চোখের সামনে ঘটতে দেখেও বিশ্বাস করা কঠিন

উৎপল শুভ্র

৫ অক্টোবর ২০২১

চোখের সামনে ঘটতে দেখেও বিশ্বাস করা কঠিন

মাশরাফি বিন মুর্তজার সত্যিকারের জীবন নিয়ে কোনো চিত্রনাট্যকার সিনেমার গল্প বানালে পরিচালকের তা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার কথা! এমন হয় নাকি! এত অবিশ্বাস্য! এত অবাস্তব! ক্রিকেটার-অধিনায়কের সীমানা ছাড়িয়ে মাশরাফির গল্পটা আসলে সব প্রতিকূলতা জয় করে বারবার ফিরে আসার নাটকীয় গল্প। তীব্র ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞার এমন এক গল্প, যা সব মানুষের জন্যই প্রেরণা। মাশরাফির ক্রিকেট, মাশরাফির জীবন নিয়ে ধারাবাহিক রচনার প্রথম পর্ব।

আচ্ছা, পুরো বাংলাদেশ খুঁজেও মাশরাফি বিন মুর্তজাকে চেনেন না, এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে? এখনো বোধবুদ্ধি হয়নি, এমন শিশুদেরও যদি হিসাবে ধরেন, তাহলে ভিন্ন কথা। নইলে এমন কাউকে পাবেন বলে মনে হয় না।

তারপরও লেখার খাতিরে, নিছকই লেখার খাতিরে ধরে নিলাম, পাওয়া গেল এমন একজনকে। মাশরাফিকে চেনেন না এবং পেশায় তিনি চিত্রপরিচালক। ঠিক করেছেন, তাঁর পরের ছবিটা হবে ক্রিকেট নিয়ে। নায়ক নামী কোনো ক্রিকেটার। তাঁর খেলা, তাঁর জীবন নিয়েই ছবি। মাশরাফির জীবনের সত্যি গল্পটাকেই চিত্রনাট্য বানিয়ে যদি তাঁকে দেওয়া হয়, কী হতে পারে? নির্ঘাত ‘বড় বেশি অবাস্তব' রায় দিয়ে সেটিকে তিনি বাস্কেটে ফেলে দেবেন। দুই হাঁটুতে সাত-সাতবার অস্ত্রোপচারের পর একজন ক্রিকেটার খেলে যাচ্ছেন। সেই ক্রিকেটারও আবার পেস বোলার। এর চেয়ে অবাস্তব কিছু আর হয় নাকি!

মাশরাফি বিন মুর্তজা সেই আশ্চর্য গল্প, বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখা যেখানে মুছে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। চোখের সামনে ঘটতে না দেখলে যা বিশ্বাস করার মতো নয়। যেমন করেননি ওই কাল্পনিক চিত্রপরিচালকও। আপাত-অবাস্তবকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনা মাশরাফি যেন কল্পনার বলগা ঘোড়া ছড়ানো কোনো চিত্রনাট্যের নায়ক। যদি বলি, ক্রিকেট ইতিহাসেরই এক বিস্ময়—বেশি বলা হবে?

শুধু ক্রিকেটেই আটকে থাকা কেন, আর কোন খেলার ইতিহাসেই-বা আপনি খুঁজে পাবেন এমন অবিশ্বাস্য এক কাহিনি! কাছাকাছি কিছু বলতে তো ফুটবলে এক রোনালদোকেই শুধু পাই। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নন, রোনালদো দা লিমা নাজারিও। তিন-তিনবার ছুরি-কাঁচির নিচে হাঁটু সমর্পণ করেও ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকারের মাঠে ফেরাটাও কম আশ্চর্যের নয়। কিন্তু তিনের বদলে সংখ্যাটা যখন 'সাত' হয়ে যায়, শুধু 'আশ্চর্য' দিয়ে বিস্ময়টা আর বোঝানো যায়। না। সেটিকে আটকে রাখা যায় না শুধু ক্রিকেটের সীমানাতেও।তিনি তো ফিনিক্স পাখির মতোই ছাই থেকে উঠে এসে উড়েছেন ডানা মেলে। ছবি: গেটি ইমেজেস

মাশরাফির গল্প শুনতে শুনতে, ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে আবারও তাঁর ডানা মেলে ওড়া দেখতে দেখতে আমাদের চোখ এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, এটাই যেন স্বাভাবিক বলে ধরে নিই আমরা। আসলে যা অস্বাভাবিকত্বের চূড়ান্ত। যা বোঝাতে সহজ একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনার দুই হাঁটুতে একবার করে অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতেও কি আপনি দুবার ভাববেন না! সেখানে মাশরাফি দুই হাঁটুতে সাতটি অস্ত্রোপচারকে পাত্তা না দিয়ে এমন একটা কাজ করে যাচ্ছেন, শারীরবিজ্ঞান যেটিকে নৈবচ নৈবচ বলতে বাধ্য। দৌড়ে এসে লাফিয়ে উঠে দড়াম করে মাটিতে, ফলো থ্রুতে শরীরে মোচড়–হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের পর ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ যা যা করা উচিত নয় বলে জানাবে, পেস বোলার তো সেসবই করে। ওই হাঁটুজোড়া নিয়ে দিনের পর দিন মাশরাফির তা করে যাওয়াটা আসলে খেলার সীমা ছাড়িয়ে শারীরবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয় হওয়ার মতো।

