মাঠের ঘাস সবুজ, এটা জানেন; কিন্তু `সবুজ` মানে কী জানেন না!

জন্মান্ধ এক কমেন্টেটরের অবাক গল্প

উৎপল শুভ্র

৬ মে ২০২১

মাঠের ঘাস সবুজ, এটা জানেন; কিন্তু `সবুজ` মানে কী জানেন না!

ডিন ডুপ্লেসি

জন্মই হয়েছিল চোখের রেটিনায় কী একটা সমস্যা নিয়ে। জন্মান্ধ সেই ডিন ডু প্লেসি পড়াশোনা করেছেন, নিয়েছেন উচ্চ শিক্ষাই; এটাতে খুব একটা বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যখন জানবেন, চোখে না দেখেও তিনি রেডিও-টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলার কমেন্ট্রি দেন, তখন তো বিস্মিত না হয়ে আর পারা যায় না। সেটিও যেন-তেন ম্যাচের নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের। কীভাবে তা সম্ভব? ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে রীতিমতো চমকে গিয়েছিলাম ডু প্লেসির সঙ্গে কথা বলে। সেই বিস্ময় এখনো কাটেনি।

প্রথম প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৪। প্রথম আলো।

জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের সঙ্গে তিন দিনের ম্যাচেই পরিচয় হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। হারারে টেস্টের প্রথম দিনে প্রেসবক্সে আবার দেখা। ২৭ বছরের টগবগে এক তরুণ ডিন ডু প্লেসি। দক্ষিণ আফ্রিকার দুটি রেডিও স্টেশনে ঘণ্টায় ঘন্টায় খেলার আপডেট দিচ্ছেন, একই কাজ করছেন জিম্বাবুয়ের একটি রেডিওর জন্যও। ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে অন্তহীন উৎসাহ। সব পরিসংখ্যান তাঁর নখদর্পণে। তিন দিনের ম্যাচেই দেখেছি, শুধু জিম্বাবুয়েরই নয়, বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান ভালো কোনো শট খেললেও 'গুড শট' বলে চিৎকার করে উঠছেন। এর কোনো কিছুই এমন আলাদা করে বলার কিছু হতো না, যদি ডিন ডু প্লেসি জন্মান্ধ না হতেন!

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার উইলফ্রেড রোডসের কথা পড়েছি। শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও মাঠে গিয়ে খেলা দেখতেন, ব্যাটসম্যান ভালো কোনো শট খেললে তালি দিতেন। রোডসের গল্পটা নিয়ে একটু যে অবিশ্বাস ছিল, তা পুরোপুরি কেটে গেল ডু প্লেসিকে দেখার পর। চোখে দেখেও অনেকে যা বুঝতে পারে না, শুধু শ্রবণশক্তিকে সম্বল করেই তিনি তা বুঝে ফেলছেন। কীভাবে?

ডু প্লেসি জানালেন, রেডিও কমেন্ট্রি শুনে শুনেই তাঁর ধারণা হয়েছে কীভাবে কোন বোলার দৌড়ায়, কোন ব্যাটসম্যান কোন শট ভালো খেলে। টিভিতে খেলা ‘দেখার’ সময় স্টাম্প মাইক্রোফোনও তাঁর বড় একটা সহায়, শোয়েব আখতার বল ছাড়ার সময় মুখ দিয়ে মনিকা সেলেসের মতো আওয়াজ করে। শন পোলকের পা মাটিতে ছেঁচড়ে যায়—এই আওয়াজ শুনেই আমি বুঝতে পারি বলটা করা হলো। কিন্তু কোনটা 'গুড শট', কোনটা 'ব্যাড শট', সেটি বোঝেন কীভাবে? ডু প্লেসির উত্তর, 'ব্যাটের আওয়াজ শুনেই তা বোঝা যায়। কখনো কখনো ব্যাটসম্যান খুব জোরে মারার চেষ্টা করে, কিন্তু বল বেশি দূরে যায় না। তখন আওয়াজটা অন্য রকম হয়। ব্যাটে বল লাগার আওয়াজই বলে দেয় ভালো টাইমিং হলো কি না।'

কমেন্ট্রি বক্সে ডিন ডু প্লেসি

হারারেতেই জন্ম ডু প্লেসির। জিম্বাবুয়েতে অন্ধদের জন্য ভালো কোনো স্কুল নেই বলে বাবা-মা তাকে ভর্তি করে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার এক স্কুলে। টেলিভিশনও তো তাঁর কাছে রেডিওই, তাই সারাক্ষণই রেডিও শুনতেন। '৯২ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে যখন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিল, তখন থেকেই তাঁর ক্রিকেটের প্রতি অনুরাগের জন্ম। '৯৪ সালে ফিরে এলেন জিম্বাবুয়েতে। নিজস্ব পদ্ধতিতে শিখলেন কোনটি কাভার ড্রাইভ, কোনটি লেগ গ্ল্যান্স। স্কয়ার লেগ ফিল্ডার কোথায় দাঁড়ায়, সিলি পয়েন্টই বা কোথায়! রেডিওতে কাজ করছেন, টিভি কমেন্ট্রিও করেছেন। একটাই স্বপ্ন, ক্রিকেট সাংবাদিক হওয়া। কিন্তু সুযোগ দিয়েই বিরাট আনুকূল্য দেখানো হয়েছে, এমন মনোভাব থেকে রেডিও স্টেশনগুলো তাঁকে দিয়ে কাজ করালেও কোনো টাকা-পয়সা দেয় না। এ কারণেই অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন ডু প্লেসি, জিম্বাবুয়েতে ক্রিকেট খুব বড় কোনো খেলা নয়। বিনে পয়সায় কাজ করতে হচ্ছে এ কারণেই। 'যেখানে ক্রিকেট বড় খেলা, সে রকম কোনো দেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবছি। প্রথমে হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকায় যাব, তবে আমার ইচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার।'

ডু প্লেসির স্বপ্ন সফল হোক, মনেপ্রাণে প্রার্থনা করলাম। তাঁর গল্প তো শুধুই গল্প নয়, ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া মানুষদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা। হাজারো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের ইচ্ছাশক্তির জয়ের গল্প। সেই গল্প এতটাই আলোড়িত করল যে, কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে খেলা দেখে ডুপ্লেসির জগৎটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম। কী যে অসহ্য এই অন্ধকার!

ভাবতেই কেমন লাগে, শুধুই শব্দময় ডু প্লেসির পৃথিবী, সেখানে কোনো দৃশ্য নেই। মাঠের ঘাস সবুজ, এটা জানেন; কিন্তু 'সবুজ' মানে কী, সেটি জানেন না!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×