`দিলস্কুপ`-এর নাম তো হওয়া উচিত `অ্যাশস্কুপ`

উৎপল শুভ্র

১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

`দিলস্কুপ`-এর নাম তো হওয়া উচিত `অ্যাশস্কুপ`

অধারাবাহিকতার বৃত্ত ভেঙে যেদিন স্বরূপে দেখা দিতে, কেমন রঙিন হয়ে যেত সেই দিনটি! তোমার ব্যাটিংয়ের রঙে রঙিন, যে রং ছড়িয়ে যেত পুরো দেশে। তখন তো বাংলাদেশের একেকটা জয় মানেই জাতীয় উৎসবের উপলক্ষ। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি! কার্ডিফ, নটিংহাম, হারারে, জোহানেসবার্গ, গায়ানা...

রাঙিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। তোমার এমনই ছিল যে, একটার পর একটা ইনিংস মিছিল করে মনে আসছে। বহুল চর্চিত কার্ডিফ আর নটিংহাম তো বলা হয়েই গেল। পরের ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৫৮। ধারাবাহিকতার সঙ্গে তোমার চিরদিনের আড়ি সেই প্রথম ভেঙেছিল। এরপর আর একবারই। ২০০৬ সালে বগুড়ায় ওই লঙ্কা জয়ের ম্যাচটির পর চট্টগ্রামে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে ৬৪। এরপর সেখানেই প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১৩৬। ৬১ টেস্ট আর ১৭৭ ওয়ানডের ক্যারিয়ারে মাত্র দুবার টানা তিন ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান। প্রতিভা হিসেবে তুমি ছিলে 'বিশেষ কিছু'। ধারাবাহিকতার অভাবের কথা বললেও তোমাকে ‘বিশেষ কিছু' বলে না মেনে উপায় নেই।

কিন্তু সেই বৃত্ত ভেঙে যেদিন স্বরূপে দেখা দিতে, কেমন রঙিন হয়ে যেত সেই দিনটি! তোমার ব্যাটিংয়ের রঙে রঙিন, যে রং ছড়িয়ে যেত পুরো দেশে। তখন তো বাংলাদেশের একেকটা জয় মানেই জাতীয় উৎসবের উপলক্ষ। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি! ২০০৭ বিশ্বকাপে গায়ানায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৮৩ বলে ৮৭, সে বছরই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জোহানেসবার্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে মাত্র ২০ বলে ফিফটি করার পর শেষ পর্যন্ত ২৭ বলে ৬১। পরে তিলকারত্নে দিলশান যে শটটিকে 'দিলস্কুপ' বলে নিজের নামে পেটেন্ট করে নিলেন, সেটি তো জোহানেসবার্গেই বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছ তুমি। ওই শটের নাম তো আসলে হওয়া ছিল 'অ্যাশস্কুপ'! ওয়ানডেতে বাংলাদেশের এক সময়ের দ্রুততম ফিফটি আশরাফুলেরই ছিল। ছবি: এএফপি

গায়ানাতেও তুমি এই শট খেলে পাগল করে দিয়েছিলে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের। স্কুপ আর প্যাডল মিলিয়ে অদ্ভুত এক শট। ম্যাচ জেতানোর রাতে তোমরা পুরো দল মিলে একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে গেলে। আমিও তোমাদের সঙ্গী। খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে না হতেই ঝুমবৃষ্টি। রেস্টুরেন্টের বারান্দায় বসে তোমার ইন্টারভিউ করলাম। কার্ডিফের সেঞ্চুরি আর গায়ানার ৮৭-কে একই মর্যাদা দিয়েও একটা পার্থক্যের কথা ধরিয়ে দিয়েছিলে, 'কার্ডিফে আমি দুটি লাইফ পেয়েছিলাম। ৫৪ রানের সময় পুল করে একটি চার মেরে ৫৮ করেছিলাম। সেটি ছিল ক্যাচ, ওরা ধরতে পারেনি। এরপর ৮২ রানেও আরেকটা লাইফ পেয়েছিলাম। তবে আজ মনে হয়, আমি একটাও বাজে শট খেলিনি।'

