বিল গেটসের সঙ্গে নববর্ষ উদযাপন

উৎপল শুভ্র

৭ জানুয়ারি ২০২২

বিল গেটসের সঙ্গে নববর্ষ উদযাপন

নতুন বছরের সূর্য সবার আগে ওঠে নিউজিল্যান্ডে। আর নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার উৎসবটা সবচেয়ে রঙিন হয় কুইন্সটাউনে। `রিচ অ্যান্ড ফেমাস`রা ভিড় করেন সেখানে। ২০০৮ সালের নতুন দিনকে বরণ করে নেওয়ার দিনে ঘটনাচক্রে সঙ্গী পেয়েছিলাম বিল গেটসকে!

বিল গেটস নতুন বছরের প্রথম সূর্যটা কোথায় দেখেছেন, জানেন? কুইন্সটাউনে! মাইক্রোসফট সম্রাট ২০০৮-কে স্বাগত জানাতে কুইন্সটাউনে এসেছেন গত শনিবার। অবশ্যই নিজস্ব বিমানে। উঠেছেন কুইন্সটাউন থেকে গাড়িতে ২০ মিনিট দূরত্বের অ্যারোটাউনে। সেখানকার মিলব্রুক রিসোর্টে। এত কাছে বিল গেটস, একবার দেখা করাই উচিত।

কী বলছেন, বিল গেটসের সঙ্গে দেখা! স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর কুইন্সটাউনে আগমনের সংবাদ ছাপা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটিও এর-ওর কাছ থেকে শুনে। যে রেস্টুরেন্টে বিল গেটসের স্ত্রী মেলিন্ডা সঙ্গীসাথীসহ খেতে গিয়েছিলেন, সেই রেস্টুরেন্টের মালিকের প্রতিক্রিয়া ছাপা হয়েছে। তবে বিল গেটস যে মিলব্রুক রিসোর্টে উঠেছেন, সেটির 'অকাট্য' প্রমাণ আছে । সেটি কী? রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করায় তারা ব্যাপারটা স্বীকারও করেনি, অস্বীকারও করেনি।

কুইন্সটাউনের অদূরে অ্যারোটাউনে মিলব্রুক রিসোর্টে যাওয়ার রাস্তা। নববর্ষ পালন করতে এসে বিল গেটস উঠেছিলেন এই রিসোর্টেই

কাল বিকেলে অ্যারোটাউন যাওয়ার পথে সেই মিলব্রুক রিসোর্ট দেখে এলাম। বিল গেটসের মতো লোকদের জন্যই তৈরি! মূল রাস্তা থেকে রিসোর্টে যাওয়ার পথটাই চোখ জুড়ানো। দুপাশে বড় বড় গাছের মাঝখান দিয়ে কুচকুচে কালো রাস্তা। দুদিকে যত দূর চোখ যায়, সবুজ গালিচা বিছানো। একটু খেয়াল করতেই বুঝতে পারলাম, আসলে তা গলফ কোর্স। এখানে থাকতে প্রতিদিন কত টাকা গুনতে হয় জানার কৌতূহল হচ্ছিল, রিসেপশনে কাউকে দেখলাম না।

‘নিউ ইয়ার’ উদযাপনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লোকটি কেন কুইন্সটাউনকেই বেছে নিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সোজা। কুইন্সটাউন অনেক দিনই 'রিচ অ্যান্ড ফেমাস’দের ছুটি কাটানোর জায়গা। আর নিউজিল্যান্ডে নববর্ষ উদযাপনের বাড়তি একটা আকর্ষণ তো আছেই। নতুন বছরের প্রথম সূর্যটা যে নিউজিল্যান্ডেই প্রথম ওঠে। এবারই যেমন বিল গেটস ছাড়াও হলিউড তারকা জনি ডেপ, শার্লিজ থেরন ও জ্যাক নিকলসনের নববর্ষও নাকি কুইন্সটাউনেই কেটেছে। 'নাকি' শব্দটা রাখতেই হচ্ছে। পত্রপত্রিকায় খবরটা ছাপা হয়েছে ঠিকই, তবে তাতে 'জানা গেছে', 'শোনা যাচ্ছে'—এসব শব্দের ছড়াছড়ি। প্রত্যক্ষদর্শী কারও কথা নেই।