কে জানে, ডেভিড ইয়াং তা এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছেন কি না! প্রথম অস্ত্রোপচারটা ভারতে হয়েছিল। এরপর থেকেই মাশরাফি মেলবোর্নের বিখ্যাত শল্যবিদের 'রোগী'। বিখ্যাত শল্যবিদের সবচেয়ে বিখ্যাত রোগীও। হাঁটুর অস্ত্রোপচারের জগতে ডেভিড ইয়াং নমস্য এক নাম। আওতাটা খেলোয়াড়দের মধ্যে সীমিত করে আনলে তো যাঁর মহিমা আরও বেড়ে যায়। সেই ডেভিড ইয়াংয়ের শল্যবিদ-জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। তৃতীয় বা চতুর্থ অস্ত্রোপচারের পরই প্রথমে ঠারে ঠারে, পরে সরাসরিই বলে দিয়েছিলেন, 'বাকি জীবনটা শান্তিমতো কাটাও, এই কামনা করি। তবে ক্রিকেট খেলার নাম আর মুখেও এনো না। ওই জীবন শুধুই তোমার সোনালি অতীত।' ডেভিড ইয়াংকে বিস্মিত করে মাশরাফি সেটিকে এতবার 'সোনালি বর্তমান' বানিয়ে ফেলেছেন যে, ইয়াং এখন বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন। পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচের ধকল নিতে পারবেন না বলে আজ অনেক বছর ধরেই ক্রিকেটার মাশরাফির রং শুধুই ‘রঙিন'। অথচ সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরে এসে ডেভিড ইয়াং বলে গেছেন, সেটিতে আবার 'সাদা' যোগ করাও খুবই সম্ভব। মনে মনে হয়তো বলেছেন, সেটি সম্ভব শুধু তিনি মাশরাফি বলেই।মাশরাফি ডেভিড ইয়াংয়ের জীবনে `মিরাকল`-ই হবেন। ছবি: বিসিবি

যাহ, প্রতিজ্ঞাটা দেখি রাখতেই পারলাম না। লেখাটা ভাবার সময়ই ঠিক করে নিয়েছিলাম, শুরুটা আর যা-ই দিয়ে করি, চোটের সঙ্গে তাঁর অন্তহীন লড়াইয়ের গল্প দিয়ে নয়। মাশরাফিকে নিয়ে কিছু লিখলে একসময় না একসময় তো প্রসঙ্গটা আসতে বাধ্যই, তবে সূচনাটা অন্তত তাঁর ছুরি-কাঁচি জর্জর হাঁটু থেকে শত হস্ত দূরে থাকবে। এমনই বহুলচর্চিত এক বিষয় যে পাঠক বিরক্ত হতে পারেন। এই 'ভুল' তাই করব না। তারপরও লিখতে বসে সেই প্রতিজ্ঞা ভুলে মাশরাফির হাঁটু নিয়েই পড়লাম কেন! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে একটা কারণই খুঁজে পাচ্ছি। মাশরাফির অত্যাশ্চর্য গল্পে বাকি কিছু ছাপিয়ে শারীরবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খেলে যাওয়াটাই আসলে সবার আগে সামনে এসে দাঁড়ায়। এটা দিয়ে শুরু না করার প্রতিজ্ঞাটাই তো উল্টো হাস্যকর মনে হচ্ছে এখন। এটা যেন এভারেস্ট নিয়ে লিখব, কিন্তু শুরুটা হিমালয় দিয়ে করা যাবে না প্রতিজ্ঞার মতো!

ওই প্রতিজ্ঞা করার আরেকটা কারণও অবশ্য ছিল। শুধু চোট জয় করার গল্প দিয়েই মাশরাফিকে মহীয়ান করে তোলার চেষ্টা ক্রিকেটার মাশরাফি, অধিনায়ক মাশরাফি, মানুষ মাশরাফিকে একটু আড়ালে ঠেলে দেয় যেন। ক্রিকেটীয় দক্ষতায় নয়, সহানুভূতির ‘বিশেষ কোটা'য় তাঁর খেলে যাওয়া। আহা, হাঁটুতে এতবার ছুরি চলার পরও ছেলেটা খেলতে এত ভালোবাসে! খেলুক না! মাশরাফির প্রতি তাতে অন্যায় হয়। বড় অন্যায় হয়।

এখানেও আবার সমস্যা আছে। মাশরাফির ক্রিকেটীয় দক্ষতাটা বোঝাবেন কিসে? ক্রিকেট সংখ্যার খেলা। ফুটবলের সঙ্গে যেখানে বড় পার্থক্য। ফুটবলে সংখ্যায় বাঁচেন শুধুই স্ট্রাইকাররা। অনেক বড় স্ট্রাইকার—গোল কত? সংখ্যাটাই আপনাকে বলে দেবে ওই স্ট্রাইকার কতটা ভালো। অন্য পজিশনের ফুটবলারদের ক্ষেত্রে যেটি 'ফোর্থ সাবজেক্ট'। গোলসংখ্যাটা যেখানে শুধু কিছু বাড়তি নম্বরই যোগ করে। ক্রিকেটে ঘটনা তা নয়। সবারই পরিচয় এখানে সংখ্যায়। অনেক বড় ব্যাটসম্যান? তা কত রান করেছেন, সেঞ্চুরি কয়টি, অ্যাভারেজ কত...। অনেক বড় বোলার বলছেন? তাহলে উইকেটের সংখ্যাটাও বলুন, প্লিজ। এখানেও অ্যাভারেজ, ইনিংসে ৫ উইকেট কতবার, ম্যাচে ১০ উইকেট... আরও কত কিছু ধরে টানাটানি শুরু হয়ে যায়।

চলবে...

* লেখকের 'এগারো' বই থেকে

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×