সেই সময়ের বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার কথা চিন্তা করলে কার্ডিফের মহিমা কখনোই ম্লান হওয়ার নয়। তবে ব্যাটসম্যানশিপের দিক থেকে গায়ানায় বোধ হয় ছাড়িয়ে গিয়েছিলে কার্ডিফকেও। অমন মারকাটারি ইনিংস খেলার উইকেটই তো ছিল না সেটি। কার্ডিফে মাশরাফির প্রথম ওভারটাই অসম্ভব এক স্বপ্নের সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আর এখানে বাংলাদেশের কী ভয়ঙ্কর শুরু! সেটির কারণে আমাকে কেমন অপ্রস্তুত হতে হয়েছিল, সেটি তো পরে শুনেছই । পুরো বিপরীত টাইম জোন ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে পত্রিকার প্রথম সংস্করণের জন্য লেখা দাবি করে প্রথম ইনিংসের ২০/২৫ ওভার পরই। ২৫ ওভার শেষে বাংলাদেশের স্কোর ৪ উইকেটে ৯২। তখন যা লেখার কথা, আমি তা-ই লিখেছিলাম । ব্যাটসম্যানদের শম্বুকগতির ব্যাটিংয়ের তীব্র সমালোচনা। পরের সংস্করণগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই সেটি ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছ তুমি।

প্রথম সংস্করণের লেখাটা ভুলেই গিয়েছিলাম। পরদিন অফিস থেকে ফরোয়ার্ড করা পঞ্চগড়ের এক পাঠকের রাগে-ক্ষোভে গনগনে ই-মেইলটা পড়ে প্রথমে তাই বুঝতেই পারিনি ঘটনা কী। ই-মেইল বার্তায় গালির ফাঁকে ফাঁকে যা লেখা হয়েছে, সেটির মূল কথা হলো, বাংলাদেশ এমন দারুণ একটা ম্যাচ জেতার পর এমন একটা লেখা আমি কীভাবে লিখতে পারলাম! কী আশ্চর্য, আমি তো ভালো-ভালো কথাই লিখেছি। একটু পরেই রহস্যটা বুঝে ফেললাম, পঞ্চগড়ের ওই পাঠক তো পত্রিকার প্রথম সংস্করণটা পেয়েছেন। সে সময়ের ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে অমন উড়িয়ে দেওয়া জয়ের পর ওই লেখা পড়লে কার না মেজাজ খারাপ হবে! পত্রিকার সংস্করণের রহস্য বুঝিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসের ২৫ ওভার পর আপনি কী ভাবছিলেন মনে করে দেখুন তো...এসব লিখে-টিখে উত্তর দিলাম। দুঃখ প্রকাশ করা ফিরতি ই-মেইল পেলাম, 'আপনার ওপর আর কোনো রাগ নেই। সত্যিই তো, আপনি কীভাবে জানবেন, এরপর আশরাফুল এমন ব্যাটিং করবে!’ কেমন ব্যাটিং? তোমার ব্যাটের জাদুস্পর্শে ইনিংসের শেষ ২৫ ওভারে বাংলাদেশের ১৫৯ রান তুলে ফেলা থেকেই যা পরিষ্কার।গায়ানায় স্কুপ মেরে মেরে পাগল করে দিয়েছিলে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের। ছবি: এএফপি

এরও তিন বছর আগে প্রায় ভুলে যেতে বসা জয়ের সঙ্গে আবার দেখাও তো তোমার কল্যাণেই। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর ৪৭টি ম্যাচের ৪৫টিতেই বাংলাদেশ মাঠে নেমেছে আর হেরেছে। বাকি দুটিতে বাঁচিয়েছে বৃষ্টি। তুমিই আমাকে একদিন বলছিলে, 'আমরা ম্যাচের পর ম্যাচ হারি। তারপরও মানুষ আমাদের কী সম্মান করে! আমি শুধু ভাবি, যদি আমরা একটা ম্যাচ জিতে যাই, বাংলাদেশের মানুষ তাহলে কী করবে!' আমি বললাম, ‘জেতাও না একটা ম্যাচ। তাহলেই তো প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া যায়।' এই কথোপকথন ২০০৪ সালের জিম্বাবুয়ে ট্যুরেই তো! বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া টেস্ট বুলাওয়ের হোটেলে রুমবন্দী করে রাখার সময়টাতে বিরামহীন আড্ডায়।

কী আশ্চর্য, কদিনের মধ্যেই ঘুচে গেল বাংলাদেশের ওই জয়খরা। তোমার ব্যাটেরই যাতে সবচেয়ে বড় অবদান। সেই জয়ের মাহাত্ম্য এখন আর কেউ বুঝবেই না। ডেভ হোয়াটমোর তো তখনই বুঝতে পারেননি। জয়ের রাতে সাক্ষাৎকার নিতে তাঁর রুমে গিয়েছি। আমার চেহারা আর হাবভাব দেখে অবাক হয়ে বললেন, 'তুমি এমন করছ কেন? আমরা তো শুধুই একটা ম্যাচ জিতেছি।' শুধুই একটা ম্যাচ! হোয়াটমোরের কাছে হয়তো তা-ই ছিল, কিন্তু প্রায় সাড়ে চার বছরে জয়হীন ৪৭টা ম্যাচের ৪০টার মতোই কাভার করা সাংবাদিকের অনুভূতিটা কীভাবে এক হবে!

