অকল্যান্ড থেকে নবজন্মের শহর নেপিয়ারে

উৎপল শুভ্র

৩ জানুয়ারি ২০২২

অকল্যান্ড থেকে নবজন্মের শহর নেপিয়ারে

শহরে ঢুকতে ঢুকতে সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়ল, বাড়িগুলো সব একই রকম। নেপিয়ারের ইতিহাসটা আগে থেকেই জানা না থাকলে হয়তো অবাকই হতাম। ১৯৩১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এই শহর। ফিনিক্স পাখির মতো ছাইয়ের মধ্য থেকে আবার জেগে উঠেছে তা। নিজেদের মনমতো আবার তা গড়ে তোলার সুযোগও হয়েছে এতে।

অকল্যান্ড থেকে প্লেনে এক ঘণ্টা দূরের নেপিয়ারে বাসে যেতে লাগে প্রায় আট ঘণ্টা। কিসে যাই, কিসে যাই...। যার সঙ্গে কথা বলি, সে-ই বলে, 'আরে, বাসে যাও। নিউজিল্যান্ডের পুরো নর্থ আইল্যান্ডটা দেখা হয়ে যাবে। দেখার মতো ল্যান্ডস্কেপ।

আসলেই দেখার মতো। আট ঘণ্টার বাস জার্নি কখন যে শেষ হয়ে গেল, টেরই পেলাম না। কাচের জানালার ওপাশে বিস্তৃত তৃণভূমি, দেখে মনে হয় যেন কার্পেট বিছিয়ে রাখা হয়েছে। 'তৃণভূমি' কথাটা ঠিক আছে, তবে বেশির ভাগই সমতল নয়। যত দূর চোখ যায়, উঁচু উঁচু সব শুরু হয়ে আছে মাটির ঢিবি। মাটির ঢিবি? বেশির ভাগের আকৃতি এমন যে, পর্বত বলাই ভালো। মাঝে-মধ্যেই দুপাশে বনভূমির মধ্য দিয়ে রাস্তা। বার্চ গাছ চিনলাম, বাকি সব অচেনা।

নর্থ আইল্যান্ড আর সাউথ আইল্যান্ডের ব্যাপারটা কি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন ছিল? অনেকের কাছেই জানা কথার পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে, তারপরও জানাই, নিউজিল্যান্ড অখন্ড কোনো দেশ নয়, দুটি দ্বীপের সমষ্টি। অকল্যান্ড, হ্যামিল্টন, নেপিয়ার, ওয়েলিংটন—এগুলো সব নর্থ আইল্যান্ডের শহর। ক্রিকেট অনুরাগী হয়ে থাকলে সাউথ আইল্যান্ডের শহরগুলোর মধ্যে ক্রাইস্টচার্চ, ডানেডিন ও কুইন্সটাউন নামগুলো আপনার পরিচিত হওয়ার কথা।

অকল্যান্ড থেকে নেপিয়ারের পথে অনেকবারই চোখে পড়ল এমন দৃশ্য

অকল্যান্ড থেকে নেপিয়ার আসতে আসতে আসলেই প্রায় পুরো নর্থ আইল্যান্ড দেখা হয়ে গেল। মাইলের পর মাইল জনপ্রাণীহীন সবুজ দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে গেল। 'জন' ঠিক আছে, তবে সঙ্গে ‘প্রাণী’ লেখাটা ঠিক হয়নি। প্রাণী তো কম দেখলাম না। দূরে পর্বতের সবুজের গায়ে সাদা সাদা ছোপ ছোপ মতো কী যেন দেখে একটু ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝলাম, ওগুলো সব ভেড়া। গরুও দেখলাম প্রচুর। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ছেড়ে রাখা হয়েছে শয়ে শয়ে গরু। রাখাল-টাখালের কোনো প্রয়োজন নেই বলে তা নেই-ও। ঘোড়াও চোখে পড়ল বেশ কিছু।

