`এক্সট্রা অর্ডিনারি` ইকবাল ব্রাদার্স, মশাপীড়িত পিটারসেন ও গলফার কলিংউড

উৎপল শুভ্র

৯ মে ২০২১

`এক্সট্রা অর্ডিনারি` ইকবাল ব্রাদার্স, মশাপীড়িত পিটারসেন ও গলফার কলিংউড

বাংলাদেশের ক্রিকেট অভিধানে `অর্ডিনারি` শব্দটা ঢুকিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব ইকবাল ব্রাদার্সের। ২০০৩ সালে ইংলিশ স্পিনারদের `অর্ডিনারি` বলে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন নাফিস ইকবাল। ছোট ভাই তামিম ইকবাল `অর্ডিনারি` শব্দটার একস্ট্রা অর্ডিনারি ব্যবহার করেছিলেন ২০১১ সালের জিম্বাবুয়ে ট্যুরে। জিম্বাবুয়ের নতুন বাঁহাতি পেসার ব্রায়ান ভিটরিকে `অর্ডিনারি` বলাটা ছিল অবশ্য মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের অংশ। পরে ভিটরি `অর্ডিনারি` বলে প্রমাণিত হলেও সেই ট্যুরে তামিমের সঙ্গে দ্বৈরথে তিনিই জিতেছিলেন। এই লেখা অবশ্য এরও এক বছর আগের। নাফিসের `অর্ডিনারি-খ্যাত` ২০০৩ সালের পর ইংল্যান্ডের প্রথম বাংলাদেশ ট্যুরের সময়। তামিম-নাফিসের সঙ্গে যাতে আছেন মশাপীড়িত পিটারসেন আর গলফার কলিংউডও।

প্রথম প্রকাশ: ১ মার্চ ২০১০। প্রথম আলো।

ইকবাল ব্রাদার্স ও 'অর্ডিনারি'

পল কলিংউডের কি মনে আছে? কাল ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংসটা যখন ইংল্যান্ড বনাম তামিম ইকবাল (১২০ বলে ১২৫ করেছিলেন তামিম),ইংলিশ অলরাউন্ডারের মনে পড়ার কথা আরেক ‘ইকবাল’কে। 

মনে পড়ার কথা, বিকেএসপিতে তিন দিনের ম্যাচে নাফিস ইকবালের ১১৮। তার চেয়েও বেশি, ওই ইনিংস খেলার পর সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ডের দুই স্পিনার অ্যাশলি জাইলস ও গ্যারেথ ব্যাটিকে ‘অর্ডিনারি’ বলে দেওয়া। এর আগে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে ওই একবারই বাংলাদেশে এসেছিল ইংল্যান্ড। ২০০৩ সালের সেই দলের একমাত্র পল কলিংউডই আছেন এবারও।

ইংলিশ মিডিয়ায় নাফিসের ইনিংসের চেয়েও বেশি মাতামাতি হয়েছিল তাঁর ‘অর্ডিনারি’ মন্তব্য নিয়ে। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি লিখেছিলেন, “জাইলস ওই ‘অর্ডিনারি’ কথাটা এর আগেও অনেকবার শুনেছেন। তবে মাত্র স্কুল পেরোনো ১৮ বছর বয়সী কারও মুখে এই প্রথম।”

সেই নাফিস ইকবাল প্রায় চার বছর জাতীয় দলের বাইরে। সর্বশেষ ওয়ানডে আরও বছরখানেক আগে। এমন কোনো বয়স হয়নি, আবার ফিরতেও পারেন। আর যদি না পারেন, স্মৃতি রোমন্থনের জন্য শেষ ওয়ানডেটা মন্দ হবে না। ২০০৫ সালের ১৮ জুন কার্ডিফে ওই অস্ট্রেলিয়া-বধ কাব্যই নাফিসের শেষ ওয়ানডে স্মৃতি। 

