‘আমি নিজেকে অলরাউন্ডার ভাবি না’

উৎপল শুভ্র

১৮ মে ২০২১

‘আমি নিজেকে অলরাউন্ডার ভাবি না’

বোলিংয়ে বাংলাদেশের মূল ভরসা হয়ে ছিলেন পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই। এক সময় তাঁর ব্যাটিংও ছিল ভরসা করার মতোই। ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে মাশরাফির ব্যাটিং বীরত্বের পর ভারতীয় দলে এমন একজন বোলিং অলরাউন্ডার নেই বলে আক্ষেপ পর্যন্ত করেছিলেন তখনকার ভারতীয় অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়। মাশরাফি কী ভাবছেন, তা জানতে তাঁকেই ধরেছিলেন উৎপল শুভ্র। ইনজুরি নিয়ে বারংবার প্রশ্নের মুখে পড়া, ক্যারিয়ার-শেষে নিজেকে কোথায় দেখতে চান--মাশরাফি দিয়েছিলেন এ সব প্রশ্নের উত্তরও।

প্রথম প্রকাশ: ২৭ মে ২০০৭। প্রথম আলো।

উৎপল শুভ্র: চট্টগ্রাম টেস্টে ৭৯ রানের ইনিংসটির পর সবাই তো আপনাকে অলরাউন্ডার বানিয়ে দিয়েছে। তা শুধুই বোলার থেকে অলরাউন্ডার হওয়ার অনুভূতিটা কেমন?

মাশরাফি বিন মুর্তজা: কিসের অলরাউন্ডার? আমি নিজেকে অলরাউন্ডার বলতে চাই না। আমার মতে অলরাউন্ডার সে-ই, যে ধারাবাহিকভাবে রান করবে। আমি এখন এ নিয়ে ভাবতেই চাই না। বোলার হিসেবেই এখনো আমার অনেক কিছু শেখার বাকি। বোলিংয়ে আমি এখনো এমন কোনো পারফর্ম করিনি যে, এখন ব্যাটিংয়ের জন্য বাড়তি সময় দেব। ধারাবাহিকভাবে রান করার জন্য ব্যাটিংয়ে যে মনোযোগটা দেওয়া প্রয়োজন, আমি এখনো তা দিতে পারি না। ব্যাটিংয়ে আমি যতটুকু পারি, চেষ্টা করি। তবে সেটি আমাকে অলরাউন্ডার বলার মতো নয়।

শুভ্র: অলরাউন্ডার বলা হলেই এমন আপত্তি কি আপনার বন্ধু ইরফান পাঠানের কথা ভেবে? অলরাউন্ডার হতে গিয়ে বোলার ইরফান পাঠান তো হারিয়েই গেল।

মাশরাফি: না না, ইরফানের কথা ভেবে নয়। আমি যেটা বুঝি, আমি টিমে এসেছি বোলার হিসেবে, সবাই আমার কাছ থেকে বোলিংটাই বেশি আশা করে, এ কারণেই তা নিয়েই বেশি ভাবতে চাই। আমি নিজেও বোলিংটা বেশি এনজয় করি। ব্যাটিংটাও করি না, তা নয়। আমি ছোটবেলা থেকেই ওপরে ব্যাট করেছি। এখনো নড়াইলে খেলার সময় দেখা গেল, আমি ওপেন করে বসে থাকলাম (হাসি)।

শাহাদাতের সঙ্গে ৭৭ রানের জুটি গড়েই চট্টগ্রাম টেস্টে বাঁচিয়েছেন বাংলাদেশকে। ছবি: এএফপি

শুভ্র: ব্যাটিংয়ে বেশি মনোযোগী হয়েই কি বোলার ইরফান পাঠানের এমন পরিণতি?

