কি ব্যাখ্যা করবেন?

সিডন্স: আমার কোচিং-দর্শনের প্রথম কথা হলো, খেলোয়াড়দের জানা। এরপর খেলাটা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা, যেটি আমার আছে বলেই বিশ্বাস। আরেকটা দিক হলো, খেলাটা শেখানো। খেলোয়াড়দের খেলায় উন্নতি করতে ডে টু ডে কাজ করা। এই দলকে কোচিং করানোর আর কোনো পথ আছে বলে আমি মনে করি না। এখানে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং—খেলার মৌলিক স্কিলগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। এটা রাতারাতি হওয়ার জিনিস নয়, এতে সময় লাগে।

শুভ্র: অন্য খেলার তুলনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কোচের ধারণাটা তো নতুন। ক্রিকেটে আসলে কোচ কতটুকু কী করতে পারে? আমরা যতটা গুরুত্ব দিই, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলের কোচ কি আসলেই ততটা গুরুত্বপূর্ণ?

সিডন্স: আমি মনে করি, অস্ট্রেলিয়া দলের জন্য যতটা না, বাংলাদেশের জন্য কোচ তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ারও কোচ আছে, তবে কাজটা অন্য রকম। আর এখানে খেলোয়াড়দের মৌলিক স্কিল শেখাতে হয়। আমাদের খেলোয়াড়েরা এখনো আন্তর্জাতিক মানের নয়। আমরা মাঝেমধ্যে জিতি, তবে বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারি না। যদি কেউ অন্য রকম মনে করে, তাহলে সে নিজের মনকে চোখ ঠাওরাচ্ছে। এটাকে দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসে আমাদের খেলোয়াড়দের মৌলিক স্কিল শেখাতে হচ্ছে। ওদের জন্য এটি খুব কঠিন। বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট দলের কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে, সংবাদমাধ্যমও তা-ই। আমি মনে করি, বাংলাদেশ তাদের চেয়ে অনেক ভালো দলের বিপক্ষে অনেক ম্যাচ জিতবে—এই প্রত্যাশাটা একদমই বাস্তবোচিত নয়।

বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কোচ জেমি সিডন্স

শুভ্র: বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বা বাংলাদেশ দলের মূল সমস্যার জায়গা বলে কিছু কি চিহ্নিত করতে পেরেছেন?

সিডন্স: মূল সমস্যা হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাবের অভাব। এটি ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে পাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট তা দিতে পারছে না। যেমন ধরুন, সেখানে বাউন্সি উইকেটে ফাস্ট বোলিং খেলার অভিজ্ঞতাই ওদের হয় না। অথচ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডেতেই দেখা যাবে, ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির চারজন বোলারকে খেলতে হচ্ছে। এখন আমাকে বলুন, দেশে কোনো ব্যাটসম্যান ১৪০ কিলোমিটার গতির বল না খেললে এখানে এসে কীভাবে খেলবে? 

শুভ্র: সব জেনেশুনে এই দায়িত্ব নেওয়াটা কি তাহলে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ?

সিডন্স: এটা বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ এবং সে কারণেই আমি দায়িত্বটা নিয়েছি। অস্ট্রেলিয়া দলের কোচ হিসেবে কাজ করার মধ্যে আমি কোনো চ্যালেঞ্জ খুঁজে পাইনি। বাংলাদেশকে দেখে আমার মনে হয়েছে, এখানেই একজন কোচের আসল কাজ। তরুণ খেলোয়াড়দের স্কিল শেখানো এবং খেলাটির স্কিল শেখানোর কাজটা আমি ভালো পারি বলেই আমার ধারণা।

তামিম ইকবালের সঙ্গে জেমি সিডন্স। ২০১১ সালে মিরপুরে। ব্যাটিং কোচ হিসেবে তামিম এখনো সিডন্সকে সেরা বলে মনে করেন। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: খেলোয়াড়দের ভালোভাবে জানার কাজটা শেষ হওয়ার পর আপনি কি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়ও অংশ নিতে চাইবেন?