উৎসবের রঙ রঙিন কুইন্সটাউনবিল গেটস-জনি ডেপরা যেখানে নববর্ষ কাটাতে আসেন, সেই জায়গাটা কেমন হতে পারে, তা আপনি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন। কুইন্সটাউনের বর্ণনা তো আগেই কিছুটা দিয়েছি। অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর সবার আগে নতুন বছরের সূর্য দেখার সুযোগ—এই দুইয়ের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে ছোট্ট এই শহরে। 

এবারই যেমন দেখলাম, দু-তিন দিন আগে থেকেই শহরের সব হোটেল-মোটেলে 'ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট এ তরী’ অবস্থা। আমি যে কপর্থন হোটেলে আছি, ৩০ ডিসেম্বর সকালে সেটির রিসেপশনে থাকা তরুণ জানালেন, বিকেলের মধ্যে দুই শ ডলারের হোটেলের ভাড়া পাঁচ-ছয় শ ডলার হয়ে যাবে। তবে ততক্ষণে আদৌ যদি কোনো রুম ফাঁকা থাকে।

বাংলাদেশ যে খেলা খেলেছে, তাতে কুইন্সটাউনকে ভুলে যেতে পারলেই ভালো হতো (৩১ ডিসেম্বর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ৯৩ রান মাত্র ৬ ওভারেই টপকে যায় নিউজিল্যান্ড) । কিন্তু পাহাড়-লেকের অপূর্ব সম্মিলনের সঙ্গে থার্টি ফার্স্ট নাইটের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কুইন্সটাউনকে বাকি জীবনের জন্য স্মৃতির মণিকোঠায় ঠাঁই করে দিল।

কুইন্সটাউনে নববর্ষ আবাহন৩১ ডিসেম্বর সকাল থেকেই শহরে সাজ-সাজ রব। এখানে দিনের আলো থাকে রাত ১০টা পর্যন্ত। আলো থাকতে থাকতেই জনারণ্য ওয়াকাটিপু লেকের সামনের মাঠ আর রাস্তা। লাইভ কনসার্টে নতুন বছরের আবাহন চলছে আর সামনে নানা দেশের, নানা বর্ণের হাজার হাজার মানুষ। বেশির ভাগই জোড়া জোড়া। গানের সঙ্গে চলছিল কাউন্টডাউনও। শেষ কয়েক সেকেন্ড ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সুর মেলাল সমবেত জনতাও – ৫. ৪. ৩, ২, ১…. চারপাশের আলো নিভে গিয়েছিল কয়েক মিনিট আগেই। রাত ১২টা ১ মিনিটে আকাশ আলো হয়ে উঠল রংবেরঙের আতশবাজিতে। তা দেখে উচ্ছ্বসিত যুগলেরা যা করল, সেটি বিস্তারিত না লেখাই ভালো। তবে এসব দেশে এলে রাস্তা-ঘাটে, বাসে-ট্রেনে প্রেমের জোয়ার দেখে সব সময়ই মনে যে প্রশ্নটা জাগে, আবারও তা জাগল। প্রেমটা এখানে ঠুনকো বলেই কি প্রেমের প্রকাশে এমন বাড়াবাড়ি?

রাত সাড়ে চারটায় হোটেলে ফেরার সময়ও কুইন্সটাউন জেগে। তখনো উদ্দাম পার্টি চলছে বারে, পাবে এমনকি রাস্তায়ও। থার্টি ফার্স্টের রাতে কুইন্সটাউন ঘুমায় না!

১ জানুয়ারি, ২০০৮। কুইন্সটাউন।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×