জালাল আহমেদ চৌধুরীকে নিয়ে কয়েক ছত্র

`হরিকল অকালে নিভে গেল`

দুলাল মাহমুদ

২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

`হরিকল অকালে নিভে গেল`

শরতের সকালটা শুরু হয়েছিল প্রবল ধাক্কায়, `জালাল আহমেদ চৌধুরী আর নেই`। ক্রিকেটানুরাগী সব মানুষর কাছেই খবরটা এসেছে শোকবার্তা নিয়ে। দীর্ঘদিন জালাল আহমেদ চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখা ক্রীড়া সাংবাদিক দুলাল মাহমুদ উৎপলশুভ্রডটকম-এ স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন তাঁকে নিয়ে।

শিরোনামটা দেখে বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা লেগেছিল। শুরুতেই মনের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়, কে এই হরিকল? এমন অভিনব শিরোনাম তো সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। ধাক্কাটা সামলে ধীরে ধীরে পাঠের প্রতি মনোযোগী হতে হয়। সেই আশির দশকে দৈনিক পত্রিকার পাতায় ক্রীড়া বিষয়ক এত বড় লেখা খুব বেশি সুলভ ছিল না। লেখার ট্রিটমেন্টটা বেশ ভালো দেওয়া হয়। 'দৈনিক বাংলা পত্রিকা'র সাপ্তাহিক খেলার পাতায় পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে প্রকাশিত হয় লেখাটি। বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ছবি। অকালে ঝরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার আর্চি জ্যাকসনকে নিয়ে। বয়স ২৩ অতিক্রম করার পর যক্ষ্মা রোগে নিভে যায় অসম্ভব প্রতিভাবান এই ক্রিকেটারের প্রাণপ্রদীপ। লেখাটা শুরু হয় এভাবে, 'প্রাণ রসায়ন হয়তো বিশদ বিবরণে বলে দিতে পারে কেন মানুষের চোখের পাতা বাষ্পে ভিজে, ফোঁটায় ফোঁটায় এক সময় বানভাসী হয়। কিন্তু হৃদয়ের তলদেশ ছোঁয়া যে বেদনভার হালকা পায়ে চলা কালপুরুষের সুচারুপদক্ষেপকে টলিয়ে দেয়, তার কার্যকারণ বোধের অগম্য। প্রকৃতির সাধারণ প্রবাহমানতায় এক একটি অসহ্য ঝাঁকুনি দিয়ে দিকচক্রবালে প্রশ্নবোধক আঁকার কি এমন প্রয়োজন বিধাতা-পুরুষের? এ নিঠুর গরজ কেন, কিসের? কেন এমন হৃদয়হীন রসিকতা?'

যেন কোনো ট্র্যাজিক উপন্যাস পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠতে থাকে। লেখার স্টাইল, ভঙ্গি, শব্দের বুননে কবেকার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যেন সদ্য জেগে ওঠেছে। সেই শোক, সেই দুঃখ, সেই বেদনা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে ফিরে আসে। আর্চি জ্যাকসনের মৃত্যু টাটকা স্মৃতি হয়ে খোঁচাতে থাকে। শব্দশক্তি দিয়ে পাঠককে এভাবে দুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় অবাক করে দেয়। সবাই তো এমন লিখতে পারেন না। মনদুলুনি এই কলমশিল্পী ছিলেন জালাল আহমেদ চৌধুরী। তিনি যে এত চমৎকার বাংলা লেখেন, তার আগে আমার জানা ছিল না।জালাল আহমেদ চৌধুরী

এই লেখা পড়ার পর তাঁর লেখার অপেক্ষায় থাকতাম। অপেক্ষাটা সহসা ফুরাতে চাইত না। তিনি যে জাত রোমান্টিক, তা অনুধাবন করতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। সে সময় তিনি কর্মরত ছিলেন রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন ইংরেজি দৈনিক 'বাংলাদেশ টাইমস' পত্রিকার স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে। আর ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই। ক্রিকেটার ও কোচ হিসেবে। ভারতের পাতিয়ালা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে ক্রিকেট বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। জাতীয়, ক্রিকেট বোর্ড ও বিভিন্ন ক্লাব দলের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে ক্রিকেটকে রাঙিয়েছেন অসংখ্য ক্রিকেটার।

সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটকে যাঁরা হৃদয়ের গভীরভাবে ধারণ করতেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। একটা সময় সাহিত্যচর্চা করেছেন। কবিতা লিখেছেন। গ্রন্থের প্রকাশক ছিলেন। জড়িয়ে ছিলেন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে। ঢাকার আজিমপুরের ক্রীড়া ও সাহিত্যের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ক্রিকেটের সঙ্গে সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ক্রিকেট লিখিয়ে হিসেবে স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলেন। সব মিলিয়ে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন মানুষ।

আড্ডার প্রতি তাঁর ছিল সুতীব্র টান। পাক্ষিক 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় নিয়মিত আড্ডা মারতে আসতেন। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। গত প্রায় চার দশকে সেই পরিচয় ক্রমশ বিস্তৃত হয়। তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। বিচরণক্ষেত্র অভিন্ন হওয়ায় নানাভাবে তাঁর সংস্পর্শে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। দীর্ঘ দিন বিভিন্ন প্রেস বক্সের পাশাপাশি প্রথম আলো ক্রীড়া পুরষ্কারের জুরি বোর্ড, বিএসপিএ স্পোর্টস জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁর ঔদার্য, তাঁর স্নেহ, তাঁর আন্তরিকতার পরশ পেয়েছি।  

সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর কলমের মুগ্ধ পাঠক হয়ে যাই। তিনি যখনই যেখানে যা লেখেন, পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। নিজের গরজে লিখতে চাইতেন না। অনুরুদ্ধ না হলে লেখার তাগিদ পেতেন না। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অনেক দিন লিখেছেন। সংবেদনশীল মনোভাবের কারণে তা নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকেনি। লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভীষণ অলস প্রকৃতির। সহজে কলম ধরতে চাইতেন না। যে কারণে তাঁর লেখার সংখ্যা অপরিমিত নয়। যা তাঁর অনুরাগীদের কাছে অনন্ত আক্ষেপ হয়ে আছে।

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ফেসবুক'-এ তিনি বেশ সরব ছিলেন। তার মানে এই নয়, ধুমসে লিখতেন। মূলত ছোট ছোট মন্তব্য করতে পছন্দ করতেন। যেন এক একটা এলেজি, লিমেরিক বা গালিবের শায়েরী। তাতেই পরিস্ফুটিত হয়ে উঠত তাঁর মেজাজ, তাঁর মনোভাব, তাঁর মুন্সিয়ানা। মন্তব্যগুলো যেন এক এক ফোটা কস্তুরী। তার সৌরভে আমোদিত হতেন পাঠককুল। বিশেষ করে তাতে দারুণভাবে উদ্বেলিত ও অনুপ্রাণিত হতেন নতুন প্রজন্ম। তাঁর লেখা আত্মস্থ করে নিজেদের সেইভাবে প্রস্তুত করার একটা তাগিদ অনুভব করতেন।

সোনার কলমের অধিকারী হয়েও তিনি কেন যে লেখালেখির প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলেন না, তার কোনো যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায় না। হতে পারে আখ মাড়াই করে যেভাবে রস বের করা হয়, তেমনিভাবে সুস্বাদু এক-একটা লেখা লিখতে নিজেকে নিংড়ে দিতে হয়েছে। পাঠকরা রসোত্তীর্ণ লেখা পেয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। পাঠকের ভালো লাগা তাঁকে প্রাণিত করলেও নিয়মিতভাবে লেখার এই চাপ নেওয়াটা তাঁর কাছে পছন্দের না-ও লাগতে পারে।

তিনি জীবনকে উপভোগ করতে চাইতেন নিজের মতো করে। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যে আত্মতৃপ্তি পেতেন, তা সাধারণত নিজের মধ্যেই ধারণ করতে চাইতেন। কেউ জানতে না চাইলে শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। এই বোধের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হতে পারে না। বিরলপ্রজ এই লেখকের গ্রন্থ সংখ্যা সর্বসাকুল্যে একটি, 'বিশ্বকাপ ও কয়েক ছত্র ক্রিকেট'। তবে তিনি এ যাবৎ যা লেখালেখি করেছেন, তা সংকলিত হলে একাধিক গ্রন্থ হতে পারে। তেমন উদ্যোগ কি নেওয়া সম্ভব হবে?

শরীরের খুবই নাজুক অংশ ফুসফুস। তার একটুখানি অনাদর হলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সংক্রমিত ফুসফুসের কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটা পলে পলে বুঝতে পারছি। আর ধূমপায়ী হলে তো কথা নেই। ফুসফুসের জন্য ধূমপান মারাত্মক ক্ষতিকর। আমি অধূমপায়ী হয়েও যে ধকল সইতে হচ্ছে আর ধূমপায়ী জালাল ভাইয়ের জন্য এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, সেটা তো এখন সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে। তিনি তা ভালো করেই জানতেন৷ কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনো ভাবনা ছিল বলে দৃশ্যমান হয়নি। এ কারণে ধূমপান ছাড়ার বিষয়ে একদমই মাথা ঘামাননি। বরং হাবে-ভাবে মনে হয়েছে, ধূমপান তাঁর কাছে ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ।ঢাকা স্টেডিয়ামে শেষবার...

একাকীত্ব জীবনে নিকোটিন তাঁকে বোধ করি নিবিড় সঙ্গ দিয়েছে। ক্রিকেট থেকে পাওয়া নির্যাস আর ধূমপানের সুখটানের যুগল বন্ধনে যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তাতে হয়তো নিজের মতো বেঁচে থাকার আনন্দ ছিল। কিন্তু তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে তা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। সবার চোখের সামনে একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে থাকেন তিনি। এভাবেই সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়, তারপরও প্রাণসম্পদে ভরপুর তাঁর মতো একজন সৃজনশীল মানুষের চলে যাওয়াটা শূন্যতারও অধিক একটা হাহাকার বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে বিদায়ী মঞ্চে তাঁর প্রাণহীণ দেহের সামনে যখন বিষাদ আর আর্দ্রতায় মাখামাখি তাঁর সহযোগী, সহকর্মী ও সহমর্মীদের চোখ; ঠিক তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি যেন পরিবেশটাকে আরও বেশি শোকাবহ করে তোলে। সেই শোক সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে না। হায়! বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যে তাঁর মতো করে আর কেউ লিখবেন না।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন