আলবার্ট ট্রট

তারপরও মৃত্যুঞ্জয়ী!

উৎপল শুভ্র

৩০ জুলাই ২০২১

তারপরও মৃত্যুঞ্জয়ী!

ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। তা এমন তো আরও ১৩ জন আছেন। তাহলে অ্যালবার্ট ট্রট কোথায় আলাদা? কেন তিনি অমর হয়ে আছেন? অমর হয়ে আছেন একটা কীর্তির কারণেই। কী সেই কীর্তি?

‘জিদানের বাবার নাম কী, বলবেন?’

‘১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে রেফারি কে ছিলেন?’

‘শচীন টেন্ডুলকারের কি কোনো বোন আছে?’ 

প্রথম আলোর ক্রীড়া বিভাগে কাজ করার সময় পাঠকদের বিচিত্র সব টেলিফোন পেতাম। টেলিফোন তো আর বিচিত্র হয় না। জিজ্ঞাসাগুলো বিচিত্র। তিনটি নমুনা তো শুরুতেই দিলাম। বেশির ভাগ সময় এই প্রশ্নগুলোর মূলে থাকত বাজি। চূড়ান্ত মীমাংসার জন্য সংবাদপত্রের ক্রীড়া বিভাগ এবং এই একটা জায়গায় পাঠকদের দাবি সীমাহীন। একবার যেমন এক পাঠক ‘রোনালদোরা কয় ভাই-বোন’ প্রশ্ন করে ‘ঠিক জানি না ভাই’ উত্তর পেয়ে বললেন, ‘এটা কেমন কথা! তাহলে আপনারা আছেন কেন?’

সিরিয়াস প্রশ্নও হয়। একবার যেমন একটা ফোন এল, ‘দু দেশের হয়ে টেস্ট খেলেছেন কয় জন ক্রিকেটার?’ ১৪ জন জানতাম, তারপরও নিশ্চিত হতে ক্রিকইনফোতে যেতে হলো। ১৪ জনই। এই ১৪ জনের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়েই অ্যালবার্ট ট্রটের সঙ্গে ভালোমতো পরিচয়। এটা প্রায় ২১ বছর আগের কথা। সেই থেকে আলবার্ট ট্রটের নামটা মনে গেঁথে আছে।

অ্যালবার্ট ট্রট: এক শটেই নিশ্চিত অমরত্ব

অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ৩টি টেস্ট খেলেছেন, ইংল্যান্ডের পক্ষে ২টি। ৫ টেস্টে ৩৮ গড়ে ২২৮ রান, ১৫ গড়ে ২৬ উইকেট। মোটামুটি ভালো রেকর্ড, তবে তাঁকে নিয়ে আলাদা একটা লেখা লিখে ফেলতে হবে, এমন নয়। লেখার কারণ— আজ, ৩০ জুলাই অ্যালবার্ট টর্টের মৃত্যুবার্ষিকী। সেই মৃত্যুটা যেভাবে, সেটিই আসলে নাড়া দিয়ে অ্যালবার্ট ট্রটের নামটা আর ভুলতে দেয়নি। 

১৯১৪ সালের ৩০ জুলাই ট্রটের বয়স ছিল ৪১ বছর ১৭৪ দিন, সেদিনই তার মনে হয়েছিল—এই জীবন আর টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে তাই জীবনের ইতি টেনে দিলেন। ট্রটের মৃতদেহের সঙ্গে পাওয়া গেল একটি উইল। লন্ড্রি বিলের পেছনে লেখা। বাড়ির মালিক বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে দিয়ে গেছেন সব। ‘সব’ মানে একটি ওয়ারড্রোব ও নগদ ৪ পাউন্ড। ট্রটের এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

অ্যালবার্ট ট্রটের সমাধি

কেউ আত্মহত্যা করলে তাকে ‘ট্র্যাজিক হিরো’ বলে দেওয়া খুব সহজ। আসলেই ‘হিরো’ ছিলেন কি না, অনেক সময় তা বিবেচনা না করেই। তবে অ্যালবার্ট ট্রট ছিলেন আসলেই ‘হিরো’। শুধু অভিষেক টেস্টটাই ক্রিকেট ইতিহাসে তাকে ‘হিরো’ করে রাখতে যথেষ্ট। ১৮৮৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাডিলেডে দুই ইনিংসে অপরাজিত ৩৮ ও ৭২। দু বারই ব্যাট করেছেন ১০ নম্বরে এবং দু বারই অপরাজিত।

মূল পরিচয় ছিল বোলার। তখনো পেস-স্পিনের ধারণা ততটা স্পষ্ট নয় বলে ক্রিকেট ইতিহাসে ট্রটের পরিচয় ‘রাইট-আর্ম স্লো’। সেই ‘রাইট-আর্ম স্লো’ বোলিং করেই ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছিলেন ৪৩ রানে ৮ উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটে কোনো বোলারের ইনিংসে ৮ উইকেট নেওয়ার প্রথম কৃতিত্ব এটা। সিডনিতে পরের টেস্টে ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন (৯ নম্বর) পেয়ে খেললেন অপরাজিত ৮৫ রানের এক ইনিংস। 

অথচ এমন পারফরম্যান্সের পরও পরের বছর ইংল্যান্ড সফরে যাওয়া বড় ভাই হ্যারি ট্রটের অস্ট্রেলিয়া দলে তাঁর জায়গা হলো না! অ্যালবার্ট ট্রট অবশ্য অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে এক জাহাজেই ইংল্যান্ডে গেলেন। তবে নিজের খরচে। 

অ্যালবার্ট ট্রটের জীবনীর প্রচ্ছদেও ওই কীর্তির কথা

ইংল্যান্ড গিয়ে লর্ডসে যোগ দিলেন গ্রাউন্ডসম্যান হিসেবে। তারপর একসময় মিডলসেক্সে খেললেন, খেললেন ইংল্যান্ড দলেও। জীবনের প্রথম দুই টেস্টের পর তাঁর যা কিছু কীর্তি, তার সবই মিডলসেক্সের হয়ে। বিগ হিটার হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন, সেই বিগ হিটিংয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটির একটা স্মারক এখনো লর্ডসের ক্রিকেট জাদুঘরে রাখা আছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমসিসির ম্যাচে মন্টি নোবলকে এমন এক ছক্কা মেরেছিলেন, বল উড়ে গিয়েছিল লর্ডসের প্যাভিলিয়নের ওপর দিয়ে। এর আগে-পরে আর কোনো ব্যাটসম্যানের এই কীর্তি নেই এবং এটির কারণেই তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী!

অ্যালবার্ট ট্রর্টের কথা উঠলে ক্রিকেট ইতিহাসবিদরা তার ট্র্যাজিক মৃত্যু নয়, প্রথমেই বলেন এই বিগ হিটের কথা। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর জীবনীর প্রচ্ছদেও উল্লেখ করা আছে এই কীর্তির। জীবনীর নাম 'ওভার অ্যান্ড আউট'। পরিচয় দিতে গিয়ে ওই লর্ডসের কথাই এসেছে: দ্য ম্যান হু ক্লিয়ারড দ্য লর্ডস প্যাভিলিয়ন।

মৃত্যুঞ্জয়ীই তো!

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×