‘ভূতের বাড়ি’তে স্বাগতম!

উৎপল শুভ্র

২০ মে ২০২১

‘ভূতের বাড়ি’তে স্বাগতম!

ডারহামের রেডওয়ার্থ হল হোটেল। রিসেপশনে ঢুকতেই যা আপনাকে জানিয়ে দেবে, এখানে ভূত আছে। তা-ও আবার দুই রকম ভূত

ইউরোপ-আমেরিকাতে `হন্টেট হাউস` বা `ভূতুড়ে বাড়ি`র খুব কদর। মানুষ শখ করে সেখানে থাকতে যায়। বিভিন্ন দেশে পাঁচ তারকা হোটেলে রূপান্তরিত `ভূতের বাড়ি`-ও দেখার ও তাতে থাকার সুযোগ হয়েছে। ডারহামের রেডওয়ার্থ হল হোটেল এরই একটি। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ইংল্যান্ড ট্যুরের সময় যেটির ইতিহাস শুনে রীতিমতো রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। রাতের আলোআঁধারিতে একটু যে গায়ে কাঁটাও দিয়েছিল, স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।

প্রথম প্রকাশ: ২ জুন ২০০৫। প্রথম আলো।

ট্যাক্সি থেকে নামতেই স্বাগত জানালেন মোহাম্মদ রফিক। যদি সেটিকে স্বাগত জানানো বলা যায়। পোড়োবাড়ির মতো দেখতে হোটেলের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘এখানে সাবধানে থাকবেন। একা পেলে ভূত টেনে নিয়ে যাবে!’

তা ভুতুড়ে বাড়ির মতোই দেখতে রেডওয়ার্থ হল হোটেল। ‘মাত্র’ ৩৪১ বছরের পুরনো এক বাড়ি দিনে দিনে অনেক রূপ বদলেছে, সেই ১৬৬৩ সালে তাদের পাঁচ কন্যাকে নিয়ে থাকার জন্য ১৮ রুমের এক বাড়ি বানিয়েছিলেন জর্জ ও ইলিনর ক্রসিয়ার। তখন এর নাম ছিল রেডওয়ার্থ হাউস। সেটিই অনেকবার মালিকানা বদলে আর বিচিত্র ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখন ১০০ রুমের এক হোটেল। ভেতরে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে যথেষ্টই, তবে ভুতুড়ে বাড়ির আবহটা ধরে রাখতে তা করা হয়েছে বহিরঙ্গে কোনো পরিবর্তন না এনেই।

শুধু দেখতেই ভুতুড়ে বাড়ির মতো নয়, হোটেলের রিসেপশন থেকে পাওয়া তিন পৃষ্ঠার ইতিহাস দাবি করছে, এখানে সত্যিই নাকি ভূত আছে! দুই ধরনের ভূত। প্রথমটি মেয়ে ভূত। প্রেমিকের প্রত্যাখ্যান সইতে না পেরে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন এক তরুণী, এই বাড়ির বেডরুমগুলোর সামনে দিয়ে এখনো নাকি হেঁটে বেড়ায় তার অতৃপ্ত আত্মা এবং সেটি শরীরী রূপ নিয়েই!

দ্বিতীয় ভূতগুলো বাচ্চা। এখন রেস্টুরেন্টে রূপ নেওয়া রেডওয়ার্থ হলে নাকি কখনো কখনো শিশু-কিশোরদের সম্মিলিত হাসি ও কান্নার আওয়াজ শোনা যায়! কথিত আছে, এক সময় মানসিকভাবে অসু্স্থ শিশু-কিশোরদের এই হলের ফায়ারপ্লেসের কাছে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। অনেক আগেই পৃথিবীর লীলাখেলা শেষ হয়েছে তাদের, তবে এই বাড়ির মায়া নাকি ছাড়তে পারেনি তারা। হাসি-কান্নার মাধ্যমে নিজেদের অশরীরী উপস্থিতি জানিয়েও দেয় সময়-সময়। ভূতের গল্প-টল্প শেষে মজা করে লেখা হয়েছে : এনজয় ইউর স্টে!