সিডন্স: একটা কথা বলতে পারি, যেসব খেলোয়াড়ের সামর্থ্য আছে বলে মনে করব, তাদের কথা আমি জোর দিয়েই বলব। এই মুহূর্তে তা বলতে পারছি না, কারণ এখন আমার জন্য কোনো খেলোয়াড়কে নির্বাচন করাই সম্ভব নয়। এখানে যে ১৫ জন আছে, এর বাইরে কোনো খেলোয়াড়কে তো আমি চিনিই না। এখন তাই আমার নির্বাচক না হওয়াটাই ভালো। তবে যখনই আমার খেলোয়াড়দের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হবে, যাদের দেখে মনে হবে ওরা আমাদের ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারবে, আমি তাদের দলে চাইব। আমাদের বিশেষ প্রতিভা খুঁজে বের করতে হবে। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে তা অনেকই আছে। তাদের সবাইকে যদি আগামী দু-তিন বছরে আমাদের কর্মসূচির মধ্যে নিয়ে আসা যায়, তা হলেই আমরা এই বিশ্বের রিকি পন্টিংদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা বলতে পারব।

শুভ্র: এবার আপনার খেলোয়াড়ি জীবন নিয়ে কিছু কথা বলি। আপনি টেস্ট ক্রিকেট খেলেননি, এটা তো বোধ হয় আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি। এই হতাশা নিশ্চয়ই বাকি জীবনই সঙ্গী হয়ে থাকার মতো!

সিডন্স: আমার সঙ্গে যত সাংবাদিক কথা বলেছে, তারা সবাই আমাকে এ প্রশ্নটা করেছেই। সত্যি বলছি, আমার হতাশা-টতাশা কিচ্ছু নেই। আমি সব সময়ই পরের দিনটির দিকে ইতিবাচকভাবে তাকিয়েছি। এখনো তা-ই তাকাচ্ছি। এখন পেছনের দিকে তাকানোটা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে খেলার সুযোগ পেলে কী করতে পারতাম, তা জানতে পারলে অবশ্যই ভালো হতো। তবে এ নিয়ে আমি মুহূর্তের জন্যও অনুতাপ করিনি। ভিক্টোরিয়া ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলাটা খুব এনজয় করেছি। অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে কোচ হিসেবে কাজ করার সময়টাও দারুণ কেটেছে। এখন যা করছি, সেটি আরও দারুণ লাগছে।

মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে। ২০১০ সালে মিরপুরে। ছবি: এএফপি

শুভ্র: একটু বয়স-টয়স হয়ে গেলে এমন দার্শনিক ভাব আসে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে হাজার হাজার রান করার পরও টেস্ট খেলার সুযোগ না পেয়ে আপনার মন খারাপ হয়নি, দয়া করে এটা বিশ্বাস করতে বলবেন না!

সিডন্স: সত্যি বলছি, আমাকে নেওয়া হবে কি হবে না, তা চিন্তা না করে আমি শুধু রান আরও রান করে যেতে চেয়েছি। ওটাই ছিল আমার মজা। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে আরও কিছু ম্যাচ খেলতে পারলে দারুণ হতো, কিন্তু আমার চেয়ে অনেক ভালো খেলোয়াড় যে ছিল। গ্রেট সব খেলোয়াড়।

শুভ্র: আপনি তা হলে ভুল সময়ে জন্মেছেন।

সিডন্স: হয়তো তা-ই। অন্য সময় হলে হয়তো আমি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে আরও কিছু ম্যাচ খেলতাম। কিন্তু আমার সামনে যারা ছিল, ওদের সবার টেস্ট-ওয়ানডেতে ৪৫-৫০ অ্যাভারেজ। গ্রেট গ্রেট প্লেয়ারস।

শুভ্র: শেন ওয়ার্ন তো তাঁর দেখা সেরা ৫০ জন ক্রিকেটারের মধ্যে আপনাকে রেখেছেন। এই ৫০ জনের মধ্যে শুধু আপনিই টেস্ট ক্রিকেট খেলেননি।

সিডন্স: এটা খুব ইন্টারেস্টিং সিলেকশন। কারণ আমি সেরা ১৫০ জন ক্রিকেটারের মধ্যেও থাকব কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমি ওর লেখাটা কেটে রাখতে ভুলে গেছি, কেউ যদি তা দেয়, তা হলে দারুণ হবে। একদিন ওর সঙ্গে দেখা করে ধন্যবাদ দিতে হবে।

শুভ্র: ওয়ার্নের সঙ্গে কি আপনার খুব খাতির?

সিডন্স: হ্যাঁ, আমি ওকে পছন্দ করি। ও এমন লোক, যার সঙ্গে আমি সব সময়ই আড্ডা দিতে চাইব। রিয়েল ক্যারেক্টার অব দ্য গেম। হি ইজ আ স্পেশাল পারসন, (চোখ টিপে) অ্যান্ড গুড জাজ অব ক্রিকেটার!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×