বিদায়ী উপহার

ক্যারিবীয় কড়চা

উৎপল শুভ্র

২৭ জুন ২০২১

বিদায়ী উপহার

দুই টেস্ট আর তিন ওয়ানডের সব কটিতে টানা জেতার পর বাংলাদেশ হেরে বসল সিরিজের একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে। আর সেদিনই কি না জিতলাম আমি! প্রতীকী কোনো জয় নয়, স্পনসর প্রতিষ্ঠান প্রতি ম্যাচেই মিডিয়ার জন্য যে কুইজের আয়োজন করেছি, সেটিতেই জিতে আমি পেয়ে গেলাম একটা ব্ল্যাকবেরি! ক্যারিবীয় কড়চার শেষ অধ্যায়।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের শেষ দিনে বাংলাদেশ হারল আর আমি জিতলাম!

দেশদ্রোহী-ট্রোহী বলে বসবেন না। আগে ঘটনাটা শুনে নিন। এই সিরিজে এই প্রথমবারের মতো যে বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়ের বদলে আমার হাতে ব্ল্যাকবেরি!

এই সিরিজটাকেই বলতে পারেন 'ব্ল্যাকবেরির সিরিজ'! ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের স্পনসর ডিজিসেলের সৌজন্যে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার ব্ল্যাকবেরি, ম্যান অব দ্য সিরিজেরও। প্রতি ম্যাচে মিডিয়ার জন্যও উপহার ছিল একটি করে ব্ল্যাকবেরি। প্রেসবক্সে সাংবাদিক তো বলতে গেলে আমি একাই, টেলিভিশন কমেন্টেটর-ক্রু, ওরাও তাই ছিল তালিকায়। উপহার ঠিক আছে, তবে সেটি পাওয়ার একটা পূর্বশর্ত ছিল।

প্রতি ম্যাচেই ডিজিসেলের মিডিয়া ম্যানেজার ইমরান খান একটা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতেন। কখনো ম্যাচে সর্বোচ্চ রান করবে কে, কখনো বা বাংলাদেশ বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের দলের রান, প্রথম ওয়ানডেতে প্রশ্ন ছিল ফ্লয়েড রেইফার কত করবেন। উত্তর একেবারে মিলে গেলে তো কথাই নেই, না মিললেও যারটা সবচেয়ে কাছাকাছি, তাঁরই মিলত ওই ব্ল্যাকবেরি। আমার লটারি-ভাগ্য খুব খারাপ। কত জায়গায় র‍্যাফল ড্র-ট্র হয়েছে, জীবনে কিছু পাইনি। এই সিরিজটাও সেই রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখেই এগোচ্ছিল বলে পরশু এসব 'ফালতু' ব্যাপারে আগ্রহ না দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ইমরান নাছোড়বান্দা। একটা কিছু বলতেই হবে।

প্রশ্নটা খুব জটিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম তিন ব্যাটসম্যান মিলে মোট কত রান করবে?

প্রথমে বললাম ৬৬। মিনিট পাঁচেক পর কী মনে করে ইমরানকে ডেকে বললাম, '৬৬ নয়, ৪৭ লেখো।' ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার মিলে করলেন ৮। প্রথম বলেই ডেল রিচার্ডস আউট, তাঁর ওপেনিং সঙ্গী আন্দ্রে ফ্লেচার আউট হওয়ার সময় ডেভন স্মিথের রান ৩২। ৩৯ করে আউট হলেই আমি জিতে যাই। বাংলাদেশ জিতুক, তা তো অবশ্যই চাই। তবে ৭ রানে আর কী আসবে-যাবে, স্মিথ যেন ৩৯ করে আউট হয়, কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনা করতে শুরু করলাম। ফাজিলটা আউট হলো ৩৭ রান করে।