`ভূত` আছে এই ঘরেও

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা খুব এনজয় করছেন বলে মনে হলো না। বিশাল জায়গা নিয়ে এই হোটেল, আশপাশে তিন-চার মাইলের মধ্যে কোনো জনবসতি নেই। যে মাঠে দ্বিতীয় টেস্ট, চেস্টার-লি স্ট্রিটের সেই রিভারসাইড গ্রাউন্ড এখান থেকে ৩০ মাইল দূরে। হোটেলের সামনে দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। কার্পেটের মতো নরম ঘাস বুকে নিয়ে যে লনটি শুয়ে আছে, সেটিকে লন না বলে মাঠ বলাই ভালো। সেই ‘মাঠে’ একটু পর পর বিশাল সব গাছ। নাগরিক কোলাহলের প্রবেশাধিকার নেই এখানে, হোটেল রুমে বসে যখন এই লেখা লিখছি, শব্দ বলতে শুধু পাখির কলকাকলি। এটি আসলে দিনের শেষে সব কাজ থেকে ছুটি নিয়ে অবসর কাটানোর জায়গা।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তো ছুটি কাটাতে আসেননি। এই নিরুদ্বিগ্ন শান্তির আবাসস্থলে কথিত ভূতের মতো একটু পর পরই যে ব্যাটসম্যানদের চোখের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন হার্মিসন-হগার্ড-ফ্লিনটফ-জোন্সরা। বোলারদের সামনে ট্রেসকোথিক-ভন। শান্তির বদলে ‘ভূত’টাই তাদের কাছে বড়। হোটেল কর্তৃপক্ষই ‘এখানে ভূত আছে’ বলে দাবি করছে— এটা জানতে হয়নি, হোটেলের আবহ দেখেই দলের তরুণ খেলোয়াড়েরা কয়েকজন মিলে এক রুমে থাকার পরিকল্পনা করে ফেলেছেন!

লর্ডস টেস্টে ভালো খেললে হয়তো ভালোই লাগত। কিন্তু লর্ডস এমনই দুঃস্বপ্ন যে, এই ভৌতিক পরিবেশ একটুও ভালো লাগছে না বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের। এমনকি ভালো লাগছে না ডেভ হোয়াটমোরেরও। ‘ভূতের বাড়ি’র সঙ্গে অবশ্য এবারই তাঁর প্রথম পরিচয় নয়। শ্রীলঙ্কা দলকে নিয়েও এখানে থেকে গেছেন আগে। ‘একটি ট্যুর ম্যাচ খেলতে এখানে এসেছিলাম আমরা। সেটি ছিল এপ্রিল, ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল সবার’— স্মৃতি বলতে এটাই প্রথম মনে পড়ল হোয়াটমোরের।

জমে যাওয়ার মতো না হলেও ঠাণ্ডা এখনো যথেষ্টই আছে। লন্ডনে যেখানে কখনো কখনো টি-শার্ট পরেও বাইরে বেরোনো গেছে, এখানে সোয়েটার-জ্যাকেটের সঙ্গে পরতে হচ্ছে কানটুপিও। এমনিতেই সুখবরের অভাব, তার সঙ্গে এই ঠাণ্ডাটা নতুন এক দুঃসংবাদ। দ্বিতীয় টেস্টে ইংলিশ কন্ডিশন আরও বড় প্রতিপক্ষ হয়েই দেখা দেবে বাংলাদেশের জন্য।

গত বছর (২০০৪) চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে শোচনীয় ব্যর্থতার সঙ্গে এবার লর্ডস-দুঃস্বপ্ন যোগ হয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দলের জন্য ইংল্যান্ড সফর এক ভুতুড়ে অভিজ্ঞতাই। ‘ভূতের বাড়ি’তে থেকে যদি সেই ভূতটা তাড়ানো যায়!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×