যে ‘অর্ডিনারি’ মন্তব্যে এমন বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন, সেটি অবশ্য পরে ইংলিশ মিডিয়াতেই বেমালুম অস্বীকার করেছেন নাফিস। ২০০৫-এ ইংল্যান্ড সফরে দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকাকেই এমন কিছু বলেননি দাবি করে তাদের মাধ্যমে অ্যাশলি জাইলসকে ‘স্যরি’ও বলেছিলেন। যা পড়ে বড় মন খারাপ হয়েছিল। নাফিস বলেননি, অথচ সব সাংবাদিকই তা শুনল! আর না বললেই বা কি! এমন একটা গল্প কেউ নষ্ট করে নাকি!

নাফিসের চেয়ে তামিম অনেক বেশি ডাকাবুকো। কালকের ১২৫ রানের ইনিংসের পর শুধু স্পিন নয়, ইংলিশ বোলিং অ্যাটাককেই ‘অর্ডিনারি’ বলে দিলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। বলে ফেললে সেই কথা ফিরিয়ে নেওয়ার ছেলেও নন। নিজের সামর্থ্যের ওপর প্রচণ্ড আস্থা, বিখ্যাত সব নামের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহস দেখেই কোচ জেমি সিডন্সের বিশ্বাস জন্মেছে, আগামী দু বছরের মধ্যে বিশ্ব ক্রিকেটে আধিপত্য ছড়াবে তামিমের ব্যাট। 

কথায় কিংবা ব্যাটে, তামিম তখন এমনই ডাকাবুকো। ছবি: গেটি ইমেজেস

কথাবার্তাতেও বাংলাদেশের বেশির ভাগ ক্রিকেটারের মতো পুতুপুতু ভাব নেই। এই গত নিউজিল্যান্ড সফরেই অ্যাডাম প্যারোরে তাঁর কলামে বাংলাদেশের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের খেলা উচিত নয় লিখেছেন শুনে বলে দিলেন, ‘ওরা আসলে বাংলাদেশকে ভয় পাচ্ছে।’ বাংলাদেশে পেলে নিউজিল্যান্ডের এই দলকে হারানোর ঘোষণাও দিয়ে দিলেন অবলীলায়।

বাগাড়ম্বর বলা যাচ্ছে না ব্যাটেও একই রকম ঔদ্ধত্যের ঘোষণা বলে। মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ার—এর মধ্যেই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৪টি স্কোরের ৩টিই তাঁর। ২০০৮ সালের মার্চে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি থেকে হিসাব করলে সর্বশেষ ৪৮ ম্যাচে ৩টি সেঞ্চুরি ও ৯টি ফিফটি। গড় ৩৩.২০, স্ট্রাইকরেট প্রায় ৮৪। টেস্ট-ওয়ানডে দুটিতেই দেড় শ ছাড়ানো ইনিংস। 

না, এই ছেলেটা ‘অর্ডিনারি’ কেউ নয়!

পিটারসেনের মশক-অভ্যর্থনা 

দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে ০ ও ৬। কাল প্রথম ওয়ানডেতে ১। বাংলাদেশ সফরটা কেভিন পিটারসেনের কাছে এখন পর্যন্ত দুঃস্বপ্নেরই নামান্তর। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে অবশ্য টানা তিন ইনিংসে ব্যর্থতারও আগে রাখবেন এয়ারপোর্টের মশক-অভিজ্ঞতাকে। গত পরশু ব্রিটিশ হাইকমিশনারের দেওয়া পার্টিতে বিসিবির এক কর্তাব্যক্তিকে পেয়ে সেটিই বললেন সবিস্তারে। ‘বাপ রে বাপ, এ কি মশা! এয়ারপোর্টে আমাকে ছুলে ফেলেছে!’ 