নেপিয়ারের ঠিক আগেই পথে পড়ল তাউপো। বিখ্যাত তাউপো লেকটাও। নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জলাধার এই তাউপো লেক, আজ থেকে ২৬,৫০০ বছর আগে মাউন্ট রুয়াপেহুর অগ্ন্যুৎপাত থেকে যেটির জন্ম। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলযঙ্করী অগ্ন্যুৎপাতের একটি থেকে চারপাশে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল ছাই আর লাভা। এই শহরে বেড়াতে আসা হাজার হাজার পর্যটককে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, আগ্নেয়গিরিটি এখনো জীবন্ত। সর্বশেষ ১৯৯৫ সালেও লাভা উদগিরণ করেছে এটি।

নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় লেক তাউপোওয়াইকাটো নদীর কথা তো আগেই লিখেছি, নিউজিল্যান্ডের দীর্ঘতম নদীটির জন্মও এই তাউপো লেক থেকেই। যেটির আরেক নাম 'ট্রাউট ফিশিং ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড'। প্রতিবছর ২৫ এপ্রিল বা এর আগে-পরের কোনো দিনে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাউট ফিশিং টুর্নামেন্টের আসরও বসে এখানে। পর্যটকদের কাছে তাউপোর আকর্ষণের ব্যাপারটা টের পেলাম বাস থেকে অনেককেই এখানে নেমে যেতে দেখে।

ভাউপো থেকে বাসে দু ঘণ্টা দূরত্বে নেপিয়ার শহর। হোটেলে পৌঁছে দেওয়া হ্যারি নামের তরুণ ট্যাক্সি ড্রাইভারের দাবি, এই শহরের লোকসংখ্যা ৮০ হাজার। বইপত্র ঘেঁটে একটু বাড়িয়ে বলাই মনে হচ্ছে। ৫৫ হাজারের বেশি লেখা নেই কোথাও। শহরে ঢুকতে ঢুকতে সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়ল, বাড়িগুলো সব একই রকম। নেপিয়ারের ইতিহাসটা আগে থেকেই জানা না থাকলে হয়তো অবাকই হতাম। এই বাড়িগুলোর একই রকম নকশার পেছনেও আছে আরেকটি প্রাকৃতিক 'খামখেয়ালি'। তাউপোর মতো তা হাজার হাজার বছর আগের ঘটনা নয়। ১৯৩১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এই শহর। ফিনিক্স পাখির মতো ছাইয়ের মধ্য থেকে আবার জেগে উঠেছে তা। নিজেদের মনমতো আবার তা গড়ে তোলার সুযোগও হয়েছে এতে।

নেপিয়ার শহরের কেন্দ্রে

ভূমিকম্পে শহরটির মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথা লিখেছি। কথাটা সত্যি, তবে শুধু এটুকু লিখলে ভূমিকম্প যে নেপিয়ারকে কিছু দিয়েছেও, সেটা ভুলে যাওয়া হয়। ওই ভূমিকম্পেই ৪০ বর্গকিলোমিটার বড় হয়ে যায় নেপিয়ারের আয়তন! সমুদ্রের তলদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই্ মিটার ওপরে উঠে গিয়ে আগের চেয়ে বড় করে দেয় নেপিয়ারকে। নেপিয়ার এয়ারপোর্টটাও হয়েছে ভূমিকম্পের কাছ থেকে উপহার পাওয়া জমিতে। এর আগে এখানে শুধু 'পোর্ট'ই ছিল, 'এয়ারটা যোগ হওয়া ভূমিকম্পের পর।

এই শহর নিয়ে যত লেখা পড়লাম, সবগুলোতেই একটা কথা কমন—এটা বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত আর্ট ডেকো স্থাপত্যের শহর। স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে খুব একটা জ্ঞান নেই, দেখি পড়াশোনা করে কিছু বুঝতে পারি কি না!

২৮ ডিসেম্বর, নেপিয়ার।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×