জীবন্ত এক লেকের গল্প

উৎপল শুভ্র

১০ জানুয়ারি ২০২২

জীবন্ত এক লেকের গল্প

সবুজাভ জলের ওয়াকাটিপু লেক ৮২ কিলোমিটার লম্বা। কোথাও কোথাও গভীরতা ৩৮০ মিটার পর্যন্ত। হয়তো এ কারণেই তীরে এসে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো লেককে সাগর বলে ভুল বোঝায়। ওয়াকাটিপু লেকের আসল বিশেষত্ব অবশ্য এটি নয়। আসল বিশেষত্ব, এই লেক `নিঃশ্বাস` নেয়।

কুইন্সটাউন থেকে বাসে ডানেডিন এলাম। অনেকটা পথ সঙ্গে এলো ওয়াকাটিপু লেক। আসারই কথা। কোথাও নীল, কোথাও বা সবুজাভ জলের এই লেক যে ৮২ কিলোমিটার লম্বা। কোথাও কোথাও গভীরতা ৩৮০ মিটার পর্যন্ত। হয়তো এ কারণেই তীরে এসে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো লেককে সাগর বলে ভুল বোঝাচ্ছিল। ওয়াকাটিপু লেকের আসল বিশেষত্ব অবশ্য এটি নয়। আসল বিশেষত্ব, এই লেক 'নিঃশ্বাস' নেয়।

প্রতি পাঁচ মিনিটে লেকের উপরিতল ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ওঠে-নামে। এটিকে আদিভৌতিক কিছু না ভেবে বিজ্ঞানসম্মত কারণ খুঁজলে অবশ্যই তা পাওয়া যাবে। তবে নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী মাওরিরা তা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। তাদের যে নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ইতিহাস বলছে, প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে বরফ যুগের শেষ দিকে উত্তর- পশ্চিম দিক থেকে গলে নেমে আসা বিশাল এক হিমবাহ থেকেই ওয়াকাটিপু লেকের জন্ম। মাওরি লোকগাথা কী বলে, জানেন? সেটি এমন:

লেক ওয়াকাটিপুর জন্মের ইতিহাস লুকিয়ে মাটাও নামে এক দৈত্যের মৃত্যুতে। এই দৈত্য রাঙ্গাটিরা নামে এক মাওরি সর্দারের মেয়ে মানাটাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। মেয়েকে হারিয়ে উন্মাদপ্রায় মাওরি সর্দার ঘোষণা দেন, যে তার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারবে, তার সঙ্গেই মানাটার বিয়ে দেবেন। মাটাকাওরি নামে এক দুঃসাহসী যুবক চ্যালেঞ্জটা নেয়। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে গরম বাতাস বয়ে আসার সময়টা ওই দৈত্য ঘুমায়, এটি জানা ছিল তার। ওই বাতাস আসতেই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মানাটার খোঁজে রওনা হয়ে যায় মাটাকাওরি। খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যার দিকে দেখা মেলে মানাটার। কাঁদতে কাঁদতে সে জানায়, তাকে দুই মাথার কুকুরের লেজের লোম দিয়ে তৈরি দড়ি দিয়ে নিজের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে দৈত্য। ওই দড়ি কাটার সাধ্য কারও নেই। এ কথা শোনার পরও একটা কিছু উপায় হবেই ভেবে মাটাকাওরি নদীতে গিয়ে মানাটাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা নৌকা বানিয়ে ফেলে। সব প্রস্তুতি শেষ, কিন্তু ওই দড়িটা আর কাটা যাচ্ছে না দেখে মানাটার দু চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল পড়তে থাকে। দড়ির ওপর চোখের জল পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে তা দু ভাগ হয়ে যায়। মাটাকাওরি নৌকা করে মানাটাকে নিয়ে আসে। দু জনের বিয়ে হয় এবং তারা সুখে ঘরসংসার করতে থাকে।

ওয়াকাটিপু লেক

নায়ক-নায়িকা সুখে ঘরসংসার করতে থাকলে গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তবে এই গল্পটার আরেকটু বাকি আছে । এরপর আবার যখন উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে গরম বাতাস আসে, ওই দৈত্যকে মারার জন্য রওনা হয়ে যায় মাটাকাওরি। পাহাড় বেয়ে উঠে ঘুমন্ত মাটাওয়ের দেখা পাওয়ার পর দৈত্যের চারপাশে শুকনো গাছপালা জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয় মাটাকাওরি। আগুনে পুড়ে মারা যায় মাটাও, তার শরীরের মাপে সৃষ্টি হয় একটা গর্তের। নদীর পানি এসে ভরে দেয় সেই গর্ত, উৎপত্তি হয় ওয়াকাটিপু লেকের। জলের নিচে ওই দৈত্য এখনো শ্বাসপ্রশ্বাস নেয় বলেই ওয়াকাটিপু লেকের জল অমন নিয়মিত বিরতিতে ওঠে নামে।

মরে যাওয়ার পর দৈত্য কিভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, এই প্রশ্ন তুলতে যাবেন না যেন। লোকগাথা তো লোকগাথাই। হঠাৎ করেই ওয়াকাটিপু লেককে শেষ হয়ে যেতে বাসের জানালা দিয়ে উকিঝুঁকি মেরে দেখলাম, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ বসানো হয়েছে এটির ওপর।

কুইন্সটাউন থেকে ডানেডিনের রাস্তাটা প্রথম কিছুক্ষণ সাধারণভাবেই এগিয়েছিল। তারপরই শুরু হলো পাহাড়ের গা বেয়ে একেবেকে ওঠা। মাঝেমধ্যেই সেই রাস্তার এক পাশে পাহাড় আর আরেক পাশে গভীর খাদ। ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো সব বাঁক। নিউজিল্যান্ডে সড়কপথে যেখানেই যাবেন, একটা দৃশ্য আপনার চোখে পড়বেই। দূরে পাহাড়ের গায়ে সাদা তুলোর মতো কী যেন ছড়িয়ে। ওগুলো সব ভেড়া। ভেড়া-গরু; কখনো কখনো ঘোড়াও দেখেছি আগে। নতুন একটা দৃশ্য দেখলাম কাল। কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা একটা বিশাল জায়গায় ছোট ছোট অসংখ্য হরিণ।

ডানেডিন থেকে ঘন্টা খানেক দূরে থাকতেই পাশের সমতল ভূমিতে চোখে পড়ল আপেল, আঙুর আর চেরি ফলের বাগান। কী একটা জায়গায় কিছুক্ষণের জন্য বাস থামল। এক কিশোর দৌড়ে এলো চৌকোনো একটা খোলা বাক্স ভর্তি চেরি ফল নিয়ে। ৪০-৫০টা চেরি ফলের একেকটা প্যাকেট। দাম ১০ ডলার। নিউজিল্যান্ডের ১০ ডলার তো কমই, কিন্তু কিনতে গিয়ে মনে পড়ল, তা বাংলাদেশেরও ৫০০ টাকারও বেশি। 'শিয়াল' বললে বলুন, সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো, চেরি ফল তো ভীষণ টক!

ডানেডিন শব্দটি স্কটিশ। স্কটিশ ভাষায় এডিনবরা আর ডানেডিন নাকি একই। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপ থেকে স্কটিশরাই প্রথম এসেছিল এই শহরে। রাস্তার নাম, দালানকোঠার ডিজাইন সব কিছুই তাই স্কটিশ প্রভাবিত।

২ জানুয়ারি, ২০০৮। ডানেডিন।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×