কুমার সাঙ্গাকারা

শুধুই একজন ক্রিকেটার নন

উৎপল শুভ্র

২৯ জুলাই ২০২১

শুধুই একজন ক্রিকেটার নন

কুমার সাঙ্গাকারা

চিন্তায়-ভাবনায়-বাগ্মিতায় অনেক আগে থেকেই সাঙ্গাকারার পরিচয় শুধুই একজন ক্রিকেটারে সীমাবদ্ধ নেই। তবে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলার পর মাঠেই বিদায়ী অনুষ্ঠানে দেশের রাষ্ট্রপতি কোনো ক্রিকেটারকে রাষ্ট্রদূত হওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন, এটা একটু অভিনবই বটে। এই লেখা কুমার সাঙ্গাকারাকে দেওয়া বিদায়ী অর্ঘ্য।

বিদায়ী উপহার হিসেবে যা যা পেলেন, তাতে ক্যান্ডিতে সাঙ্গাকারাদের সুরম্য ওই বাংলো টাইপ বাড়িটার একটা শোকেস ভরে যাওয়ার কথা! স্মরণিকার মিছিলে সুনীল গাভাস্কারের উপহারটা খুব মজার। ক্রিকেটার ও মানুষ কুমার সাঙ্গাকারাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসার পর তাঁর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। ‘সাবেক ক্রিকেটারদের ক্লাব’-এর সদস্যপদ!

শ্রীলঙ্কান মহানায়কের বিদায়ী মঞ্চে গাভাস্কার-রানাতুঙ্গার মতো সাবেক ক্রিকেটাররা তো ছিলেনই, দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীও না এসে পারেননি। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা সাঙ্গাকারাকে পাশে নিয়ে সিনহালা ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। সাঙ্গাকারার মুখের হাসিটাই বলে দিচ্ছিল, ব্যতিক্রমী কিছুই বলছেন। যেটি পরিষ্কার হলো বিদায়ী অনুষ্ঠানের শ্রীলঙ্কান উপস্থাপকের অনুবাদে। কুমার সাঙ্গাকারাকে যুক্তরাজ্যে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের দূত হয়ে আছেন অনেক বছরই। কাল কলম্বোর পি সারাভানামুত্তু স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর শেষ দিনেই ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে আর বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে গেলেন সাঙ্গাকারা, যা একটুও বিস্মিত করল না। চিন্তায়-ভাবনায়-বাগ্মিতায় অনেক আগে থেকেই তো সাঙ্গাকারার পরিচয় শুধুই একজন ক্রিকেটারে সীমাবদ্ধ নেই।

শেষবারের মতো ব্যাট করতে নামার সময় কুমার সাঙ্গাকারার সংবর্ধনা। ছবি: এএফপি

যেটির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে আছে ২০১১ সালে লর্ডসে এমসিসির আমন্ত্রণে ‘কলিন কাউড্রে বক্তৃতা’। শ্রীলঙ্কান জনমানসে ক্রিকেটের সুগভীর প্রভাবের অসাধারণ ব্যাখ্যার সঙ্গে যাতে উঠে এসেছিল দ্বীপদেশটির ক্রিকেটে রাজনীতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির অকপট চিত্র। ক্রিকেট-বিশ্বে হইচই ফেলে দেওয়া ওই বক্তৃতা মনে করিয়ে দিয়েছিল সি এল আর জেমসের সেই অমর উক্তিকে, ‘হোয়াট ডু দে নো অব ক্রিকেট হু অনলি ক্রিকেট নো?’ অকালপ্রয়াত বিখ্যাত ক্রিকেট লেখক পিটার রোবাক যেটিকে বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতা।’

সাঙ্গাকারার ওই বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু বিস্মিত হইনি। অনেক আগেই যে তাঁর ওই আলোকিত দিকটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়েছে। ২০০৮ এশিয়া কাপে করাচিতে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সেমিনার। বিষয়: এশিয়ান ক্রিকেটের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। মূল বক্তা কুমার সাঙ্গাকারা।