ওগুলো ভালো জাতের মশা, রোগজীবাণুবাহক নয় বলে আশ্বস্ত করায় পিটারসেন একটু বিরক্তই, ‘আরে রোগ-টোগ তো পরে, কামড় তো দেয়। চুলকাতে চুলকাতে আমার অবস্থা খারাপ।’ বলতে বলতে কীভাবে চুলকাতে হয়েছে, তার একটা প্রামাণ্যচিত্রও দেখালেন।

বাংলাদেশে আসার আগে দুবাইয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টিতেই রান পেয়েছেন। ফর্ম নিয়ে এখনই তাই দুশ্চিন্তায় পড়ার মতো কিছু হয়নি। আপাতত তাঁর বড় দুশ্চিন্তা আইপিএল নিয়ে। আইপিএলের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়, বেঙ্গালুরু রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের সঙ্গে সাড়ে ১৫ লাখ ডলারের চুক্তি—যেভাবে হুমকি-টুমকি আসছে, যদি না খেলা হয়!সেবারের বাংলাদেশ সফরে হতাশায় এমনই মাথা নিচু করে ফিরতে হচ্ছিল পিটারসেনকে। ছবি: গেটি ইমেজেস

মুম্বাই হামলার পর আবারও ভারতে ফিরে না খুব সাহসের পরিচয় দিলেন, এখন ভয় পাচ্ছেন কেন? পিটারসেনের জীবন যে বদলে গেছে এর মধ্যে, ‘তখন আমি ছিলাম একা। এখন তো আর তা নয়। দু মাস পর আমার প্রথম সন্তান আসছে। আমার একার ব্যাপার হলে চোখ বুজে চলে যেতাম। কিন্তু এখন তো আমাকে তিনজনের কথা ভাবতে হয়। আমার কিছু হয়ে গেলে আমার বউ আর বেবির কী হবে!’

শুনতে শুনতে কেভিন পিটারসেনকে বড় বেশি ‘মানবীয়’ লাগছিল! মাঝে মাঝে যে আমরা ভুলেই যাই, তারকাখ্যাতির আড়ালে পিটারসেনরাও আমাদের মতোই মানুষ!

কলিংউড ও কাঠের ক্লাব

কী ভাই কলিংউড, বাংলাদেশে কি গলফ কোর্স আছে?

‘আমি অজ্ঞতা থেকে অমন বলেছিলাম। এখানে এসে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব দেখার পর লজ্জাই পেয়েছি। এটি আমার দেখা সেরা ২০টি গলফ কোর্সের একটি।’ পল কলিংউডকে সত্যিই খুব লজ্জিত দেখায়।

বাংলাদেশে গলফ কোর্সের অস্তিত্ব নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে ফেঁসে গিয়েছিলেন পল কলিংউড৷ ছবি: গেটি ইমেজেস

এখানেও ঘটনাস্থল গত পরশু সন্ধ্যায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের ওই পার্টি। কলিংউডের হাবভাবেই বোঝা গেল, বেফাঁস বলে ফেলা কথাটার জন্য তাঁকে যে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হবে, এটি তিনি জানতেন। ওই বেফাঁস কথাটা কী, জানেন তো? ‘বাংলাদেশে গলফ কোর্স আছে কি না কে জানে! থাকলেও হয়তো দেখা যাবে, ওখানে ক্লাব সব কাঠের।’ বাংলাদেশে আসার আগে বলেছিলেন কলিংউড, যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছিল বাংলাদেশের গলফার-সমাজ।

গলফ ক্লাব আবার কাঠের হয় নাকি? কলিংউড তথ্যপ্রমাণ হাজির করলেন, ‘মুলতানে এক গলফ কোর্সে গিয়ে কাঠের ক্লাব পেয়েছি তো।’ ওই কথায় বাংলাদেশে এমন প্রতিক্রিয়া হবে, তা কল্পনাও করেননি, ‘আমাকে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছে আমিও হালকা চালে কথাটা বলে দিয়েছি। ও মা, পর দিন দেখি এটি সব ওয়েবসাইটে!’

কথাবার্তা আরেকটু চালিয়ে যেতে আমি পক্ষ ত্যাগ করে কলিংউডের পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম, ‘মিডিয়া তো এমনই!’

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×