মাশরাফি: হতে পারে। কেউ হয়তো ব্যাটিংটা ইরফান পাঠানের মাথায় বেশি ঢুকিয়ে দিয়েছে। তবে আমাকে যে যা-ই বলুক, আমি আমার জায়গায় অটল। আমি বোলিংয়ে আরও উন্নতি করতে চাই। ব্যাটিংয়ে আমি এখন নেটে যতটা সময় দিচ্ছি, আশা করি এটা দিলেই আমি আরও ভালো করতে পারব।

শুভ্র: নিজের ব্যাটিং-সামর্থ্য সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

মাশরাফি: আমি এটা বুঝি যে, আমার ক্ষমতা আছে। সেটি টেস্ট সেঞ্চুরি করার মতো। এটি বলা যত সহজ, করা ততটা নয়। তবে চট্টগ্রাম টেস্টেই যে দিনটা গেছে, ও রকম দিনে আমি পারব। রাজীব (শাহাদাত) থাকলে হয়তো সেদিনই পারতাম।

শুভ্র: চট্টগ্রাম টেস্টের পর রাহুল দ্রাবিড়ের কথা শুনে তো মনে হলো, আপনার মতো একজন খেলোয়াড়কে দলে পেলে বর্তে যান তিনি।

মাশরাফি: এ ধরনের কথা শুনলে খুব ভালো লাগে। বড় খেলোয়াড়দের এমন কমপ্লিমেন্ট আমার জন্য আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা। ভবিষ্যতেও বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে এমন খেলতে চাই, যাতে ওরাও এমন বলে।

ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কার নিতে এসে রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে। ছবি: এএফপি

শুভ্র: টেস্ট ম্যাচে তো এই প্রথম ম্যান অব দ্য ম্যাচ। অনুভূতিটা কেমন?

মাশরাফি: এর আগে আমি ওয়ানডেতে ছয়বার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছি। টুয়েন্টি-টুয়েন্টিতেও হয়েছি একবার। এই সবগুলো মিলিয়ে যে আনন্দ, টেস্টে একবার হওয়ার আনন্দই তার চেয়ে বেশি। কারণ আমার কাছে টেস্ট ম্যাচ সবচেয়ে বড় খেলা। ক্রিকেটে এর চেয়ে বড় কিছু হয় না। এমন ভাবি বলেই এই ম্যান অব দ্য ম্যাচটা আলাদা।

শুভ্র: একটা কথা অনেক দিনই আপনাকে জিজ্ঞেস করব ভাবছি। ভারতীয় ব্যাটিং সম্পর্কে আপনাকে সব সময়ই খুব শ্রদ্ধাশীল দেখেছি। ঘটনাটা কী?

মাশরাফি: তাহলে বলেই ফেলি, আমি ছোটবেলা থেকেই ইন্ডিয়া টিমের সাপোর্টার। বাংলাদেশ খেলা শুরু করার আগে বাংলাদেশের সবাই তো হয় ইন্ডিয়া নয় পাকিস্তানের সাপোর্টার ছিল। আমি ইন্ডিয়াকে সাপোর্ট করতাম। তবে ইন্ডিয়ার ব্যাটিং নিয়ে শুধু আমি একাই উচ্ছ্বসিত নই, বিশ্বের সবাই, যারা ক্রিকেট দেখে তারা সবাই বলবে ইন্ডিয়ার ব্যাটিং অর্ডার কেমন। অস্ট্রেলিয়া হয়তো সব মিলিয়ে অন্য রকম, তবে আলাদাভাবে চিন্তা করলে ভারতের মতো আর কোনো দলে এমন ব্যাটসম্যান নেই।

শুভ্র: তাহলে অনুমান করছি, আপনার কাছে আদর্শ ব্যাটসম্যানের প্রতিকৃতি শচীন টেন্ডুলকার। তা-ই যদি হয়, ব্রায়ান লারা কেন নয়, সেটাও বলতে হবে।