 আলোচক প্যানেলে সাবেক পাকিস্তান অধিনায়ক আসিফ ইকবাল ও পাকিস্তান বোর্ডের সে সময়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শাফকাত নাগমির সঙ্গে ছিলাম আমিও। মঞ্চে বসে সাঙ্গাকারার বক্তব্য শুনতে শুনতে আমরা পরস্পরের সঙ্গে অনুচ্চ স্বরে কথা বলছিলাম। মূলত সাঙ্গাকারার চিন্তাভাবনা-উপস্থাপনা নিয়ে মুগ্ধতা মিশ্রিত বিস্ময়। 

পরদিন ম্যাচ, শ্রীলঙ্কা দলের অনুশীলন প্র্যাকটিস ছিল সকালে। সেই প্র্যাকটিস থেকে হোটেলে ফিরে সরাসরি অনুষ্ঠান মঞ্চে। পোশাক বদলানোরও সময় পাননি। পরনে প্র্যাকটিসের ট্র্যাকস্যুটই। আগের দিন ডে-নাইট ম্যাচ খেলে হোটেলে ফিরতে ফিরতেই অনেক রাত হয়ে গেছে। শাওয়ার-টাওয়ার সেরে লিখতে বসেছেন। প্রায় ভোর পর্যন্ত জেগে যে বক্তৃতাটা তৈরি করেছেন, তা শুনে আমাদের তিনজনের মতো বিস্ময়ের একটা ঢেউ বয়ে গেল সবার মধ্যেই। একজন ক্রিকেটার এমন করে ভাবতে পারেন! বিশেষ করে এখনো খেলছেন, এমন ক্রিকেটার। যাদের বেশির ভাগের চিন্তাভাবনাই খুব সংকীর্ণ হয়ে থাকার পরিচয়ই পেয়েছি অনেকবার।

 বিদায় জানালেন ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররাও

এটা তো সাঙ্গাকারার বাড়তি গুণ। যেটি তাঁর মূল পরিচয়, সেই ক্রিকেটার হিসেবে কেমন ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে পরিসংখ্যানেই। টেস্টে তাঁর চেয়ে বেশি রান শুধু চারজনের। এটাই অনেক কিছু বলে। তবে সাঙ্গাকারা-মাহাত্ম্য আরও বেশি করে বলে তাঁর ব্যাটিং গড়—৫৭.৪০। সমকালীন গ্রেট শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, রিকি পন্টিং, জ্যাক ক্যালিসরাও যেখানে বেশ পিছিয়ে (সবচেয়ে কাছাকাছি ক্যালিসের গড় ৫৫.৩৭)।

ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে। তখনো তাঁর ব্যাটে রানের ফল্গুধারা, শুধুই ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে শুরু করার পর যা রীতিমতো প্লাবন! কিপিংয়ের ঝামেলামুক্ত ৮৬ টেস্টে তাঁর ব্যাটিং গড় ৬৬.৭৮। টেস্টে কমপক্ষে এক হাজার রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একজনই শুধু সাঙ্গাকারার চেয়ে এগিয়ে। তাঁর নামটি আপনি জানেন বলেই ধারণা করি।

স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড় কোনো মনুষ্যের পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব নয়, এটা ক্রিকেটের চিরন্তন সত্যিগুলোর মধ্যে এক নম্বরে থাকে। ব্র্যাডম্যানের আরেকটি যে কীর্তিকেও অস্পর্শনীয় বলে মানা হয়, সেটি কিন্তু সাঙ্গাকারা প্রায় ছুঁয়েই ফেলেছিলেন। টেস্টে ব্র্যাডম্যানের ১২টি ডাবল সেঞ্চুরি, সাঙ্গাকারার ১১টি। এত কাছে এসেও না পারার আক্ষেপ মনে জাগলেই সাঙ্গাকারার রুডি কোয়ের্তজেনের কথা মনে পড়তে বাধ্য। এই দক্ষিণ আফ্রিকান আম্পায়ারের একটি ভুলই যে ‘বাঁচিয়ে’ দিয়েছে স্যার ডনের ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডকে। ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোবার্টে সাঙ্গাকারার কাঁধে ও হেলমেটে লেগে বল স্লিপে ‘ক্যাচ’ হওয়ার পর আঙুল তুলে দিয়েছিলেন কোয়ের্তজেন। সিদ্ধান্তটা ভুল হয়েছে জানতে পারার পর সাঙ্গাকারাকে ‘স্যরি’-ও বলেন। ডাবল সেঞ্চুরি থেকে ৮ রান দূরে থাকতে ফিরে আসার দুঃখ কি আর তাতে ঘোচে!