হারারেতে তোমার ৩২ বলে অপরাজিত ৫১ রানের ইনিংসটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আজ মনে হয় প্রতিজ্ঞা করেই নেমেছ, জিতলে বাংলাদেশের মানুষ কী করে, তা তুমি দেখতে চাও। প্রায় ১৬০ স্ট্রাইক রেটের ইনিংসে মাত্র ৫টি চার—তুমি নিজেও যাতে একটু বিস্মিতই হয়েছিলে। একটা স্মৃতি হাত ধরে আরেকটাকে টেনে আনে। হারারের ওই ম্যাচজয়ী ইনিংসের আগে ‘ঝরা ফুল আশরাফুল’ গল্পটা মনে আছে তোমার, অ্যাশ? হারারেতে অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট অভিষেকে ‘পেয়ার' পেয়েছেন হাবিবুল বাশার। সেই রাতে তাঁকে নিয়ে তুমি আমার রুমে এলে। স্বাভাবিকভাবেই হাবিবুলের খুব মন খারাপ। তার মধ্যেও তোমাকে জড়িয়ে ধরে বারবার মজা করে বলছিলেন, 'আশার ফুল আশরাফুল আর ঝরা ফুল হাবিবুল।'

আরও পড়ুন:

পর্ব-১: প্রথম দেখার স্মৃতি এবং...
পর্ব-২: দুনিয়া কাঁপানো সেই সেঞ্চুরি এবং জন্মতারিখের ভুল
পর্ব-৩: 'মধ্যদুপুরে আশরাফুল যেন মায়াবী বিভ্রম'

সেই টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৯৮ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেছ। যা দেখে আবেগ প্রকাশে মিতব্যয়ী কোচ ডেভ হোয়াটমোরের মুগ্ধতা পর্যন্ত বাঁধ মানছে না। হিথ স্ট্রিক তো আগে থেকেই ছিলেন, সেই টেস্টেই অভিষেক হয়েছে অ্যান্ড্রু ব্লিগনটের। ঘণ্টায় ৯০ মাইলের নিচে বল করাটা যাঁর ঘোর অপছন্দ। তাঁকেও এমন সহজে খেললে যে হোয়াটমোর না বলে পারলেন না, 'কী ব্যাটসম্যান! ফ্রন্ট ফুট, ব্যাক ফুট, উইকেটের সামনে, উইকেটের আড়াআড়ি-কোথাও কোনো দুর্বলতা নেই। আর হাতে এত সময়। এই যে ব্লিগনট আজ ৯০ মাইল গতিতে বল করল, ও এমনভাবে বলের পেছনে গেল যে ব্লিগনটের গতিটা বোঝাই গেল না।' হোয়াটমোর যা বলেননি তা হলো, বাংলাদেশের বাকি ব্যাটসম্যানরা সেটি ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে। অ্যাশ, তোমার মনে আছে কি না, তোমার সেই ইনিংসটার শেষ দিকটা ছিল লড়াইয়ের মধ্যে আরেকটা লড়াই। অভিষেকে সেঞ্চুরির পর তোমার আর সেঞ্চুরি নেই। তুমি চাইছ দ্বিতীয় সেঞ্চুরি, আর স্ট্রিক টেস্টে ২০০তম উইকেট। সেই লড়াইটাতে তুমি হেরে গেলে।

ও হ্যাঁ, ঝরা ফুলের ওই গল্পটা। ৯৮-এর পরের ইনিংসে তুমি প্রথম বলেই আউট। বুলাওয়েতে পরের টেস্টে বৃষ্টি যতটুকু খেলা হতে দিল, ওর মধ্যেই আউট হতে সক্ষম হয়েছ। করেছ মাত্র ১ রান। ওয়ানডেতে সিরিজের আগে তুমি তাই হাবিবুলকে বলতে শুরু করলে, ‘সুমন ভাই, এখন তো বলতে হবে “ঝরা ফুল আশরাফুল”।'

(লেখকের 'এগারো' বই থেকে)

চলবে...

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×