মাশরাফি: আমি টেন্ডুলকারের ভক্ত। শুধু ভারতের সমর্থক বলে এ কথা বলছি না। টেন্ডুলকার-লারা দুজনই এত বড় ব্যাটসম্যান যে, তাঁদের আলাদা করা কঠিন। তবে আমার কাছে শুধু ক্রিকেট খেললাম আর রান করলাম, ব্যাপারটা এমন না। ক্রিকেটটা এনজয় করার ব্যাপার আছে। লারা যদি শচীনের মতো তা করতে পারত, হয়তো ২০ হাজার রান করত। যদি ওর মনটা ঠিক থাকত, এত সব সমস্যার মধ্যে না জড়িয়ে শুধু ক্রিকেটই খেলব, তা হলে হয়তো অন্য রকম হতো। কিন্তু একটা মানুষ যে ডিসিপ্লিন্ড থেকেছে, কষ্ট করেছে, ক্রিকেটকে সাধনা হিসেবে নিয়েছে, তার রান একটু কম থাকলেও তাকে এগিয়ে রাখা উচিত। এ জন্যই আমার মনে হয় শচীনই বেস্ট।

তিনি শচীনের বড় গুণমুগ্ধ, উইকেট পেয়ে বাড়তি উল্লাস সে কারণেই। ছবিটি অবশ্য ২০০৭ নয়, ২০০৪ সিরিজের। ছবি: এএফপি

শুভ্র: আপনি তো সব সময়ই খুব প্রাণচঞ্চল। বিয়ের পর কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

মাশরাফি: আমি আগের মতোই আছি। বন্ধুদের পেলে এখনো ওই রকমই হয়ে যাই। নড়াইলে গেলে এখনো আগের মতো। ঢাকায় আমার লাইফটা একটু চেঞ্জ হয়েছে। নড়াইলে কোনো চেঞ্জ নেই। বন্ধুবান্ধব, হইচই, নদীর কূলে বসে আড্ডা। চিত্রা নদীতে স্নান।

শুভ্র: সে কি! এখনো এত ছেলেমানুষি! বিয়ের পর না মানুষ একটু অন্য রকম হয়ে যায়।

মাশরাফি: (হাসি) হ্যাঁ, নিজেকে একটু ভারী লাগে।

শুভ্র: আপনার সঙ্গে কেউ কথা বলতে গেলে ঘুরেফিরে ইনজুরির প্রসঙ্গ আসতে বাধ্য। সব সময় এ নিয়ে কথা বলতে বিরক্ত লাগে না?

মাশরাফি: না, বিরক্ত লাগে না। তবে এটা ঠিক, যে যে রকম বোঝে, আমাকে অ্যাডভাইস দেয়। তুই এটা করিস, ওটা করিস। অনেকে যখন না বুঝে বলে, তখন একটু বিরক্ত লাগে। আমার ইনজুরি নিয়ে অনেক বাজে কথাও ছড়িয়েছে। অনেকে বলে, আমি একবার গাছ থেকে পড়ে গিয়ে ইনজ্যুরড হয়েছি।

শুভ্র: এটা তো অনেক আগের কথা। আমরাও এমন শুনেছি।

মাশরাফি: না, এটা ঠিক নয়। আমি যেসব গাছে উঠি, তা থেকে পড়লে মরে যাব। আমি ও ধরনের গাছে উঠিনি, যেখান থেকে পড়লে শুধু পা ভাঙবে না। আমি ইনজ্যুরড হয়েছিলাম স্কিপিং করতে গিয়ে। তবে আমি ভুল যেটা করেছি, তা হলো ইনজ্যুরড হয়েও আমি বোলিং প্র্যাকটিস করেছি। আসলে তখন মাত্র জাতীয় দলে ঢুকেছি। হাঁটুতে যে লিগামেন্ট বলে কিছু আছে, সে ধারণাও ছিল না। হ্যামস্ট্রিং কী, জানতাম না। বিকেলে বোলিং করতে গিয়ে হাঁটুটা একটু সরে গেছে। পরের দিন আবার বোলিং করেছি। সমস্যা হয়েছিল এ কারণেই। গাছ থেকে পড়ে নয়।

ইনজুরির সঙ্গে ঘরবসতি। ২০০৩, ইংল্যান্ড সিরিজ। ছবি: এএফপি

শুভ্র: এত রকম ইনজুরিতে পড়ার পর কোথাও একটু ব্যথা লাগলেই কি এখন মনে হয়, এই রে, আবার বুঝি...।

মাশরাফি: ম্যাচের আগে কোথাও ব্যথা হলে আমি খুব অস্থির হয়ে যাই। শুধু মনে হয়, হয়তো পারব না। তবে মাঠে নামলে সব ভুলে যাই।

শুভ্র: এত কিছুর পরও আপনি যে এখনো খুব ইতিবাচক আছেন, এতে কি অন্য কারও অবদান আছে?