সতীর্থদের কাঁধে চড়ে বিদায়। ছবি: এএফপি

যেভাবে খেলছিলেন, কোয়ের্তজেন ওই ভুল না করলে টানা তৃতীয় টেস্টে সাঙ্গাকারার ডাবল সেঞ্চুরি অবশ্যম্ভাবীই ছিল। আগের যে দুই টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি, দুটিতেই প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ। সব দলের বিপক্ষেই রান করেছেন, তবে বাংলাদেশের বোলিং একটু বেশিই ভালোবাসতেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান তাঁর, ওয়ানডেতেও তা-ই। ক্যারিয়ারের একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরিটিতেও বাংলাদেশের বোলারদের নীরব কান্না। চট্টগ্রামে ওই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেও সেঞ্চুরি। একই টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরির যে কীর্তি আছে আর শুধুই গ্রাহাম গুচের।

যা করেছেন, তাতে সর্বকালের সেরাদের দলেই থাকা উচিত। অথচ কেন যেন সেই আলোচনা তেমন উচ্চকিত নয়। সমকালীন সেরাদের নিয়ে আলোচনাতেই তো সাঙ্গাকারার নামটি কীভাবে যেন অনেকেই ভুলে যেত!

ডনের রেকর্ড ছুঁতে না পারার দুঃখের সঙ্গে যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিতে না-পারার দুঃখও থাকবে। তবে পুরো ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে তা মুছে যাওয়ার কথা। ২০১০ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, টেস্টে ১০ হাজার রান আর ৩০টি সেঞ্চুরি হলেই তৃপ্ত থাকবেন। শেষ করলেন নিজের সেই লক্ষ্যের চেয়েও ২৪০০ রান ও ৮টি সেঞ্চুরি বেশি করে।

যা করেছেন, তাতে সর্বকালের সেরাদের দলেই থাকা উচিত। অথচ কেন যেন সেই আলোচনা তেমন উচ্চকিত নয়। সমকালীন সেরাদের নিয়ে আলোচনাতেই তো সাঙ্গাকারার নামটি কীভাবে যেন অনেকেই ভুলে যেত! টেন্ডুলকার-লারা-পন্টিংদের সঙ্গে এক নিশ্বাসে কখনোই উচ্চারিত হয়নি তাঁর নাম।

এমনকি রান-সেঞ্চুরিতে অনেক এগিয়ে থাকার পরও শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবেই তাঁর অধিষ্ঠান অবিসংবাদিত নয়। যাঁর সঙ্গে মিলে কলম্বোতে ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাব’ নামে অভিজাত রেস্তোরাঁ দিয়েছেন, সেই প্রিয় বন্ধু মাহেলা জয়াবর্ধনের নাম বলেন অনেকে। কেউ কেউ আবার অরবিন্দ ডি সিলভাকেই রাখেন এক নম্বরে। কারণটা সাঙ্গাকারা নিজেই বলেছেন অনেকবার, ‘আমি কখনোই ব্যাটিংকে ওদের মতো সহজ মনে করাতে পারিনি।’

না হয় কঠিনই মনে করিয়েছেন। কিন্তু রেকর্ড বইয়ে তারার মতো জ্বলজ্বলে ওই সংখ্যাগুলো? সাঙ্গাকারা সেখানে শ্রীলঙ্কার সীমানা ছাড়িয়ে চিরকালীন নায়ক হয়েই থাকবেন।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×