সেই ব্ল্যাকবেরি আমার সঙ্গে যাচ্ছে আর যাচ্ছে হিরণ্ময় সব স্মৃতি। বারবাডোজ-সেন্ট ভিনসেন্ট গ্রেনেডা ডমিনিকা-সেন্ট কিটসের রাত্রিদিন, নীল সাগর, রুপালি সৈকত, বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা...। শুধু শেষ দিনটা মুছে দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তা হলে যে ব্ল্যাকবেরিটাও মুছে যায়! বিশ্বাস করুন, তাতেও আমার আপত্তি নেই।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম তিন ব্যাটসম্যানের মোট রান হলো ৪৫। দেখা গেল, ৪৫ কেউ বলেনি । আমি বলেছি ৪৭ আর টেলিভিশন কোম্পানির কোন ক্রু যেন ৪৩। দুজনেই দাবিদার। এবার তাই টাইব্রেকার। টাইব্রেকারের প্রশ্ন-ওয়েস্ট ইন্ডিজ কত ওভারে জিতবে? আমি বললাম, ১৬.২ ওভার। ওই ক্রু ১৭.৩। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের ১৩-১৪ ওভার হয়ে যেতেই ম্যাচের রেজাল্ট নিয়ে অনিশ্চয়তা শেষ। বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের বদলে এই ম্যাচের নাম তখন বাংলাদেশের সাংবাদিক বনাম দক্ষিণ আফ্রিকান টেলিভিশন ক্রু। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতল ১৬.৫ ওভারে। আমি তিন বল কম বলেছি, ওই ক্রু চার বল বেশি। ফটো ফিনিশে জিতে ব্ল্যাকবেরি আমার!

সেই ব্ল্যাকবেরি আমার সঙ্গে যাচ্ছে আর যাচ্ছে হিরণ্ময় সব স্মৃতি। বারবাডোজ-সেন্ট ভিনসেন্ট গ্রেনেডা ডমিনিকা-সেন্ট কিটসের রাত্রিদিন, নীল সাগর, রুপালি সৈকত, বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা...। শুধু শেষ দিনটা মুছে দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তা হলে যে ব্ল্যাকবেরিটাও মুছে যায়! বিশ্বাস করুন, তাতেও আমার আপত্তি নেই। আমার হাতে ব্ল্যাকবেরি দেখে কৌতূহলী বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বললামও, 'এই ম্যাচটা জেতার বিনিময়ে ব্ল্যাকবেরি বিসর্জন দিতে আমার একটুও আপত্তি নেই।'

যাক, যা হওয়ার হয়েছে। খেলায় হারজিত থাকেই। বাংলাদেশের এত জিতে অভ্যাস আছে নাকি! টি-টোয়েন্টি ওই কালো দাগ এঁকে দেওয়ার পরও তো ওয়েস্ট ইন্ডিজে এই সফর আরও অনেক বছর রূপকথা হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। বাংলাদেশ যখনই খারাপ করবে, পেছন ফিরে তাকিয়ে ক্যারাবিয়ানে একের পর এক জয় দেখব। চোখে ভাসবে আদিগন্ত নীল সাগর, রুপালি সৈকত, সবুজ পাহাড়, প্রাণখোলা সব মানুষ...। কিন্তু গত কয়েক দিন এসবই যে অসহ্য লাগতে শুরু করেছে!

সেন্ট কিটসে আমার হোটেল রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই নীল আটলান্টিক। পাঁচ দিনে কবারই বা সেদিকে তাকিয়েছি! সেন্ট কিটসের সেরা সৈকত নিয়ে বসে এই ম্যারিয়ট রিসোর্ট, সেই সৈকতেও পা ফেলেছি মাত্রই এক দিন। দেখতে দেখতে ডালভাত হয়ে যাওয়া একটা কারণ। তার চেয়েও বড় কারণ, প্রতিটি ট্যুরের শেষ দিকে এসে সেই অমোঘ টান। ঢাকা ডাকছে! ডাকছে তার জনারণ্য, কোলাহল, ধোঁয়া-ধুলা, রিকশার ঘণ্টি...চরম বিরক্তির এসব উপাদান নিয়ে। আহা, সেসবও এখন কী মধুরই না মনে হচ্ছে।

উঠি, স্যুটকেস গোছাতে হবে।

২ আগস্ট, সেন্ট কিটস।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×