মাশরাফি: আমার বন্ধুদের। আমি একটা কথা সব সময় বলি, একজন মানুষের জীবনে বন্ধু সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। আমি যখন ইনজ্যুরড ছিলাম, আমার ৩০ জন বন্ধু সব কাজ-টাজ ফেলে সারাক্ষণ আমার রুমে বসে থাকত। ওরা আমাকে কোলে করে নিয়ে গিয়ে গোসল করিয়েছে। বিকেলে কোলে করে নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে আমাকে পাটি-বালিশে শুইয়ে গল্প করেছে। কখনো বুঝতে দেয়নি আমি ক্রিকেটের বাইরে। অনেক দিন বাইরে থাকলে অনেকে ভেঙে পড়ে। বন্ধুদের সাহায্য না পেলে আমি হয়তো ব্যাক না-ও করতে পারতাম। আমার বন্ধুদের অনেকেই খুব গরিব। কিন্তু ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্কে এসব কোনো বিবেচনাই নয়।

বিয়ের আসরে মাশরাফি। যদিও বিয়ের আগে-পরের মাশরাফির পার্থক্য নেই কোনো, এমনই বলেছিলেন তিনি।

শুভ্র: এই যে ক্যারিয়ারের প্রায় শুরু থেকেই আপনি বাংলাদেশের এক নম্বর পেস বোলার। এখন ব্যাটিংয়েও আপনার কাছ থেকে রান চায় সবাই। এই প্রত্যাশার চাপটা সমস্যা করে না?

মাশরাফি: আমার একটাই সুবিধা, খেলার সময় আমার কিছুই মনে থাকে না। কে কী বলেছিল, কী আশা করেছিল, কিছুই না। আমি শুধু প্রতিটি বল নিয়ে ভাবি। তবে প্রত্যাশার চাপ আছে। সেটি বেশি হয়ে গেলে ওপরওয়ালার কাছে ছেড়ে দিইআল্লাহ আছেন, যা হওয়ার হবে। আমি চাই, প্রতিটি ম্যাচেই কিছু না কিছু পারফর্ম করার চেষ্টা করি। আমি চাই ক্রিকেট ছাড়ার সময় যেন শুনতে না হয়, কোনো রকমে খেলে গেছে। এ রকম অবস্থা হওয়ার আগে নিজেই সরে যাব। আমার কাছে মানুষের প্রত্যাশা আছে, আমার নিজের কাছে নিজের প্রত্যাশাও কম নয়।

শুভ্র: চাপ কমানোর জন্য কিছু করেন? যোগ ব্যায়াম-ট্যায়াম?

মাশরাফি: আমি কিছুই করি না। আলাদা কিছুই না। আগের তুলনায় একটাই পার্থক্য, ফিজিও-ট্রেনার যা বলে, এখন তা পুরোপুরি মেনে চলি। মাঠের বাইরে ক্রিকেট নিয়ে ভাবিই না। অনেকে সিরিজের ১৫ দিন আগে হয়তো প্ল্যান করে এভাবে খেলব, ওভাবে খেলব। এমন করতে গিয়ে আমার আরও খারাপ হয়েছে। আমি আগে থেকে প্ল্যান করে খেলতে পারি না। মাঠে নেমে অবস্থা বুঝে খেলি।

শুভ্র: লক্ষ্য-টক্ষ্য কিছু ঠিক করেছেন?

মাশরাফি: আগে এসব একদমই ভাবতাম না। এখন মনে হয় ক্রিকেট যখন খেলছি, একটা লক্ষ্য থাকা উচিত। টেস্টে ২০০ উইকেট পেতে চাই, ওয়ানডেতে ২৫০।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×